গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
বয়স হয়েছে। গতি হয়তো কিছুটা কমেছে। আগের মতো ড্রিবল করে হেলায় তিন-চার জনকে টপকে যেতে হয়তো পারেন না। গোটা দলকে একার কাঁধে টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও কমেছে। কিন্তু এখনও তাঁরাই বিশ্বকাপের মুখ। এ বারও তাঁদের নিয়েই হচ্ছে প্রচার। কেরিয়ারে ষষ্ঠ বার বিশ্বকাপে নামছেন লিয়োনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর কোনও ফুটবলার ছ’বার বিশ্বকাপ খেলেননি। রেকর্ড গড়েছেন দুই তারকা। রেকর্ডের বছরে দুই তারকার লক্ষ্য ভিন্ন। মেসি চান জোড়া বিশ্বকাপ। অপর দিকে ‘গোট’ (গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম বা সর্বকালের সেরা) বিতর্কের সমাপ্তি চার রোনাল্ডো।
শুরুটা হয়েছিল দু’দশক আগে। জার্মানিতে। দিয়েগো মারাদোনার দলে জায়গা পেয়েছিলেন লা মাসিয়া থেকে উঠে আসা ১৯ বছরের লম্বা চুলের এক ফুটবলার। প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমেই করেছিলেন গোল। সেই শুরু। চুলের দৈর্ঘ্য কমলেও তাঁর উচ্চতা দিন দিন বেড়েছে। ছুঁয়েছে আকাশ। দেশের হয়ে সর্বাধিক গোল করেছেন।
২০০৬ সালের পর আরও চারটি বিশ্বকাপ খেলেছেন তিনি। ২০১০ সালে জার্মানির কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে স্বপ্নভঙ্গ। ২০১৪ সালে দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন। কিন্তু সেই জার্মানির কাছে হেরেই রানার্স হয়ে চোখের জলে শেষ হয়েছিল প্রতিযোগিতা। ২০১৮ সালে আবার ব্যর্থতা। ফ্রান্সের হাতে বিদায়। ক্লাব ও দেশের হয়ে এত গোল করলেও আর্জেন্টিনার ফুটবল পাগল লোকেরা কোনও দিন তাঁকে মারাদোনার আসনে বসাতেন না। সেই আসন তিনি অর্জন করেছেন। গত বার জিতেছেন বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনার ট্রফিখরা কাটিয়ে স্পর্শ করেছেন মারাদোনাকে। এ বার নিজের আদর্শকে ছাপিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে নামছেন এলএম১০।
২০২২ সালে কাতারে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই মেসি জানিয়ে দিয়েছিলেন, এ বারই শেষ। বিশ্বকাপ জিতে অবসর না নিলেও বলেছিলেন, “আমি বিশ্বকাপ জিতে কেরিয়ার শেষ করতে চেয়েছিলাম। এর থেকে বেশি কী চাইতে পারি? আমার কেরিয়ার শেষের দিকে। এর পরে আর চাওয়ার কী থাকতে পারে?”
চাওয়ার আছে। অন্তত মেসির পরবর্তী সময় সেটাই বুঝিয়ে দিয়েছে। পিএসজি ছেড়ে তিনি যোগ দিয়েছেন আমেরিকার মেজর সকার লিগের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে। আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন পর্বেও খেলেছেন। গোল করেছেন। সকলের আগে বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করেছে আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপ জেতার পরেও দেশের হয়ে ট্রফি জিতেছেন মেসি। ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকা তুলেছেন তিনি। কয়েক দিন আগে একটি সাক্ষাৎকারে মেসি বলেছেন, “ফুটবল উপভোগ করছি। যত দিন উপভোগ করব, খেলব। যে দিন করব না, ছেড়ে দেব।”
গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
দেশের হয়ে ২০০ ম্যাচ থেকে আর দু’ম্যাচ দূরে মেসি। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বেই এই কীর্তি হবে তাঁর। এখনও পর্যন্ত বিশ্বকাপে ২৬টি ম্যাচ খেলেছেন মেসি। এটি রেকর্ড। এ বার সংখ্যাটা আরও বাড়বে। বিশ্বকাপে ১৩ গোল করেছেন মেসি। মিরোস্লাফ ক্লোজ়ের ১৬ গোলের রেকর্ড ভাঙতে চারটি গোল করতে হবে তাঁকে। গ্রুপ পর্বে অপেক্ষাকৃত সহজ প্রতিপক্ষ থাকায় গ্রুপেই ক্লোজ়ের রেকর্ড ভেঙে দিতে পারেন তিনি।
৩৯তম জন্মদিনের তিন দিন পর বিশ্বকাপ খেলতে নামবেন মেসি। এ বারও তাঁকে কেন্দ্রে রেখে দল বানিয়েছেন লিয়োনেল স্কালোনি। এ বারই শেষ বার ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে দেখা যাবে তাঁকে। সেই মঞ্চকে স্মরণীয় করতে নামবেন মেসি। জোড়া বিশ্বকাপ জিতে কেরিয়ার শেষ করার লক্ষ্যে তিনি।
মেসির আগেই পর্তুগালের হয়ে অভিষেক রোনাল্ডোর। ২০০৪ সালের ইউরো কাপের ফাইনালে ঘরের মাঠে গ্রীসের কাছে পর্তুগাল যখন হেরেছিল, তখন রোনাল্ডো কিশোর। সেই কিশোরের বয়স এখন ৪১ বছর। মেসির মতোই ২০০৬ থেকে লাগাতার বিশ্বকাপে খেলেছেন রোনাল্ডো। কিন্তু সাফল্য আসেনি। দেশের হয়ে সাফল্য বলতে ২০১৬ সালে ইউরো কাপ জয়। কিন্তু যত দিন না বিশ্বকাপ জিততে পারছেন, তত দিন মেসির সঙ্গে এক আসনে তিনি বসতে পারছেন কই।
২০০৬ সালের বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল পর্তুগাল। তার পর থেকে বিশ্বকাপের নক আউটে মাত্র একটি ম্যাচই জিতেছে পর্তুগাল। ২০২২ সালের শেষ ষোলোয় সুইৎজ়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে। সেই ম্যাচে বেঞ্চে ছিলেন রোনাল্ডো। অর্থাৎ, বিশ্বকাপে আট গোল করলেও নক আউটে একটিও গোল করতে পারেননি সিআর৭।
দেশের জার্সিতে ২২৬ ম্যাচ খেলেছেন রোনাল্ডো, যা রেকর্ড। এ বারই যে তিনি শেষ বার খেলবেন, তা নিজেই জানিয়েছেন। কয়েক দিন আগে রোনাল্ডো বলেন, “৪১ বছর বয়স হয়েছে। এ বার শেষ করার সময় এসেছে।” তাঁকেই অধিনায়ক করে এ বার দল সাজিয়েছেন রবার্তো মার্তিনেজ়। সহজ গ্রুপে পড়ায় এ বার নক আউটে উঠতে সমস্যা হবে না পর্তুগালের। কিন্তু নক আউটে রোনাল্ডোর কাছে গোল চাইছেন তাঁর ভক্তেরা।
২০২২ সালের বিশ্বকাপের আগে মেসি ও রোনাল্ডোর মধ্যে তুলনা হলে কে সেরা, তা নিয়ে সংশয় থাকত। রোনাল্ডোর একটি ইউরো কাপের উল্টো দিকে মেসির কাছে একটি কোপা আমেরিকা ছিল। ক্লাব ফুটবলেও দু’জনের সাফল্যের তফাত গড়া কঠিন ছিল। কিন্তু গত বারের বিশ্বকাপ সব বদলে দিয়েছে। মেসির কাছে এখন একটি বিশ্বকাপ আছে। রোনাল্ডোর কাছে নেই। তাই শেষ লড়াইয়ে বিশ্বকাপ জিতে ‘গোট’-বিতর্কের অবসান করতেই নামবেন রোনাল্ডো।