ট্রফির ঠিকানা আজও লিখে দেয় রিজার্ভ বেঞ্চ

ভারী বল থেকে হালকা বল। লোহার স্পাইক থেকে চেঞ্জার বুট। জল-কাদার মাঠ থেকে গোললাইন প্রযুক্তি। জার্সির রং হোক বা চুলের স্টাইল। মাঠের ঘাসের ডিজাইন হোক বা প্লেয়ারদের সাপ্তাহিক বেতন।

Advertisement

সোহম দে

শেষ আপডেট: ২৯ জুলাই ২০১৬ ০৩:৪৮
Share:

২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল। মারিও গটজেকে পরিবর্ত হিসেবে নামিয়ে কাপ নিয়ে যান জার্মান কোচ জোয়াকিম লো।

ভারী বল থেকে হালকা বল। লোহার স্পাইক থেকে চেঞ্জার বুট। জল-কাদার মাঠ থেকে গোললাইন প্রযুক্তি। জার্সির রং হোক বা চুলের স্টাইল। মাঠের ঘাসের ডিজাইন হোক বা প্লেয়ারদের সাপ্তাহিক বেতন। ফুটবল খেলাটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে দেখা যাবে যুগে যুগে কতটা পাল্টেছে বিউটিফুল গেম-এর আবহ।

Advertisement

কোথাও যেন প্রাচীন এসে মিশেছে আধুনিকের সঙ্গে। যে যোগসূত্র ঘটিয়েছে সাইলাইনের সেই খুপচি জায়গাটা। যেখানে ঠাঁই পান যাঁরা, তাঁদের কাছে ফুটবলটা বোধহয় ‘বিউটিফুল’ নয়। বরং যন্ত্রণা আর কষ্টের। দলের বাকিরা যখন মাঠের ভেতর স্কিল প্রদর্শনীতে ব্যস্ত, মাঠের ধারে ওই খুপচি জায়গার বাসিন্দাদের অপেক্ষা করতে হয় কখন তাঁর নম্বর আসবে! ভাবেন, কখন আমিও সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটাব!

যে খুপচি জায়গাটার নাম— রিজার্ভ বেঞ্চ।

Advertisement

প্রশ্ন উঠতে পারে, আধুনিক আর প্রাচীন‌ ফুটবলের যোগসূত্র হঠাৎ কী করে ঘটাল রিজার্ভ বেঞ্চ? উত্তর পরিষ্কার— যে বেঞ্চ কোচের অগতির গতি, সেটাই তো দেশ বা ক্লাবকে ফুটবলের সবচেয়ে বড় সম্মান এনে দিচ্ছে। সে ১৯৬২ হোক বা ২০১৪।

দু’বছর আগের মারাকানার রাত কার না মনে আছে? প্রায় সবাই পল দ্য অক্টোপাসের মতো ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন রাতটা হবে মেসির। উল্টে গোল করে ইতিহাস গড়ে যান ‘জার্মান মেসি’ মারিও গটজে। যাঁর কয়েক মিনিটের ক্যামিও দেশকে বিশ্বফুটবলের শৃঙ্গে বসিয়েছিল। সম্প্রতি ইউরো ফাইনালেও সবার নজর ছিল রোনাল্ডোর উপর। কিন্তু চোট পেয়ে মাঠ ছাড়া সিআর সেভেনের স্বপ্নপূরণ করে দিয়ে যান অনামী এডের। যাঁর তথ্য দিতে উইকিপিডিয়াও ব্যর্থ। ঠিক সে রকমই ১৯৬২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের এক জন আমারিল্ডো ছিলেন। যিনি কিংবদন্তি পেলের জায়গায় খেলে ব্রাজিলকে দ্বিতীয় বার বিশ্বকাপ জিততে সাহায্য করেন।

