স্কুলের সামনে গলায় পদক নিয়ে রবীন্দ্রনাথ। নিজস্ব চিত্র।
এক কামরার ছোট্ট মাটির বাড়ি জুড়ে দারিদ্রের ছাপ স্পষ্ট। বাবার একটি সেলাইয়ের মেশিনই ভরসা সংসারের ভরণপোষণের জন্য। পুষ্টিকর খাবার তো দূর। দু’বেলা পেটভরে খাবারই জোটে না। তবু লড়াই ছাড়েনি পটাশপুরের পালপাড়া গ্রামের রবীন্দ্রনাথ নায়েক। সম্প্রতি রাজীব গাঁধী খেল অভিযানে অনূর্ধ্ব ষোলো বালক বিভাগে রাজ্যের হয়ে খেলতে গিয়ে জাতীয় স্তর থেকে সে ছিনিয়ে এসেছে ব্রোঞ্জ পদক। যোগদা সৎসঙ্গ পালপাড়া বিদ্যালয়ের এই মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর এখন একটাই স্বপ্ন কলকাতায় থেকে ভালো প্রশিক্ষণ নিয়ে রাজ্য ও দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, রবীন্দ্রনাথের এই সাফল্য শুধুমাত্র খেলায় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নয়। তাকে লড়তে হয়েছে দারিদ্র, অপুষ্টি, ক্রীড়া সরঞ্জামের অভাব, প্রশিক্ষণহীনতা, ইনডোরে খেলার সুযোগ না পাওয়া-সহ অনেক কিছুর বিরুদ্ধে। রবীন্দ্রনাথের স্কুলের লের ক্রীড়া শিক্ষক নরেন্দ্রনাথ মাইতি জানান, ২০১৩ সালে জেলা থেকে প্রথম হয়ে রাজ্যে গেলেও তখন এতটাও সফল হতে পারেনি সে। পরের বছর স্কুলের পক্ষ থেকে তাকে ক্রীড়া সরঞ্জাম কিনে দেওয়া হয়। স্থানীয় দু’জন প্রশিক্ষককে দিয়ে ক’দিনের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। হয়তো তার ফলেই এমন সাফল্য। তবে নরেন্দ্রনাথবাবু এক বাক্যে স্বীকার করেন, ‘‘ভালো ফল করার জন্য ওর পরিশ্রম আর জেদ দেখে অবাক হতে হয়।”
রবীন্দ্রনাথের বাবা সুভাষচন্দ্র নায়েক ছেলের সাফল্যে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। বলেন, ‘‘বাড়ির সামনে ছোটো মাঠে ছেলেবেলা থেকেই খেলত। কতবার এমন হয়েছে র্যাকেট, কক কিনে দেওয়ার বায়না করায় মেরেছি। আজ খুব কষ্ট হচ্ছে।’’ তবু রবীন্দ্রনাথ বরাবর পাশে পেয়েছে পাড়ার এক দাদা দেবপ্রতিম জানার। তিনিই খেলার সরঞ্জাম কিনে দিয়ে উৎসাহ যোগাতেন। দেবপ্রতিমবাবু বলেন, “ওর খেলা ছিল অন্যদের থেকে একেবারে আলাদা। আর একটু সুযোগ পেলে স্বর্ণপদকই নিয়ে আসত।”
রবীন্দ্রনাথের নিজের উপলব্ধি, খোলা মাঠে আর ঘরে খেলার অনেক পার্থক্য। প্রশিক্ষণ না থাকায় ভুল ও কায়দা কত পার্থক্য গড়ে দিল। সল্টলেকে ও চেন্নাইতে গিয়ে খেলে সে বুঝেছে প্রশিক্ষণ পাওয়া কতটা জরুরি। তাই তার আবেদন, সরকারিভাবে তাকে প্রশিক্ষণের সুযোগ। পটাশপুর-১ ব্লকের যুগ্ম বিডিও সৌমাল্য ঘোষের আশ্বাস, ‘‘এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ওর সাফল্য বুঝিয়ে দিয়েছে ও কতটা সম্ভাবনাময়। প্রশাসনের তরফে কীভাবে সহায়তা করা যায় তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”