ইতিহাস: বিশ্বকাপের নক-আউটে উঠে কেপ ভার্দের ডাইলন লিভরামেন্টো। তাঁদের সামনে আর্জেন্টিনা। ছবি: রয়টার্স।
সৌদি আরবের সঙ্গে ড্র করে উঠেই তৎক্ষণাৎ উল্লাস করতে পারছিলেন না তাঁরা। বরং এক সতীর্থের মোবাইলে ঝুঁকে পড়লেন সকলে। ও দিকে স্পেন বনাম উরুগুয়ে ম্যাচ চলছে, তার ফলাফলের উপর নির্ভর করছে যে নক-আউট ভাগ্য! স্পেন হারিয়ে দিয়েছে উরুগুয়েকে জানামাত্র যেন আবেগের ভিসুভিয়াস ফেটে লাভা উদ্গীরণ শুরু হল!
কেউ পাশে দাঁড়ানো সতীর্থের ঘাড়ে লাফিয়ে উঠে পড়লেন। যে যাঁকে সামনে পাচ্ছেন, জড়িয়ে ধরছেন। কেউ কেউ জার্সি দিয়ে চোখের জল মোছার চেষ্টা করছেন। কারা যেন অনেকগুলো জাতীয় পতাকা দলের সদস্যদের হাতে তুলে দিয়ে গেল। কোচ বুবিস্তা একটা বিশাল পতাকা নিয়ে গর্বের সঙ্গে মাঠের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের সিন্ডারেলা কাহিনি অব্যাহত। মাত্র সাড়ে পাঁচ লক্ষ মানুষ নিয়ে অতলান্তিকের পারে আফ্রিকার উপকূলবর্তী এক ক্ষুদ্র দেশ। দশটি চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার মতো সুন্দর দ্বীপ নিয়ে তৈরি কেপ ভার্দে। প্রচুর ট্যুরিস্ট যে কারণে এখানে ঘুরতে আসেন।
প্রতিবেশীদের মধ্যে পরিচিত দেশ বলতে সেনেগাল। ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি পর্তুগিজ় অভিযাত্রীদের আবিষ্কার করা এই দ্বীপপুঞ্জকে একসময় আফ্রিকার ক্রীতদাসদের কেনাবেচার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হত। ১৯৭৫-এ স্বাধীন হওয়ার আগে পর্যন্তও ছিল পর্তুগালের অধীনে।
কে জানত, পৃথিবীর মানচিত্রে লুকিয়ে থাকা এমন এক অজ্ঞাত, অপরিচিত দেশই প্রথম বার বিশ্বকাপ খেলতে এসে এমন ইতিহাস তৈরি করে ফেলবে! সব চেয়ে ক্ষুদ্র দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে যাবে! স্পেনের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচ খেলতে নামার আগে তাদের পরাজয় ঠেকানোর সম্ভাবনা দেখানো হচ্ছিল এক শতাংশ! সবাই ধরে নিয়েছিল, আমেরিকা বেড়াতে এসেছে তারা। গ্রুপে স্পেন, উরুগুয়ের মতো বিশ্বকাপজয়ী দল রয়েছে। সৌদি আরব গত বিশ্বকাপে লিয়োনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছে। এদের পাশে কেপ ভার্দে কোথাকার কে?
আন্ডারডগ বলবেন? একদম ঠিক বলা হবে না। কেপ ভার্দেকে বরং বলা উচিত আন্ডারডগদেরও আন্ডারডগ। স্পেনের বিরুদ্ধে খেলতে নামার আগে তাদের পরাজয় ঠেকানোর সম্ভাবনা দেখানো হচ্ছিল এক শতাংশ। ভুল লেখা হয়নি। হ্যাঁ, এক শতাংশই। তারাই যে তথাকথিত বড় দলগুলিকে টেক্কা দিয়ে নক-আউট পর্বে চলে যাবে, ক’জন ভেবেছিল? স্পেনের সঙ্গে ড্রয়ের পরেও তো অনেকে ধরে নিয়েছিল, একটা দিনের অঘটন। রোজ রোজ অলৌকিক ঘটে না! স্পেনের সঙ্গে ০-০, উরুগুয়ের সঙ্গে ২-২, এ বার সৌদি আরবের সঙ্গে ০-০।
মনে রাখতে হবে, এ বারের বিশ্বকাপে ৪৮টি দল খেলছে। তাই নক-আউট পর্বে যোগ্যতা অর্জনেরও নতুন নিয়ম করা হয়েছে। আগের মতো প্রত্যেক গ্রুপ থেকে প্রথম দুই স্থানে শেষ করা দল পরের রাউন্ডে তো যাবেই। এ ছাড়াও সব গ্রুপ মিলিয়ে প্রথম আটে থাকা তিন নম্বর দলও যাবে। কেপ ভার্দেকে কিন্তু কোনও ঘোরা পথে নক-আউটের সওয়ার জন্য বাসস্টপে অপেক্ষা করতে হয়নি। গ্রুপের দ্বিতীয় হিসেবে সরাসরি যোগ্যতা অর্জন করেছে তারা। রাউন্ড অব ৩২-এ তারা এ বার লিয়ো মেসির আর্জেন্টিনার মুখোমুখি। মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে সেইম্যাচ ৩ জুলাই।
আপাতত শুক্রবার রাতের হিউস্টনের মাঠে ফেরা যাক। যেখানে ক’দিন আগে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর নামে জয়ধ্বনি উঠছিল, সেখানে এমন এক জনকে নায়ক হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছিল, যাঁকে এই বিশ্বকাপের আগে কেউ চিনতই না। কোথায় রোনাল্ডো আর কোথায় তিনি ভোজ়িনা! সি আর সেভেন যেখানে পর্তুগালের সব চেয়ে বিখ্যাত নাম, সেখানে ভোজ়িনা কি না পর্তুগালের দ্বিতীয় ডিভিশনে খেলা এক মামুলি গোলরক্ষক। চল্লিশ বছরের তিনি ফুটবল থেকে সন্ন্যাসই নিয়ে ফেলছিলেন, এই বিশ্বকাপে আসার কথাই ছিল না। সতীর্থরা বুঝিয়ে-শুনিয়ে রাজি করেছিল। বিশ্বকাপে আসার আগে সমাজমাধ্যমে খুব একটা পরিচিতিই ছিল না তাঁর। এখন ইনস্টাগ্রামে অনুরাগীর সংখ্যা ১ কোটি ৬৮ লক্ষ।
স্পেনের বিরুদ্ধে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে উঠেছিলেন ভোজ়িনা। অন্তত সাতটি নিশ্চিত গোল বাঁচান। সৌদির বিরুদ্ধে ততটা প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু কেপ ভার্দের মুখ যে তিনিই, তা বেশ বোঝা গেল। এক দল সমর্থক ব্যানার নিয়ে এসেছিলেন, ‘‘ভোজ়িনা, এই নামটা আমাদের বিশ্বাস করতে শিখিয়েছে!’’ আর এক তরুণের দল গায়ে তাঁর নামে ট্যাটু করে ফেলেছে। এর পরেও কী করে বলা যায়, ভোজ়িনা এবং কেপ ভার্দে শুধুই ফুটবল মাঠে ইতিহাস তৈরি করছে? এ তো জীবনের চড়াই-উতরাই ধরে এগিয়ে চলা অকুতোভয় এক দল অভিযাত্রীর রোমহর্ষক কাহিনি! ‘‘আমরা একটা ছোট্ট দেশ কিন্তু দেখাতে চেয়েছিলাম, আমরা লড়াই করতে পারি,’’ বললেন ভোজ়িনা। লড়াই করতে পারি? ভোজ়িনা, আপনি এবং আপনার দল লড়াইয়ের নতুন মানেই শিখিয়ে দিয়ে গেল গোটা বিশ্বকে।
হিউস্টনের মাঠে সৌদির সঙ্গে ম্যাচ শেষে ক্যামেরা দ্রুত ঘুরতে থাকল গ্যালারিতে। সেখানে আরও বাঁধনহারা অবস্থা। এক ভদ্রমহিলাকে দেখানো হল। হাতে দেশের পতাকা। জোরে জোরে দোলাচ্ছেন। পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক— ইনি আনা ক্যানডিডা ইভোরা। ভোজ়িনার মা। যিনি ছেলের খেলা দেখতে আসতে পারছিলেন না আমেরিকার ভিসা সংক্রান্ত নতুন নিয়মের জন্য। এই নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বেশ কয়েকটি দেশকে বলা হয়েছে আমেরিকার ভিসা পেতে গেলে অতিরিক্ত ১৫০০০ ডলারের বন্ড দিতে হবে। সেই টাকা দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না তাঁদের, তাই স্পেনের বিরুদ্ধে ছেলের অবিশ্বাস্য লড়াই দেখা হয়নি মায়ের। কিন্তু ছেলের এবং দেশের ইতিহাসের মুহূর্ত থেকে বঞ্চিত হতে হল না। নক-আউটে যাওয়ার রাতটা মাঠে উপস্থিতথেকে দেখলেন।
কেপ ভার্দের প্রচুর মানুষ অন্যান্য দেশে থাকেন। সব চেয়ে বেশি থাকেন আমেরিকায়। শুনলে অবাকই লাগবে যে, তাদের দেশের জনসংখ্যা সাড়ে পাঁচ লক্ষ মতো আর আমেরিকায় বসবাসকারী কেপ ভার্দে বংশোদ্ভুতদের সংখ্যা পাঁচ লক্ষ মতো। তাই বিশ্বকাপে একদিকে তাঁদের ম্যাচে যেমন প্রচুর জনসমর্থন থাকছে, তেমনই অভিবাসন-নীতি নিয়ে কড়াকড়ির ফতোয়া জারি করা আমেরিকায় ভোজ়িনাদের সাফল্যের অন্যতাৎপর্যও রয়েছে।
ভোজ়িনা যদি কেপ ভার্দের রূপকথার নায়ক হন, তা হলে নেপথ্যে নায়ক নিশ্চয়ই বুবিস্তা, তাদের কোচ। দেশের জন্য আত্মত্যাগের কোনও পুরস্কার কি ফুটবল বিশ্বকাপে কোচেদের দেওয়া হয়? তা হলে তিনি বুবিস্তা— অনেক চাণক্যের চেয়ে অনেক ছোট নাম হয়েও তা পেতে পারেন। বিশ্বমঞ্চে কেপ ভার্দেকে ফুটবল দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ব্রত নিয়ে লেগেপড়ে আছেন বছরের পর বছর ধরে। বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত ২৬ জনের প্রত্যেকে বাইরে থাকেন। কেপ ভার্দের সঙ্গে জন্মসূত্রে জড়িত কিন্তু বিদেশে বসবাসকারী। ১৪টি দেশের ২৬টি বিভিন্ন লিগে থেকে এঁদের সংগ্রহ করা হয়েছে, যার মধ্যে লিঙ্কডইন থেকে খোঁজ পাওয়া রবের্তো ‘পিকো’ লোপেস রয়েছেন। তাঁদের সকলকে একসূত্রে গাঁথার কাজ করেছেন কোচ বুবিস্তা। ক্রেয়োলেম— তাঁদের দেশের সরকারি ভাষা। সেই ভাষায় সকলকে কথা বলতে হবে ড্রেসিংরুমে— এই নিয়ম চালু করেন। কেপ ভার্দের জাতীয় খাবার চাচুপা খাবেন সকলে, এই আবেদনও রাখেন তিনি দলের সামনে। সকলে একবাক্যে রাজি হয়ে যান। ‘‘আমার কাছে দল পরিচালনার প্রথম মন্ত্র হচ্ছে, একতা তৈরি করা। সুখী সংসার না থাকলে কোনও কিছুই সম্ভব নয়,’’ বলেছিলেন তিনি। আরও একটি কথা প্রায়ই বলেন তিনি দলকে— ‘‘ছোট দেশ বলে নিজেদের ভাববে না। ফুটবলে ছোট-বড় বলে কিছু হয় না। বরং এমন কিছু আমরা করব যাতে পৃথিবীতে যত ছোট দেশ আছে তাদের সামনে যেন উদাহরণ হয়ে উঠতে পারি।’’
ঐতিহাসিক: ম্যাচের শেষে কেপ ভার্দের ভোজ়িনা। ছবি: রয়টার্স।
বুবিস্তা এখন গর্বিত হতে পারেন যে, তারা বাকি পৃথিবীর সব ‘ছোট’দের কাছে ‘বড়’ উদাহরণ! সামনে এ বার আরও এক বড় দল আর্জেন্টিনা। সাধারণ মত হচ্ছে, ৩ জুলাই মায়ামিতে মেসিদের সামনে যবনিকা পড়বে এই রূপকথার।
কে জানে! কেপ ভার্দে যখন বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছিল, তখনও তো একই কথা বলা হচ্ছিল!
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে