চ্যাম্পিয়ন। রোলাঁ গারোয়।
কী বলব? অবিশ্বাস্য!
তেতাল্লিশ বছর বয়স। পেশাদার সার্কিটে তিন দশকের বেশি হয়ে গিয়েছে। বিরাট লম্বা নয়। নয় দুর্দান্ত পাওয়ারফুলও। হাতে সেই অর্থে কোনও সিগনেচার উইনিং শট নেই। বুম-বুম সার্ভিস নেই।
আছে ঈশ্বরপ্রদত্ত জন্মগত অসাধারণ রিফ্লেক্স। নিজের খেলাটার উপর অফুরান ভালবাসা। সাফল্যের অদম্য খিদে। যত বড় উপলক্ষ্য, ততই নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা। যত বড় লড়াই, ততই বড় যোদ্ধা হয়ে ওঠার দক্ষতা।
আমার কাছে এটাই ডেফিনিশন লিয়েন্ডার পেজের।
স্বীকার করতে কোনও সঙ্কোচ নেই, এ বছর টেনিস ট্যুরে লিয়েন্ডার নিয়ে কোনও আশা রাখিনি। নিজের ভাবনা আরও গাঢ় হচ্ছিল, যখন ও এটিপি ট্যুরে কিছু না করতে পেরে অনেক বছর বাদে এক ধাপ পিছিয়ে চ্যালেঞ্জার ট্যুরে নামতে আরম্ভ করল। ষোলো বছর পর প্রথম কোনও চ্যালেঞ্জার খেতাব জিতল। এতেই তো বোঝা যায়, কত বছর পর লিয়েন্ডারের টেনিসের রেলিগেশন ঘটেছিল!
কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, আসলে ওটা ছিল সত্যিকারের বড় টুর্নামেন্টের জন্য ভেতরে ভেতরে লিয়েন্ডারের তৈরি হওয়া। চ্যালেঞ্জার থেকে চ্যালেঞ্জটা নেওয়া। ফরাসি ওপেনে শনিবার মার্টিনা হিঙ্গিসকে নিয়ে শুধু মিক্স়ড ডাবলস চ্যাম্পিয়নই হল না লিয়েন্ডার, ‘ডাবল কেরিয়ার গ্র্যান্ড স্ল্যাম’ করে ফেলল। আগেই ডাবলসে চারটে মেজর জিতেছে। মিক্স়ড ডাবলসে কেবল রোলাঁ গারোতে চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাকি ছিল এত দিন। লিয়েন্ডারের নাছোড় মনোভাব আরও বোঝা যাবে, যদি ভাবেন ছেলেটা এ বারের আগে মাত্র একবারই প্যারিসে মিক্সড ডাবলস ফাইনাল খেলেছে। সেই ২০০৫-এ। মানে টার্গেটে পৌঁছতে প্রায় এক যুগ লেগে রইল! ডাবলসেও এক রকম নতুন পার্টনার মাটকোয়াস্কিকে নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল উঠে বিখ্যাত ব্রায়ান ভাইদের টিমের সঙ্গে প্রচণ্ড লড়ে তবে হেরেছে। বৃষ্টির ধাক্কায় একই দিনে মিক্স়ড ডাবলস কোয়ার্টার-সেমিফাইনাল খেলতে বাধ্য হয়ে দু’টোই জিতেছে। আবার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ফাইনালে নেমে সেটাও জিতেছে ম্যারাথন সুপার টাইব্রেকে। জন্মগত অনবদ্য ফিটনেস বাদে যেটা করা অসম্ভব! এর সঙ্গে বরাবরের নিয়মিত জিম, যোগাভ্যাস, সাইক্লিং, রিহ্যাব, পরিমিত খাওয়া, সিগারেট-মদ না ছোঁয়া, সহজ-সরল জীবনযাপন লিয়েন্ডারকে চিরসবুজ রেখেছে।
ফাইনালের প্রতিপক্ষদের মধ্যে সানিয়া মির্জা বিশ্বের এক নম্বর মেয়ে ডাবলস প্লেয়ার। যার সঙ্গী ডডিগকে টিভিতে দেখলাম টাইব্রেকে যখন ৮-৮ চলছে, দুশো কিমির উপরে সার্ভ করতে। কিন্তু সেটার কী অসাধারণ রিটার্ন-ই না করল লিয়েন্ডার! ম্যাচ পয়েন্টে হিঙ্গিসও সুপার্ব গ্রাউন্ডস্ট্রোক নিয়েছে। সানিয়ারা ম্যাচে বেশ কয়েকটা লুজ মিস করেছে। কিন্তু এ সব বলে লিয়েন্ডারের কৃতিত্বকে একবিন্দু ছোট করা যাবে না। গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনালে এক সেট পিছিয়ে পড়ার প্রবল চাপ নিয়ে ৪-৬, ৬-৪ (১০-৮) ক্লোজ ম্যাচ জেতার জন্য কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।
এর পরে রিও অলিম্পিক্সে লিয়েন্ডার মিক্সড ডাবলসের জন্য ভারতীয় দলে নির্বাচিত না হলে সেটা চরম দুর্ভাগ্যের হবে। সানিয়া-লিয়েন্ডার দু’জনেই ডান কোর্টের প্লেয়ার, মূলত ফোরহ্যান্ড প্লেয়ার, সবই ঠিক। কিন্তু এটাও ঠিক, যে ছেলেটার টপ লেভেলে খেলার অভিজ্ঞতা পঁচিশ বছরের বেশি, ডাবলস-মিক্স়ড ডাবলস মিলিয়ে আঠারোটা গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতা হয়ে গেল, সে নিশ্চয়ই বাঁ কোর্টেও ভাল খেলার জন্য নিজের যা-যা অ্যাডজাস্ট করা দরকার, করে ফেলার ক্ষমতা ধরে!