জুটি: পেকারম্যানের অধীনেই আর্জেন্টিনার জার্সিতে অভিষেক হয় মেসির। এখনও মুগ্ধ প্রাক্তন ছাত্রকে নিয়ে। ছবি: এক্স।
কলম্বিয়ার ফুটবলকে নবজন্ম দেওয়া চাণক্য মনে করা হয় তাঁকে। আবার লিয়োনেল মেসির ফুটবল যাত্রার একেবারে শুরুর দিকে আর্জেন্টিনার কোচ। জোসে পেকারম্যানের মনে কোনও সংশয়ই নেই যে, বিশ্বের সেরা ফুটবলারের নাম লিয়োনেল মেসি। পর্তুগাল-কলম্বিয়া ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন তিনি। টেলিমুন্ডো টিভি চ্যানেলের বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন এই বিশ্বকাপে। ম্যাচ শেষ হওয়ার কিছু ক্ষণ আগে মাঠে নামার তাড়াহুড়োর মধ্যেই বিশ্ব ফুটবলে সেরা কে এই প্রশ্নের উত্তরে বলে গেলেন, ‘‘না, না, কোনও সংশয়ই নেই। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এক জনের কথাই বলব— মেসি।’’
প্রশ্ন করা গেল, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে কেমন দেখলেন? হাত নেড়ে, মাথা নেড়ে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিলেন, একদমই সন্তুষ্ট নন সি আর সেভেনের খেলায়। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে আবার বললেন, ‘‘মেসি, মেসি।’’ পর্তুগালের এত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে রোনাল্ডো পথ দেখাতে পারলেন না, তা হলে কীসের বড় ফুটবলার? ও দিকে মেসি পরের পর ম্যাচে গোল করে চলেছেন। দু’জনের ব্যবধান যেন ক্রমশ বাড়ছে। পেকারম্যান সে রকমই মনে করছেন। কলম্বিয়ার ফুটবল ইতিহাসে সম্ভবত সব চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্বে থাকা কোচ তিনি। ২০১৪ ব্রাজ়িল বিশ্বকাপে হামেস রদ্রিগেসরা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল তাঁর কোচিংয়ে। ২০১৮-য় রাশিয়াতেও নক-আউট পর্বে গিয়েছিল। পর্তুগালের বিরুদ্ধে এই কলম্বিয়া দলকে দেখে তিনি তৃপ্ত। বললেন, ‘‘কলম্বিয়াই এই ম্যাচ ভাল খেলেছে। জেতার মতো খেলেছে। বিশ্বকাপের নক-আউট পর্ব সহজ জায়গা নয়। তবে আশা করছি, কলম্বিয়া অনেক দূর যাবে।’’
মাঠে নামার জন্য এগোচ্ছেন, ঠিক সেই সময়েই একেবারে শেষ মুহূর্তে কলম্বিয়ার গোল বাতিল হল। ডাভিনসন স্যাঞ্চেস হেডে গোল করলেন, কিন্তু ভিডিয়ো অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভার) সাহায্যে তা বাতিল করা হল। মাঠ ভর্তি কলম্বিয়ার সমর্থকদের ধিক্কার ও বিদ্রুপ শুরু হয়ে যায়। থমকে দাঁড়ালেন পেকারম্যানও। দ্রুত টিভির সামনে চলে গেলেন রিপ্লে দেখবেন বলে। রিপ্লেতে দেখা যায়, স্যাঞ্চেসের ডান পায়ের বুটের ডগাটুকু লাইনের ও পারে ছিল। এক মিলিমিটারেরও কম ব্যবধানের জন্য অফসাইড। কলম্বিয়ার সমর্থকেরা বা অনেক বিশেষজ্ঞ যদিও একমত হতে পারছেন না রেফারিদের সঙ্গে। ওয়েন রুনি যেমন তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, ‘‘আমার কাছে এটা গোল। ওরা যাই বলুক না কেন, আমার মত পাল্টাবে না।’’
কেউ কেউ এমন প্রশ্নও তুলছেন যে, এই গোল বাতিলটাই যদি এমন একটা ম্যাচে হত যার উপর কলম্বিয়ার নক-আউটে যাওয়ার ভাগ্য নির্ভর করছে, তা হলে কী হত ভাবুন! আবার অন্য পক্ষের মত, প্রযুক্তি আসার পরে ভুলের সংখ্যা অনেক কমেছে। সব খেলাতেই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক আছে। তা চলতেই থাকবে। কিন্তু এক মিলিমিটারেরর কমের জন্য কেউ অফসাইড, এই সিদ্ধান্তও নেওয়া সম্ভব হচ্ছে! পেকারম্যানের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হল, তিনিও খুব চেয়েছিলেন কলম্বিয়া এই ম্যাচটা জিতুক। শেষ মুহূর্তে গোল বাতিল যেন তাঁর মন খারাপ করে দিল।
মেসি শ্রেষ্ঠ তো বললেন। অন্য কাদের খেলা দেখে আপনার ভাল লাগছে? দু’জনের নাম করলেন প্রাক্তন ফুটবলার ও কোচ। যাঁদের দিকে সারা বিশ্বের নজর রয়েছে। ‘‘এমবাপে আর ইয়ামাল। দু’জনেই দারুণ ফুটবলার। ভাল খেলছে।’’ জীবনে অনেক কঠিন লড়াই করতে হয়েছে পেকারম্যানকে। চোট পেয়ে ফুটবলজীবন শেষ হয়ে যায় মাত্র ২৮ বছর বয়সে। এর পর বুয়েনস আইরেসের রাস্তায় এমনকি ট্যাক্সি চালিয়েও রোজগার করতে হয়েছে। ভাড়া খাটতে খাটতে দুপুরের দিকে কোথাও যদি দেখতেন বাচ্চারা ফুটবল খেলছে, সেখানে গাড়ি পার্ক করতেন। বাচ্চাদের ফুটবল দেখতে দেখতে মধ্যাহ্নভোজ সেরে নিতেন। মেসিকে স্পেনের কব্জা থেকে আর্জেন্টিনায় ধরে রাখার নেপথ্যেও তিনি। ২০০৪-এ ইউরোপ ভ্রমণের সময় তিনি স্প্যানিশ ফুটবল কর্তাদের মুখে এক খুদে প্রতিভার কথা শোনেন। তাঁরা বলাবলি করছিলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই এই প্রতিভাকে স্পেনের হয়ে যুব ফুটবলে দেখা যাবে। মেসি তখন লা মাসিয়া অ্যাকাডেমির বিস্ময় হিসেবেঝড় তুলেছেন।
২০০৪-এই অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ ছিল এবং সেখানে মেসিকে খেলানোর কথা ভেবে ফেলেছিলেন স্পেনের কর্তারা। তাঁদের এই পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনে পরিচিতদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করেন পেকারম্যান। কিন্তু সেখানে অন্য বিপত্তি। আর্জেন্টিনা ফেডারেশন বলতে থাকে, তালিকা তৈরি হয়ে গিয়েছে। এখন কী ভাবে পরিবর্তন সম্ভব? পেকারম্যান তাঁকে বোঝান, যদি এই পরিবর্তনটা না করো সারা জীবন অনুতাপ হবে। আর্জেন্টিনার হয়ে দ্রুত ফ্রেন্ডলি ম্যাচে নামানো হয় মেসিকে। না হলে হয়তো তখনই স্পেনের হয়ে যেতেন তিনি আর এখন বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার জার্সিতে এই জাদুও দেখা হত না আকাশি-নীল ও সাদার সমর্থকদের। আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির অভিষেক তাঁর অধীনে, জার্মানিতে ২০০৬ বিশ্বকাপে তাঁর অন্তর্ভুক্তির নেপথ্যেও পেকারম্যান। আজও মেসির পাশে কাউকে রাখার কথা ভাবতেই পারছেন না তিনি। ‘‘মেসিই সেরা। সবার সেরা,’’ বারবার বলে গেলেন। ফেভারিট কাদের ধরছেন এই বিশ্বকাপে? পেকারম্যান বললেন, ‘‘ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা। এই দু’টো দল খুবই ভাল খেলছে।’’ জিজ্ঞেস করা গেল স্পেন? মাথা নেড়ে যোগ করলেন, ‘‘হ্যাঁ, স্পেনও ভাল দল। আর বলব জার্মানির কথা। সহজে জার্মানিকে বাতিল করে দিলে কিন্তু ঠকতে হতে পারে।’’
পর্তুগালের গোলকিপার দিয়োগো কোস্তা সারা ম্যাচে দুর্ধর্ষ খেললেন। দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মতো রুখে না দাঁড়ালে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পর্তুগালকে আরও লজ্জা মেখে ফিরতে হত। ওই একবারই কোস্তা হার মেনেছিলেন। স্যাঞ্চেসের হেডের কাছে। কিন্তু ওই যে বলে না, ভাগ্য সাহসীদের পক্ষে থাকে। এই বিশ্বকাপে দেখা যাচ্ছে গোলকিপাররা নায়ক এবং ভাগ্য তাঁদের সঙ্গে থাকছে। প্রযুক্তির সাহায্যে স্যাঞ্চেসের গোল বাতিল হতেই তাই কোস্তার লড়াইয়েরই জয় হল। যদিও মাঠে তৎক্ষণাৎ তুমুল বিতর্ক শুরু হয়ে যায় গোল বাতিল নিয়ে। তা আরও উস্কে দিয়ে যান কলম্বিয়ার কোচ নেস্তর লোরেঞ্জো। যিনি ১৯৯০ বিশ্বকাপে দিয়েগো মারাদোনার আর্জেন্টিনা দলের হয়ে বিশ্বকাপ খেলেছেন। ম্যাচের পরে সাংবাদিক সম্মেলনে এসে লোরেঞ্জো বলে গেলেন, ‘‘স্যাঞ্চেসকে বলব, দ্রুত যেন পোডোলজিস্টের (পা এবং নখের পরিচর্যা করেন যে বিশেষজ্ঞ)পরামর্শ নেয়।’’
ড্র ম্যাচও এত উপভোগ্য হতে পারে মায়ামির স্টেডিয়ামে উপস্থিত না থাকলে বোঝা যেত না। পর্তুগাল বল নিজেদের দখলে রেখে খেলতে ভালবাসে। কলম্বিয়া সেই জায়গাতেই তাদের আঘাত করল। পজ়েশনে কলম্বিয়া ছিল ৫১ শতাংশ, পর্তুগাল ৪৯ শতাংশ। কলম্বিয়া ২৪টি শট নেয়, তার মধ্যে সঠিক নিশানায় ছিল ৬টি। পর্তুগাল ১৩টি শট নেয়, তার মধ্যে সঠিক নিশানায় ছিল মাত্র ২টি। আবার বলতে হচ্ছে দিয়োগো কোস্তার অবিশ্বাস্য গোলকিপিং না থাকলে পর্তুগাল এই ম্যাচ হেরে ফেরে। ফাইনাল থার্ডে কলম্বিয়া ঢুকেছে ৬৬ বার, পর্তুগাল সেখানেও পিছিয়ে ৫১ বার। পর্তুগালের কোচ রবের্তো মার্তিনেস বলে গেলেন, ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে খেলতে হচ্ছে বলে তিনি চিন্তিত নন। ‘‘আমরা আটটা ম্যাচ খেলতে এসেছি বিশ্বকাপে। সেটাই লক্ষ্য। এর সঙ্গে খেলব, ওর সঙ্গে খেলব না এ রকম ভেবে বিশ্বকাপ খেলতে আসা যায় না,’’ বললেন তিনি। তাঁর মতে, ‘‘বিশ্বকাপ দু’টো পর্বের। এক পর্ব শেষ হল, গ্রুপ লিগের। এ বার নক-আউট। তার সঙ্গে আগের খেলাগুলির সম্পর্ক নেই। গ্রুপ পর্বে সব দলই চায় তাদের দল দেখে নিতে।’’ রোনাল্ডো নিয়ে তিরবিদ্ধ হতে হল তাঁকে। কেন নব্বই মিনিট খেলানো হল? কোচ ফের তারকার পাশে দাঁড়ালেন তবে এটাও যোগ করলেন, ‘‘আমরা ২১ জন ফুটবলারকে দেখে নিয়েছি। রোনাল্ডো পুরো ম্যাচ খেলেছে। পরের ম্যাচে বদল করতে পারি। তবে সেটা অন্য যে কোনও ফুটবলারের মতো। রোনাল্ডোবলে নয়।’’
মায়ামিতে শনিবার ‘রোনাল্ডো রোনাল্ডো’ ভক্তিপুজোর রাত ছিল না। ছিল ‘কলম্বিয়া কলম্বিয়া’ ধ্বনিওঠার রাত!
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে