উন্মাদনা: এ ভাবেই কেপ ভার্দে-আর্জেন্টিনা ম্যাচের অনেক আগে থেকে মায়ামি আচ্ছন্ন দুই কিংবদন্তি মেসি ও মারাদোনাকে নিয়ে। ছবি: সুমিত ঘোষ।
মায়ামির বিখ্যাত সাউথ বিচ। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ট্যুরিস্টরা যেখানে ছুটে আসেন। সাদা বালির সমুদ্রসৈকত, চিত্রকলা মিশ্রিত স্থাপত্যকার্য, অভিজাত সব শপিং কমপ্লেক্স, আলো ঝলমলে রাস্তার ধারে খোলা আকাশের নীচে সব রেস্তরাঁ এবং অবশ্যই নৈশজীবনের হুল্লোড়। আমেরিকায় যত শহরে বিশ্বকাপ হচ্ছে, এর চেয়ে রঙিন গন্তব্য আর পাওয়া যাবে না। একই সঙ্গে রথ দেখা, কলা বেচা দুই-ই হয়ে যাবে। মায়াবী মায়ামির সৌন্দর্যে ভাসো, সঙ্গে বিশ্বকাপ ফুটবলের বিনোদনের আস্বাদ নাও।
আর এর সঙ্গে যদি যোগ করে দেওয়া যায় মেসির আর্জেন্টিনাকে, তা হলে তো মনে হবে বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্যের খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। মঙ্গলবার রাতে মায়ামির এই পৃথিবী বিখ্যাত সমুদ্রসৈকতে ঢুঁ মেরে মনে হল, এখানে এখন সাধারণ ট্যুরিস্ট কম। জায়গাটার দখল নিয়ে ফেলেছেন ফুটবল পর্যটকেরা। আরও পরিষ্কার করে বলতে গেলে, আর্জেন্টিনার ফুটবল ভক্তরা। মেসিদের খেলা শুক্রবার কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে। কিন্তু অনেক আগে থেকেই আকাশি-নীল ও সাদার সমর্থকেরা মায়ামিকে ডেরা বানিয়ে ফেলেছেন। সমুদ্রসৈকতে একটু আগে দেখে এসেছি, ফুটবল খেলা চলছে। বিশ্বকাপ-জ্বরের প্রভাব বোঝাই যাচ্ছে। এ বার বিচ থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখা গেল, রেস্তরাঁগুলোতে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী সব দলের পতাকা ঝুলছে। জায়ান্ট স্ক্রিনে লাইভ ম্যাচ দেখানো হচ্ছে। সেখানে বিভিন্ন দলের সমর্থকেরা খাদ্য, পানীয়ের সঙ্গে তাঁদের দলের ম্যাচ উপভোগ করছেন।
একটু এগিয়ে আর্জেন্টিনীয় সমর্থকদের যে জনজোয়ার দেখা গেল, তাতে আবার মনে হল, শহরটা এখন মেসির দলের অধীনে। একটা জায়গায় জড়ো হয়ে তাঁরা রীতিমতো মহোৎসবের মেজাজ এনে ফেলেছেন। দলের জন্য গান গাইছেন, মেসির নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছেন। এবং তিনি— আর্জেন্টিনা ফুটবলের চিরবন্দিত মহানায়ক এই মহোৎসবে থাকবেন না কী করে হয়? দু’জন সমর্থক দু’টো বড় পতাকা জোরে জোরে দুলিয়ে চলেছেন। একটাতে লিয়োনেল মেসির ছবি ও নাম রয়েছে। অন্যটাতে? দিয়েগো মারাদোনা। আবার সেই মেসি-মারাদোনা দু’জনকেই হৃদয়ে গেঁথে নিয়ে এগিয়ে চলার শপথ। আর্জেন্টিনীয়রা এই বিশ্বকাপে বারবার বুঝিয়ে দিচ্ছেন, তাঁরা শ্রেষ্ঠ দুই কিংবদন্তিকে একসঙ্গে নিয়েই এই কাপ-অভিযানে বেরিয়েছেন। কাউকে সরাবেন না। ক্যানসাস সিটি, ডালাসে একই জিনিস দেখা গিয়েছে। মায়ামিতেও মারাদোনা-মেসি অবিচ্ছেদ্য জুটিকে ঘিরে এই আবেগের বলয় উপস্থিত।
দুই প্রিয় তারকাকে নিয়ে নতুন গানও বেঁধে ফেলেছেন আর্জেন্টিনীয়রা। ড্রাম বাজিয়ে মঙ্গলবার রাতে সেই গান গাইছিলেন তাঁরা। ইংরেজি জানা এক আর্জেন্টিনীয় সমর্থকের থেকে জানা গেল, গানের সারমর্ম কী। ‘‘যতদিন মেসি আছে, আর্জেন্টিনা কাপ জিততেই থাকবে। শান্তি পাবে দিয়েগোর মন।’’ এক-এক সময় দেখে সত্যি অবাকই লাগবে। ২৫ নভেম্বর, ২০২০ মারা যান মারাদোনা। তার পর প্রায় ছয় বছর কেটে গিয়েছে। কিন্তু এখনও দেশের মানুষের হৃদয়ে তিনি কী ভীষণ ভাবেই না থেকে গিয়েছেন। ফুটবলের মঞ্চে যেন আরও বেশি করে তাঁর কথা মনে পড়ছে দেশবাসীর। ২০২২-এ কাতার বিশ্বকাপেও মারাদোনার প্রতি এই শ্রদ্ধাজ্ঞাপন চোখে পড়েছিল। তখন আর্জেন্টিনীয় ভক্তরা গান তৈরি করেছিলেন, ‘‘কাপ জিতবে মেসি, উপর থেকে আশীর্বাদ দেবে দিয়েগো। কাপ জিতবে মেসি, শান্তি পাবে দিয়েগো।’’ চার বছর পরেও যে একই দৃশ্য দেখা যাবে, সেটাই আশ্চর্যের। দিয়েগোর চলে যাওয়া যেন এখনও কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না আর্জেন্টিনীয়রা। মঙ্গলবার ভিড়ের মধ্যে দেখা গেল কারও কারও চোখে জল। একটা ব্যানার বানানো হয়েছে মেসির হাত ধরতে যাচ্ছেন মারাদোনা। যেন কাপ-জয়ের ব্যাটন তুলে দিচ্ছেন।
মারাদোনা ছিয়াশিতে মেক্সিকোতে বিশ্বকাপ জেতেন। এ বারও মেক্সিকো অন্যতম আয়োজক। যদিও মেসিরা সেখানে খেলছেন না। চুরানব্বইয়ে আমেরিকা বিশ্বকাপে ডোপ পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিসর্জিত হন মারাদোনা। সেই কালো দাগও মেসির হাত দিয়ে এ বার মুছে যাক, প্রার্থনা আর্জেন্টিনীয় ভক্তদের। অনেকেই আর্জেন্টিনা থেকে এসেছেন, মেসিদের সব ম্যাচে যাচ্ছেন। তাঁদের কয়েক জন বলছিলেন, ‘‘আর্জেন্টিনার ফুটবল মানে আমাদের কাছে অন্য আবেগ। কোনও কিছু এর পাশে আসে না। বিশ্বকাপে মেসি খেলবে আর আমরা দেখব না, হতেই পারে না।’’ মারাদোনা নিয়ে তাঁদের ভালবাসা, গর্ব, দুঃখ, যন্ত্রণা সব মিলেমিশে একাকার। ‘‘দিয়েগো নেই, ভাবতেই পারি না। বারবার ঈশ্বরকে শুধু একটাই প্রশ্ন করি। কেন ওকে এত তাড়াতাড়ি নিয়ে নিলে তুমি? মেসির হাতে কাপ ওঠাটা দেখতেই পারল না।’’ পাশ থেকে এক জন সান্ত্বনা দিয়ে বলতে থাকলেন, ‘‘দিয়েগো দেখছে, সব দেখছে। আবার কাপ জিতব আমরা। আবার কাপ জিতবে লিয়ো। আর দিয়েগো দেখবে আকাশ থেকে।’’ দেখে মনে হচ্ছিল, মায়ামির সমুদ্রপারে মেসি-মারাদোনাকে নিয়ে যেন কোনও মেলা বসেছে। রাতের মায়ামিতে যদি সাত রং মিশে রামধনু তৈরি হয়ে থাকে, তা হলে সব চেয়ে উজ্জ্বল রং আকাশি-নীল ও সাদা।
এর মধ্যেই কেপ ভার্দের প্রেসিডেন্ট শিরোনামে। নস্ত্রাদামুর ভঙ্গিতে তিনি পূর্বাভাস করেছেন, আর্জেন্টিনাকে ১-০ হারাবে তাঁদের দল। স্পেন, উরুগুয়ের মতো দলকে আটকে দিয়ে কেপ ভার্দের নক-আউটে ওঠা এ বারের বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা কাহিনি। এর পরেও মেসির আর্জেন্টিনাকে ফেভারিট ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারছেন না কেউ। ভোজ়িনাদের দেশের প্রেসিডেন্ট জোস মারিয়া নেভেস অবশ্য বলছেন, ‘‘যখন কোনও দলকে ঘিরে প্রত্যাশা কম থাকে আর সেই দলের মধ্যে ক্ষুধার্ত ভাব থাকে, তারা অনেক রকম চমকই সৃষ্টি করতে পারে। আমরা জেতার জন্য খেলব। আমার মনে হয় কেপ ভার্দে ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারাবে।’’ পঞ্চাশ হাজার আর্জেন্টিনীয় সমর্থক হার্ড রক স্টেডিয়ামে উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গিয়েছে। আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন ফিফার কাছে অনুরোধ জানিয়েছে, যদি টিকিট পড়ে থাকে তা হলে ছাড়া হোক যাতে তাদের দেশের আরও মানুষ খেলা দেখতে আসতে পারেন। আকাশি-নীল ও সাদা জার্সিধারীদের চিৎকারের মাঝে কেপ ভার্দের প্রেসিডেন্টের ভবিষ্যদ্বাণী তলিয়ে যায় না ভেসে ওঠে, সেটাই দেখার।
আর শুধু তো স্টেডিয়াম নয়, আর্জেন্টিনীয় সমর্থকেরা থাকবেন পুরো মায়ামি শহর জুড়েই। যাঁরা টিকিট পাবেন না, তাঁরা সমুদ্রসৈকতে যাবেন। জায়ান্ট স্ক্রিনের সামনে বসেই মেসিদের জন্য গলা ফাটাবেন। ফ্যান ফেস্টেও নিশ্চিত ভাবেই উপচে পড়া ভিড় হবে। ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলেন বলে এমনিতেই মেসির কাছে অনেকটা দ্বিতীয় ঘর এই শহর। আর্জেন্টিনীয়রা সেটাকেও আরও রং চড়িয়ে প্রথম ঘরের মেজাজই এনে দেবেন বলে মনে হচ্ছে। মেসির হয়তো মনে হবে, রোসারিয়োতে আছি।
রঙিন মায়াবী তৈরি মেসি, মারাদোনা ও আর্জেন্টিনা মহোৎসবের জন্য!
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে