তিনি একই সঙ্গে ধস্ত আর তৃপ্ত! এবং দুই বিপরীতধর্মী মানসিকতায় থাকা বিরাট কোহলি কিন্তু বিশ্বাসের সঙ্গেই বলে দিচ্ছেন, তাঁর চেন্নাই ওয়ান ডে সেঞ্চুরি ক্রিকেটজীবনের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং একটা ইনিংস!
‘‘এক দিনের ক্রিকেটে এটা আমার জীবনের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং সেঞ্চুরি। চ্যালেঞ্জিং ইনিংসও,’’ চিপকে তাঁর ১৩৮ রানের দাপটে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৩৫ রানে হারিয়ে ভারত সিরিজ ২-২ করার পরের দিন বিসিসিআই-এর ওয়েবসাইটে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন কোহলি।
সেখানে কোহলির অকপট ব্যাখ্যা, ‘‘আমার কেরিয়ারের ভীষণ চ্যালেঞ্জিং সেঞ্চুরি কারণ, বিপক্ষের বোলিং আক্রমণকে বিচার করে দেখতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকান বোলিং আক্রমণ এমনিতেই বরাবর যথেষ্ট ভাল। তার উপর এই সিরিজে ওরা প্রায় সারাক্ষণ ঠিক এরিয়ায় বল করে চলেছে। চেন্নাইয়ের পিচও এমন কিছু গতিশীল ছিল না যে, আপনি সারাক্ষণ বাউন্ডারি পাবেন। সে জন্য আমাকে গতকাল প্রচুর সিঙ্গলস রান নিতে হয়েছে। শুধু খুচরো রান কুড়নোই নয়। চেষ্টা করতে হয়েছে ফিল্ডারদের প্রায় সারাক্ষণ বাউন্ডারিতে ঠেলে রাখার। যাতে ওই ফাঁকফোকরগুলো দিয়ে একের জায়গায় দুই, দুয়ের জায়গায় তিন রান দৌড়ে নিতে পারি। এই ইনিংসটায় প্রচুর দৌড়েছি। সম্ভবত যে জন্য শেষের দিকে আমার ক্র্যাম্প ধরে গিয়েছিল। চেন্নাইয়ে দুপুরের গরমে অতক্ষণ ব্যাট করা, প্রচুর রানিং বিটুইন দ্য উইকেটস —বেশ কঠিন। কিন্তু শেষমেশ ম্যাচটা জিততে পেরে এখন সবটাই আমার মনে হচ্ছে— গ্রেট।’’
কোহলির বৃহস্পতিবারের সেঞ্চুরি ইনিংসে ৬৬টা সিঙ্গলস রান ছিল। যেটা তাঁর বিচারে, সচরাচর তিনি যে কন্ডিশনে ক্রিজে নামেন তার চেয়ে বেশ কঠিন পরিবেশে অত সিঙ্গলস নিয়েছেন। ‘‘আমার ৭০-৭৫ রান করা অবধি মাত্র তিনটে বাউন্ডারি ছিল। আর দু’টো ছক্কা। সেই তুলনায় ন’বার দু’টো করে রান নিয়েছি দৌড়ে। যেটা খুব বেশি বার আমার ইনিংসে হয় না। আসলে গতকাল আমার সারাক্ষণ টনটনে চিন্তা ছিল যে, ওদের আটোসাঁটো বোলিংয়ের বিরুদ্ধে যত বেশি পারব, স্ট্রাইক রোটেট করব।’’ সঙ্গে কোহলি আরও যোগ করেছেন, ‘‘দিনটা আসলে এমনই ছিল যে, আপনার শরীর সাধারণত যতটা সহ্য করতে পারে, তার চেয়ে আপনাকে অনেক বেশি খাটতে হবে। সত্যি বলতে কী, আরও ঘণ্টাখানেক যদি আমি ক্রিজে থাকতাম হয়তো মাথা ঘুরেই পড়ে যেতাম।’’
কোহলি স্বীকার করছেন, সিরিজে ১-২ পিছিয়ে থাকা অবস্থায় বড় সেঞ্চুরি করতে পেরে আরওই বেশি ভাল লাগছে তাঁর। আপনার টিম জিতেছে আর সেই ম্যাচে আপনার সেঞ্চুরি আছে— স্বভাবতই দিনটা আমার কাছে স্পেশ্যাল। ফের তিন নম্বরে নেমেছিলাম বলে আমার সামনে টিমের প্রয়োজনে কিছু করার দরকার ছিল। জানতামই, এটা ২৬০-২৭০ রানের পিচ। কিন্তু এক বার সেঞ্চুরিতে পৌঁছবার পর যতটা সম্ভব রানের গতি বাড়নোর চেষ্টা করেছি।’’
বোর্ডের ওয়েবসাইট সাক্ষাৎকারে কোহলি ফাঁস করেছেন, ‘‘ব্যাট করতে করতে আমার ক্র্যাম্প ধরে গিয়েছিল। কিন্তু তখন নিজেকে মনে-মনে বোঝালাম, যদি আমি আরও ৩০-৩৫টা রান করে যেতে পারি, তা হলে টিম তিনশো ছুঁয়ে ফেলতে পারে। চেন্নাইয়ের কঠিন কন্ডিশনে আমার নিজেকে ছাপিয়ে গিয়ে ব্যাটিংয়ের চেষ্টা করার আসল কারণই ছিল দলকে তিনশোয় পৌঁছে দেওয়া। দিনের শেষে নিজেদেরকে সিরিজে সমান-সমান অবস্থায় দেখাটা গ্রেট! এখন মুম্বইয়ে রবিবার শেষ ম্যাচে সব কিছুই ঘটতে পারে। অনেক কিছুর জন্যই সে দিন খেলা হবে।’’
এ বছরের গোড়ায় বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সেঞ্চুরি করার ১৩ ম্যাচ পরে কোহলি ফের ওয়ান ডে শতরান পেলেন। কিন্তু কোহলি বলে দিচ্ছেন, ‘‘তবে কঠিন সময়েও নিজের উপর আমার পূর্ণ আস্থা ছিল। নিজের ক্ষমতা নিয়ে কোনও দ্বিধা ছিল না।’’ সঙ্গে কোহলি যোগ করেছেন, ‘‘পরিসংখ্যান, নম্বর-টম্বর হল জনসাধারণের জন্য। যাঁরা তুলনা, বিশ্লেষণ, সমালোচনা, প্রশংসা এই সমস্ত করে থাকেন। কিন্তু লোকেদের পক্ষে বোঝা খুব কঠিন, এক জন ক্রিকেটার কোনও কোনও সময় তার ব্যাটিংকে সত্যিই উপভোগ করে আর সেই সময়টাকে সেই ক্রিকেটারই একমাত্র বুঝতে পারে। বাইরের পৃথিবী নয়।’’ কোহলির কথায়, ‘‘আমি সব সময় বড় রান করার চেষ্টা করি যাতে সেটা দলকে জেতাতে সাহায্য করতে পারে। রাজকোটে আগের ম্যাচে আমার ব়ড় রান দলের প্রয়োজনে শেষমেশ লাগেনি বলে আমি হতাশ হয়ে পড়েছিলাম।’’
কোহলি নিশ্চিত, ওয়াংখেড়েতে রবিবার ছুটির দুপুরে এই সিরিজের গ্র্যান্ড ফিনালের জন্য তিনি যথাসময়ে ঠিক প্রস্তুত হয়ে যাবেন। ‘‘চিপকে গতকাল দক্ষিণ আফ্রিকা ইনিংস শুরুর সময় আমার ক্র্যাম্প ঠিক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মাঠের ভেতর যখন ঢুকছি সামান্য মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। তখন ফিজিও পরামর্শ দিলেন, কোনও ঝুঁকি না নিতে। তাতে নাকি আমার মাসল ছিড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আর সে রকম কিছু অনর্থ ঘটে গেলে দেড় মাস লেগে যেত মাঠে ফেরত আসতে! সামনে একে তো বিরাট টেস্ট সিরিজ আছে। তার উপর কাল বাদে পরশুই মুম্বইয়ে বিরাট ওয়ান ডে। আমার সাতাশ হতে চলেছে। এখন থেকে তো আরওই নিজের শরীরের দিকে বাড়তি নজর দেওয়া দরকার।’’