রিজার্ভ বেঞ্চ আজও ট্রফি দিয়ে যাচ্ছে দেশ বা ক্লাবকে। বড়-বড় ফাইনালে প্রথম এগারো যখন নিষ্প্রভ থাকছে, রিজার্ভ ফুটবলাররাই আসল কাজটা করে যাচ্ছেন। ঠিক যেমন দু’বছর আগে প্রথম আইএসএল ফাইনালে করেছিলেন মহম্মদ রফিক। গোটা টুর্নামেন্টে রিজার্ভে বসে দেখতে হয়েছিল ফিকরুর ‘ডিগবাজি’। প্রতিদিন ভাবতেন, আজ হয়তো সুযোগ পাব। কিন্তু কোচ হাবাস টিম লিস্ট ঘোষণা করার পরেই সমস্ত আশা নিরাশায় পাল্টে যেত রফিকের। কিন্তু ফাইনালে যখন কেরল ব্লাস্টার্সের বিরুদ্ধে ম্যাচ যাচ্ছে একস্ট্রা টাইমের দিকে, তখন রফিক-ই তো হয়ে উঠেছিলেন আটলেটিকো দ্য কলকাতা-র ত্রাতা। রিজার্ভ থেকে নেমে ডেভিড জেমসের মতো বিশ্বকাপার গোলকিপারকে যেন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গোল করে এডিকে-কে চ্যাম্পিয়ন করেন।

রিজার্ভে বসে থাকার রাগটাই কি তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল ফাইনালে? ‘‘রাগের থেকেও বেশি কষ্ট হত। কোনও প্লেয়ার রিজার্ভে বসতে চায় না। সবার ইচ্ছে থাকে প্রথম দলে খেলার। কিন্তু সবার ভাগ্য হয় না। খুব খারাপ লাগত। কষ্ট পেতাম। তাই ফাইনালে নামার সময় শুধু প্রার্থনা করেছিলাম যাতে ম্যাচে প্রভাব ফেলতে পারি,’’ দু’বছর আগের মুম্বইয়ের ডি ওয়াই পাটিল স্টেডিয়ামে ফিরে গেলেন যেন রফিক।

তাই শুধু বিশ্বকাপ বা ইউরো নয়। আধুনিক ফুটবলে ক্লাব লড়াইতেও রিজার্ভ বেঞ্চ থেকে অনেক গোল আসে। আধুনিক ফুটবলের রীতিই হয়ে গিয়েছে রিজার্ভেও ‘ইম্প্যাক্ট ফুটবলার’ রেখে দেওয়া। রিয়াল মাদ্রিদ বা ম্যাঞ্চেস্টার সিটির মতো দলে তো রিজার্ভ বেঞ্চও কয়েক কোটি টাকার। যাদের কাজ পরের দিকে নেমে ক্লান্ত বিপক্ষের ফায়দা তুলে নিজেদের দলকে জেতানো। নিরানব্বই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে পরিবর্ত সোলজায়ারের সেই লক্ষ টাকার গোল আজও হয়তো প্রতিটা ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড ভক্তের মোবাইলে সেভ করা আছে।

আই লিগে বহু মরসুম কোচিং করানো ডেরিক পেরিরা বলছিলেন, ‘‘বড় ক্লাবরা তো তাই করছে। প্রচুর ভাল ফুটবলার রাখছে। যে কারণে রিজার্ভ থেকেও দারুণ সমস্ত বিকল্প পেয়ে যাচ্ছে কোচেরা।’’ দু’বারের জাতীয় লিগ জয়ী কোচ সুব্রত ভট্টাচার্য আবার মনে করছেন, রিজার্ভের সাফল্যের পিছনে মনস্তাত্তিক কারণ আসল। ‘‘রিজার্ভ বেঞ্চ প্রভাবশালী কারণ, ফুটবলারদের আত্মসম্মান বোধ কখনও কমার নয়। আমিও রিজার্ভে বসেছি। আবার কোচ হিসেবে রিজার্ভ থেকে ফুটবলার নামিয়ে জিতিওছি,’’ বললেন তিনি।

কী দাঁড়াল?

না, মেসি-রোনাল্ডো নিয়ে যখন লাফালাফি হয় ভুলেও যেন উপেক্ষা করবেন না মাঠের ধারের বেঞ্চকে। কে জানে, হয়তো ট্রফির ঠিকানা সেখানেই লেখা রয়েছে!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement