FIFA World Cup 2026

মেসিদের কাপ-যাত্রায় সঙ্গী দুই যাযাবর

নদীর পাড়টা খুব সুন্দর করে বাঁধানো। অনেকে হাঁটছেন-দৌড়চ্ছেন। একটু উপরে উঠলে সবুজ ঘাসের মখমলের মতো ‘লন’। এত যত্ন করে সাজানো যে, সেখানে বসেই দিব্যি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়।

সুমিত ঘোষ

শেষ আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬ ০৯:১৯
Share:

সঙ্গী: বাইকের পাশে গ্যাস্টন। ক্যারাভ্যানে রোমেরো। ছবি: সুমিত ঘোষ

সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে বিখ্যাত সেই মিসৌরি নদী। ভারতে গঙ্গা-যমুনার মতোই আমেরিকায় মিসিসিপি-মিসৌরি। ভূপেন হাজ়ারিকার গানটা কে ভুলতে পারে? “আমি গঙ্গার থেকে মিসিসিপি হয়ে ভলগার রূপ দেখেছি।” আমেরিকার বৃহত্তম নদী মিসৌরি, দ্বিতীয় বৃহত্তম মিসিসিপি। ক্যানসাস সিটিতে বেশিটাই মিসৌরির উপস্থিতি এবং যাঁকে নিয়ে ফুটবলবিশ্ব এই মুহূর্তে তোলপাড় তিনি এই ঐতিহাসিক নদীর পারেই ঘাঁটি গেড়ে বসে আছেন। ভূপেন হাজ়ারিকার গানটার মতোই তিনি এক শহর থেকে আর এক শহর ঘুরবেন কাপ-রক্ষার অভিযানে।

আমি এক যাযাবর! ফুটবল যাযাবর! টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের খোঁজে ঘুরে বেড়ানো এক যাযাবর!

নদীর পাড়টা খুব সুন্দর করে বাঁধানো। অনেকে হাঁটছেন-দৌড়চ্ছেন। একটু উপরে উঠলে সবুজ ঘাসের মখমলের মতো ‘লন’। এত যত্ন করে সাজানো যে, সেখানে বসেই দিব্যি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়। একটা ট্রাম লাইনও রয়েছে, ট্রাম যাতায়াত করতেও দেখা গেল। পাশেই খুব বড় বড় করে লেখা— ‘রিভারফ্রন্ট’। এই স্টেশনে দাঁড়িয়ে নদীটার দিকে পিঠ দিয়ে সামনে তাকালে সেই হোটেল— ‘ওরিজিন’। চারদিকে ব্যারিকেড করা এবং এক-দেড় হাতের ব্যবধানে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাহারারত নিরাপত্তারক্ষী। মাথার উপরে টহল দিয়ে চলেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টার।

সাধারণত এ রকম নিরাপত্তার বেড়াজাল দেখলে আশেপাশে যাওয়ার দুঃসাহসই দেখানোর কথা নয়। তার উপর ট্রাম্পের আমেরিকা। ‘আইস’ (ফেডারেল ইমিগ্রেশন এজেন্সি)) ধরলে তো আর রক্ষে নেই। কিন্তু এখানে সম্পূর্ণ উল্টো ছবি। অন্তত শ’দুয়েক মানুষ শুধু নদীর দিকটাতেই ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছেন। অন্য দিকটায় আরও অনেকে রয়েছেন। নিরাপত্তারক্ষীরা কড়া নজর রাখছেন কিন্তু ঠেলে-গুঁতিয়ে ভিড় সরানোর চেষ্টা করছেন না। প্রত্যেকের গায়ে আকাশি নীল ও সাদা জার্সি। প্রত্যেকের পিঠে সেই একটাই নাম! শুধু একটাই প্রার্থনা— যদি একবারটি তাঁর মুখদর্শন করা যায়। মনে হচ্ছে বিশ্বকাপে আগামী এক মাস যেখানে এই আকাশি নীল ও সাদার দল যাবে, এই ভিড়টাও তাদের সঙ্গী হবে।

ওই যে ভূপেন হাজ়ারিকার গানটা— আমি এক যাযাবর। ফুটবল যাযাবর...!

দেখেশুনে মনে হবে, এই উনচল্লিশের মুখে দাঁড়িয়েও বিশ্বকাপের ‘পোস্টারবয়’ তিনি— লিয়োনেল মেসি! চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো প্রথম ম্যাচে ব্যর্থ হয়েছেন। অন্য সময় হলে হয়তো তা-ও পার পেয়ে যেতেন সি আর সেভেন। কিন্তু মেসির অমন অকল্পনীয় প্রদর্শনীর ঠিক পরে-পরেই রোনাল্ডো-বিপর্যয় ঘটল বলেই আরও চোখে লাগছে। মেসির পাশে রেখে ফুটবলভক্তরা বিধানই লিখে ফেলছেন— মেসি উড়ছেন, রোনাল্ডোর পতন! দুই মহাতারকাকে ঘিরে বন্দনা আর নিন্দার দুই পৃথিবী আগামী কয়েক দিনে পাল্টাবে কি না, সময় বলবে। কিন্তু আপাতত স্কোরলাইন হচ্ছে— লিয়োনেল মেসি ৩, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ০! আচ্ছা, নব্য যুগের তারকাদের মেসি বন্দনার কথা শুনতে চান? আর্লিং হালান্ড উড়ানের মধ্যে থেকে কী প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, শুনুন, ‘‘মেসি অবাস্তব, অবিশ্বাস্য! পাগল না হলে এমন খেলা যায় না!’’

নদীর দিকটায় অনেকগুলো গাড়ি পার্ক করা। সামনের একটা বড় ভ্যানের দিকে চোখ চলে গেল। বিশাল করে দিয়েগো মারাদোনার সেই অমর ছবি লাগানো রয়েছে। ছিয়াশি বিশ্বকাপ জয়ের পরে বিশ্বকাপ হাতে ধরে চুম্বন করছেন। সামনেই পাওয়া গেল ভ্যানের মালিককে। তিনি, হার্নান রোমেরো জানালেন, এ বারের বিশ্বকাপে ঘুরছেন এই ক্যারাভ্যান নিয়ে। ভ্যানের ভিতরে নিয়ে গেলেন। চমকে উঠতে হয়, কী নেই সেখানে! বড় বেডরুম। চার-পাঁচ জনে দিব্যি শুয়ে পড়তে পারে। দু’টো স্নানঘর, ছোট্ট একটা রান্নার জায়গা। কিন্তু সেরা আকর্ষণ, মিনি ফুটবল মিউজ়িয়াম। দিয়েগো মারাদোনার নানা দুর্লভ সব ছবি রয়েছে। টি-শার্ট রয়েছে মারাদোনার ছবি দেওয়া। চুরুট মুখে সেই বিখ্যাত ছবি-সহ টি-শার্ট দেখা গেল। আর্জেন্টিনার তিন কাপ-জয়ী অধিনায়কের ছবি-সহ একটি কোলাজ় রয়েছে— মারিয়ো কেম্পেস ১৯৭৮, দিয়েগো মারাদোনা ১৯৮৬, লিয়োনেল মেসি ২০২২। আর রয়েছে বিশাল একটি ড্রাম। মেসির হ্যাটট্রিকের রাতে ক্যানসাস সিটির স্টেডিয়ামে যা উপস্থিত ছিল।

রোমেরো খুব আবেগ নিয়ে ভ্যানের ভিতরটা সাজিয়েছেন। এক দিকটায় সোনালি অতীত— মারাদোনার আর্জেন্টিনা। অন্য দিকটা উজ্জ্বল বর্তমান এবং আশার আগামী— মেসির আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনার জার্সি আর টুপি দেখালেন রোমেরো, ‘‘এই দু’টোতে আমার দেশের সব তারকাকে সই করিয়েছি। কেম্পেস করে দিয়েছে। অপেক্ষা করছি মেসির জন্য। এখানে পেয়ে যাব আশা করছি।’’ এর পরেই গলা ধরে আসে তাঁর, ‘‘দিয়েগো নেই। ওঁর সইটা আর কখনও পাব না।’’ হঠাৎই কেমন যেন ভারী হয়ে ওঠে ক্যারাভ্যানের ভিতরটা। আশ্চর্য লাগে। ছ’বছর হয়ে গেল মারাদোনা চলে গিয়েছেন। কিন্তু এই বিশ্বকাপে মেসিদের ম্যাচ কভার করতে গিয়ে প্রত্যেক মুহূর্তে টের পাওয়া যাচ্ছে, এখনও আর্জেন্টিনীয়দের হৃদয় জুড়ে কত প্রবল ভাবে থেকে গিয়েছেন তিনি!

রোমেরো নিজেকে সামলে নিয়ে জানালেন, আর্জেন্টিনা যেখানে-যেখানে খেলবে, সব জায়গায় এই ক্যারাভ্যান নিয়ে যাবেন। এখান থেকে বেরিয়ে পড়ছেন ডালাসের উদ্দেশে। সেখানে গ্রুপের অন্য দু’টি ম্যাচ খেলবে আর্জেন্টিনা। সোমবার (ভারতীয় সময় অনুযায়ী মঙ্গলবার ভোরে) অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে, তার পর ২৭ তারিখে জর্ডনের মুখোমুখি তারা। রোমেরো যা হিসাব দিলেন, মেসিরা যদি ফাইনালে ওঠেন, ভ্যানে করে দশ হাজার মাইল ঘোরা হবে তাঁর। খাওয়াদাওয়া, বিশ্রাম, ঘুম— সব এই ভ্যানের ভিতরে।

আবার সেই গানটা কানে বেজে উঠল— আমি এক যাযাবর। ফুটবল যাযাবর...!

রোমেরোর সঙ্গে এ বার হোটেলের পিছন দিকটায় গিয়ে আর এক জনের দেখা পাওয়া গেল। আর্জেন্টিনার পতাকা লাগানো একটা মোটরবাইকের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। সিটের উপরে একটা হেলমেট রাখা, তার রংও আকাশি নীল ও সাদা। গায়ে আর্জেন্টিনার জার্সি। ইনি গ্যাস্টন বেনিতেজ়। মেসির আর্জেন্টিনা নিয়ে উন্মাদনার আর এক বিস্ময়কর মুখ। আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর করডোবা থেকে এই মোটরবাইক চালিয়ে এসেছেন। রোমেরোর মতো ইংরেজি বলতে পারেন না গ্যাস্টন। তাই রোমেরো অনুবাদ করে দিচ্ছিলেন। তাতে যা জানা গেল, বিশ্বাস করাই কঠিন। দু’মাস ধরে মোটরবাইক চালিয়ে আমেরিকায় পৌঁছেছেন গ্যাস্টন। এখন রোমেরোর মতোই মেসিদের সব ম্যাচের কেন্দ্রে ঘুরবেন। ম্যাচের আগে-পরে যতটুকু সময় পাচ্ছেন, ঘুমিয়ে নিচ্ছেন। রোমেরোর মতো ভ্যান নেই, তাই গ্যাস্টনকে চলতে-ফিরতে রাস্তাতেই খাবার খেয়ে নিতে হচ্ছে।

সেই গান। আমি এক যাযাবর। ফুটবল যাযাবর...!

কথা বলার ফাঁকেই দেখা গেল, অনেকে হোটেলের সামনের দিকটায় ছুটছেন। বাচ্চাদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন বাবারা আর সকলে মোবাইলে ভিডিয়ো তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কী ব্যাপার? না, লিয়োনেল মেসিকে নাকি দেখা গিয়েছে! সেই সকাল থেকে যাঁর জন্য পড়ে থাকা। মুহূর্তে ‘মেসি, মেসি’ জয়ধ্বনিতে ভরে উঠল মিসৌরি নদীর পাড়। কেউ কেউ বলতে থাকলেন, কফি কাপ হাতে নাকি নীচে নেমে এসেছিলেন মহানায়ক। আদৌ কি এসেছিলেন? নাকি শয়নে-স্বপনে-জাগরণে ভক্তদের চোখে তিনিই ভেসে উঠছেন? কে জানে!

এমনিতে কোচ স্কালোনি ম্যাচের পরের দিন খুব কড়া অনুশীলন রাখেননি। শরীরকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য হাল্কা দৌড়ঝাঁপ করলেন আর্জেন্টিনার ফুটবলারেরা, যেখানে সংবাদমাধ্যমকে অল্প কিছু ক্ষণের জন্য থাকতে দেওয়া হয়েছিল। মেসি এসেছিলেন এবং সতীর্থদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টায় মেতে থাকলেন। স্কালোনি ম্যান ম্যানেজমেন্টে অসাধারণ। বিশ্বকাপের সময় ‘ফ্যামিলি ডে’ চালু করেছেন। মেসির জাদুতে আলজিরিয়ার বিরুদ্ধে দুর্দান্ত জয়ের পরে ‘ফ্যামিলি ডে’ ঘোষণা করেছিলেন তিনি। এই দিনটির বিশেষ তাৎপর্য হচ্ছে, তোমাকে হেটেলের মধ্যেই থাকতে হবে এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। ইচ্ছে হল পরিবারের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে পারো। আর্জেন্টিনার কয়েক জন ফুটবলার পরিবারের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ সারলেন। মেসি সম্ভবত হোটেলের মধ্যেই ছিলেন স্ত্রী আন্তোনেল্লা ও তিন পুত্র— থিয়াগো, মাতেও এবং সিরোকে নিয়ে। আর্জেন্টিনীয় সাংবাদিকদের থেকে শোনা গেল, হ্যাটট্রিকের বলটি তিনি রেখে দিয়েছেন এবং তাতে সতীর্থদের দিয়ে সই করিয়ে নিয়েছেন। বার্সেলোনায় বাড়ি আছে মেসির। সেখানে ফুটবল জাদুঘর করেছেন। হয়তো সেই সংগ্রহশালায় আর একটি অনন্য স্মারক যুক্ত হল।

ক্যারাভ্যানের সামনে দিয়ে ফিরে আসতে গিয়ে আবার মারাদোনার ছবিটাতে চোখ পড়ল। মেক্সিকোয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিশ্বকাপে চুম্বন করছেন। এখনও কী জীবন্ত। দেখে মনে হবে, ওই তো চুরুট মুখে সামনের হোটেলে ঢুকছেন মেসিদের উদ্বুদ্ধ করতে। রোমেরো আকাশের দিকে তাকালেন। মনে হল দিয়েগোকে খুঁজলেন। আর ক’টা দিন কি এই পৃথিবীতে তুমি কাটিয়ে যেতে পারলে না বন্ধু? পরক্ষণেই মনে পড়ল, তিনি দিয়েগো মারাদোনাও তো ভূপেন হাজ়ারিকার গানটার মতোই ছিলেন। আজ এখানে, কাল সেখানে। কোনও কিছুর তোয়াক্কা না করে জীবনের আকাশে উড়ে বেড়ানো এক মুক্ত বিহঙ্গ!

যাযাবর...আমি এক যাযাবর!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন