FIFA World Cup 2026

বিশ্বকাপে ফরাসি বিপ্লব! চলতি প্রতিযোগিতায় খেলছেন ফ্রান্সে জন্মানো ৯৯ ফুটবলার, কী ভাবে এই দাপট এমবাপের দেশের

ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির কারণে বিভিন্ন দেশের ফুটবলার, সাপোর্ট স্টাফ, দর্শক, এমনকি, রেফারিও আমেরিকার বহু শহরে ঢুকতে পারেননি। কিন্তু ফ্রান্সে দু’দেশের নাগরিকত্ব সাধারণ বিষয়।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ ১৭:৩৮
Share:

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

প্যারাগুয়েকে হারিয়ে ফ্রান্স বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠায় কি শুধু প্যারিসে উল্লাস হবে? উদ্‌যাপন করবেন ফ্রান্সের দলে থাকা ফুটবলার ও সাপোর্ট স্টাফেরা? না! উল্লাস হবে আলজেরিয়া, সেনেগাল, হাইতি, কঙ্গো, আইভরি কোস্ট এমনকি, শেষ আটে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ মরক্কোতেও। কিন্তু কেন? কারণ একটাই। সেই সব দলেও যে রয়েছেন ফ্রান্সে জন্মানো ফুটবলার। এ বারে বিশ্বকাপে ফরাসি বিপ্লবের সাক্ষী তাঁরা।

Advertisement

ফ্রান্সের লা শাপেল গ্রাম। রাজধানী প্যারিসের উত্তর-পূর্বের এই গ্রামে বিশ্বকাপের সময় বড় বড় পর্দায় দেখানো হয় খেলা। কিন্তু এ বার আর একটা পর্দা নয়। পাশাপাশি লাগানো দু’টি পর্দা। একটিতে চলছিল ফ্রান্স বনাম নরওয়ে ম্যাচ। অপরটিতে সেনেগাল বনাম ইরাক ম্যাচ। দু’টিতেই নজর ছিল দর্শকদের।

কারণ, একটাই। সেনেগালের দলেও যে রয়েছেন ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া বেশ কয়েক জন ফুটবলার। লা শাপেলে একটা বড় অংশ আফ্রিকান। জানুয়ারি মাসে আফ্রিকান কাপ অফ নেশনসে মরক্কোকে হারিয়ে সেনেগাল জেতার পর এই গ্রামের রাস্তায় হয়েছিল বিজয়োল্লাস। যদিও পরে সেনেগালের বদলে আবার মরক্কোকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করে আফ্রিকার ফুটবল সংস্থা।

Advertisement

পাঁচ মাস পর এক দিকে যখন উসমান দেম্বেলের হ্যাটট্রিকে উল্লাস চলছে, অন্য দিকে তখন পাপা গেয়ির জোড়া গোল দেখে নাচছেন অনেকে। সব মিলিয়ে সে এক মজার দৃশ্য। ফ্রান্স ও সেনেগালের জয় সমান ভাবে উদ্‌যাপন করা হচ্ছে।

ফ্রান্সের অভিবাসন নীতি

এ বারের বিশ্বকাপের সময়ও অন্যতম আলোচনার বিষয় এই অভিবাসন নীতি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকার অভিবাসন নীতির কড়াকড়িতে বিভিন্ন দেশের ফুটবলার, ফুটবল কর্তা, সাপোর্ট স্টাফ, দর্শক, এমনকি, রেফারিকেও আমেরিকার বহু শহরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ফ্রান্স তেমন নয়। সেখানে ডুয়াল সিটিজেনশিপ বা দু’দেশের নাগরিকত্ব খুবই সাধারণ বিষয়।

যেমন সেনেগালের হয়ে জোড়া গোল করা গেয়ির জন্ম প্যারিসের কাছে একটি ছোট্ট জনপদে। সেনেগালের আর এক গোলদাতা ইলিমান এনডিয়ায়ে নরমান্ডিতে জন্মেছেন। এমন উদাহরণ প্রচুর।

আবার ফ্রান্সে খেলা উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, ডায়ট উপামেকানো, মাইক মাইগনান, অঁরেলিয়েঁ চুয়ামেনিদের নাড়ির টান রয়েছে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। কিন্তু তাঁরা ফ্রান্সের হয়ে খেলেন। ফ্রান্সের এই দলকে বিশ্বজয়ের পথে নিয়ে চলেছেন।

বিশ্বকাপের ৯৯ ফুটবলারের জন্ম ফ্রান্সে

এ বারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ৯৯ জন ফুটবলার রয়েছেন। বাকি কোনও দেশ ফ্রান্সের ধারেকাছে নেই। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে নেদারল্যান্ডস। সে দেশে জন্ম নেওয়া ৬৭ জন ফুটবলার খেলছেন এ বারের বিশ্বকাপে। জার্মানিতে জন্ম নেওয়া ৫০ ও ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া ৪৭ জন ফুটবলার রয়েছেন। কিন্তু সকলকে ছাপিয়ে শীর্ষে ফ্রান্স। যেন ফরাসি বিপ্লব চলছে বিশ্বকাপে।

১৩ দেশে খেলেন এই ৯৯ ফুটবলার

এ বারের বিশ্বকাপে খেলা ৪৮ দেশের সবগুলিতেই অবশ্য ফরাসি ফুটবলার নেই। ১৩টি দেশের হয়ে তাঁরা খেলছেন। সবার উপরে অবশ্যই ফ্রান্স। সেই দলের ২৩ জনের জন্ম ফ্রান্সে। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে আলজেরিয়া। তাদের ১৩ ফুটবলারের জন্ম ফ্রান্সে। সেখানে উল্লেখযোগ্য নাম লুকা জ়িদান। ফরাসি কিংবদন্তি ফুটবলার জ়িনেদিন জ়িদানের পুত্র। জ়িদান নিজে আলজেরিয়ার জন্মে ফ্রান্সের হয়েছে খেলেছেন। তাঁর পুত্র কিন্তু ফ্রান্সে জন্মে খেলছেন আলজেরিয়ার হয়ে।

তা ছাড়া হাইতিতে ১২, কঙ্গোয় ১১, সেনেগালে ১০, আইভরি কোস্টে ৮, টিউনিশিয়ায় ৭, মরক্কোয় ৬, কাবো ভার্দে ও ঘানায় ৩, মিশর, কাতার ও স্পেনে ১ জন করে ফুটবলার রয়েছেন যাঁরা ফ্রান্সে জন্মেছেন।

আফ্রিকায় ফরাসি উপনিবেশ

আফ্রিকার সব দেশেই ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া ফুটবলার রয়েছে। তার প্রধান কারণ, এই সব দেশে একটা সময় ফরাসি উপনিবেশ ছিল। ফলে ফ্রান্সের সংস্কৃতির সঙ্গে এই সব দেশের সংস্কৃতি মিলেমিশে গিয়েছে। যেমন, ফ্রান্স-সেনেগাল ম্যাচে সেনেগালের ফুটবলারেরা তাঁদের আদি ভাষায় কথা বলছিলেন। ফ্রান্সের দেম্বেলের মতো ফুটবলারেরা যাতে তাঁদের কথা বুঝতে না পারেন, তার জন্যই এই পরিকল্পনা।

পরবর্তীতে এই সব দেশে স্বাধীন হলেও তাদের অনেক বাসিন্দা ফ্রান্সে গিয়ে সেখানেই বসবাস শুরু করেছেন। ফলে ফ্রান্সে আফ্রিকার দেশের মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এই সব দেশের হয়ে খেলা অনেকেই প্যারিস বা অন্য শহরে জন্মেছেন। কিন্তু নিজের মাতৃভূমিকে বেছে নিয়েছেন খেলার জন্য। আবার অনেকে ফ্রান্সের হয়েই খেলছেন। ফরাসি দলে শ্বেতাঙ্গের থেকে কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলার বেশি। এই সংখ্যা সেই ইঙ্গিতই দেয়।

ফুটবলার তৈরির নতুন কারখানা প্যারিস

একটা সময় ব্রাজ়িলের সাও পাওলো বা আর্জেন্টিনার বুয়েনেস আইরেস বা স্পেনের কাতালুনিয়াকে বলা হত ফুটবলার তৈরির কারখানা। সেই জায়গা গত কয়েক বছরে নিয়ে প্যারিস। ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার ১৯ শতাংশ এখানে থাকে। কিন্তু ফ্রান্সের ফুটবলারদের একটা বড় অংশ এই শহর ও তার চারপাশ থেকে উঠে এসেছে।

ফ্রান্স ফুটবল সংস্থার টেকনিক্যাল ডিরেক্টর হুবার্ট ফৌরনিয়ের এই প্রসঙ্গে বলেছেন, “এত ছোট এলাকা থেকে এত ফুটবলার উঠে আসা অভূতপূর্ব। প্যারিসে গত এক দশকে প্রচুর ক্লাব হয়েছে। সেই সব ক্লাবে অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার খেলে। তাদের তুলে আনা হয়।”

প্যারিসে বিভিন্ন ক্লাবে অনূর্ধ্ব-৬ থেকে অনূর্ধ্ব-১২ স্তরে প্রায় ১৫০০ ফুটবলার খেলে। সেখান থেকে তাদের তুলে আনা হয়। প্যারিস ও তার আশপাশে আলজেরিয়া, সেনেগাল, মরক্কো, ঘানার মতো দেশের অভিবাসীরা থাকেন। ফলে সেখানে জন্মানো ছেলেরা প্যারিসের বিভিন্ন অ্যাকাডেমিতে ফুটবল শুরু করে। তাদের মধ্যে কেউ বড় হয়ে ফ্রান্সেই থেকে যায়। বেশির ভাগই ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ক্লাবে খেলতে চলে যায়। দেশের হয়ে খেলার সময় কেউ ফ্রান্সকে বেছে নেয়। আবার কেউ মাতৃভূমিকে।

সেই কারণেই লা শাপেলে বড় পর্দায় একই সঙ্গে ফ্রান্স ও সেনেগালের খেলা দেখানো হয়। সেখানে দেম্বেলে গোল করলে যেমন উল্লাস হয় তেমনই উৎসব হয় গেয়ির গোল দেখে। সেখানে মিলেমিশে গিয়েছে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি। মূখ্য হয়ে উঠেছে ফুটবল। যে ফুটবল পায়ে স্বপ্ন দেখে তারা। বিশ্বকাপের মঞ্চে নেমে মন জেতে। হয়ে ওঠে তারকা। আর সেই কারণে এই ফুটবলের হাত ধরেই বিশ্বকাপে শুরু হয়েছে ফরাসি বিপ্লব।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement