বেপরোয়াদের জীবনে সাফল্য যেমন চোখ ধাঁধানো, যন্ত্রণাও কম নয়। জোসে মোরিনহোর অবস্থা দেখে এখন সেটাই মনে হচ্ছে।
টিভি-তে দেখলাম, লিভারপুলের কাছে ১-৩ হারার পর পঞ্চান্ন সেকেন্ডের টিভি সাক্ষাৎকারে, ‘আমার কিছু বলার নেই’ কথাটাই আউড়ে গেলেন শুধু। তবে যন্ত্রণাটা চোখে-মুখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। ছাঁটাই হওয়ার মুখে থাকা কোচের এ রকম আচরণ অস্বাভাবিক নয়। তবে মোরিনহোকে যারা চেনে তারা বোধহয় এই সাংবাদিক সম্মেলনে আশ্চর্য হবে না।
ঘটনাটা অনেক দিন আগে শুনেছিলাম। পোর্তো থেকে সে বার চেলসিতে ঘটা করে নিয়ে আসা হয়েছে মোরিনহোকে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী কোচ। আড়াই বছরে ছ’ছটা ট্রফি দিয়েছেন পোর্তোকে। সাংবাদিক সম্মেলনে প্রশ্ন উঠল, আপনার লক্ষ্য কী? মোরিনহো বললেন, ‘সেরা দল আর সেরা কোচ নিয়ে যা থাকা উচিত। আমায় উদ্ধত ভাববেন না। আমি ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন। আমি দ্য স্পেশাল ওয়ান।’
অহংকারী, একগুয়ে, জেদি আর বেপরোয়া। মোরিনহোর সঙ্গে শব্দগুলো তখন থেকেই বোধহয় জুড়ে গিয়েছিল। যার ছায়া থেকে কোনও দিন বেরিয়ে আসেননি, আসার চেষ্টাও করেননি। এই বেপরোয়া ভাবটাই মোরিনহোকে ফুটবল বিশ্বে আলাদা একটা জায়গা করে দিয়েছিল। এটাই মোরিনহোর ইউএসপি।
শুনেছিলাম সে বারই নাকি মোরিনহো চেলসির মালিক রোমান আব্রামোভিচকে সটান বলে দিয়েছিলেন, আমিই সেরা। আমি যা ঠিক করব সেটাই হবে। তার বছর দুয়েক পর মাইকেল বালাককে চেলসিতে আনা নিয়েও শোনা যায় খুব গোলমাল হয়েছিল আব্রামোভিচ আর মোরিনহোর। মোরিনহো চাননি বালাককে নিতে। প্রথম কয়েকটা ম্যাচে তো বালাকের মতো প্লেয়ারকেও মাঠে নামাননি।
আসলে মোরিনহোর মতো মানসিকতার কোচরা স্বাধীন ভাবে কাজ করতে ভালোবাসেন। আমার চেয়ে বড় কেউ নেই। এই অহংটা থাকা এদেরই মানায়। তার জন্য ক্লাব কর্তাদের সঙ্গে ঝগড়া হবে। চাপ বাড়বে। কিন্তু এই বেপরোয়ারাই সাফল্যের এভারেস্টে উঠে যায় অক্লেশে। মোরিনহোর কেরিয়ারেই সেটা স্পষ্ট। পনেরো বছরের কোচিং জীবনে পোর্তো, ইন্টারমিলানকে ইউরোপ সেরা করেছেন। তিনটে প্রিমিয়ার লিগ, দুটো সেরি আ, লা লিগা, লিগ কাপ, কোপা দেল রে কী নেই মোরিনহোর ট্রফি ক্যাবিনেটে। এঁরা নিজের সিদ্ধান্তে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টিকে থাকে। না পোষালে ছেড়ে চলে যেতে দু’বার ভাবে না। যেমন মোরিনহোর রিয়াল মাদ্রিদ ছাড়া। আবার এঁরাই যখন গাড্ডায় পড়েন, তখন এতদিনের পাত্তা না দেওয়া সমালোচকদের ছোবলটাও বেশি পড়ে। এখন যেমন মোরিনহোকে সহ্য করতে হচ্ছে।
স্বাগত ক্লপ। বিদায় মোরিনহো? ইপিএলের প্রথম মরসুমে চেলসি-বধ করে লিভারপুল কোচ য়ুরগেন ক্লপ (বাঁ দিকে)। ছবি: এএফপি
প্রিমিয়ার লিগে কোনওদিন মোরিনহো ছ’টা ম্যাচ হারেননি। এ বার ১১ ম্যাচেই সেই রেকর্ড ছুঁয়েছেন। শনিবার রামিরেজের গোলে এগিয়ে গিয়েও চেলসিকে তিন গোল হজম করতে হল। হতেই পারে। যে কোনও কোচের জীবনেই সাফল্য-ব্যর্থতা আছে। কিন্তু মোরিনহো নিজের সাফল্যটা এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছেন বলেই এখন সমালোচনায় ঝলসাতে সবাই পা বাড়িয়ে রয়েছে। কেউ দেখছে না গত বারই টিমটাকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন মোরিনহো। এই টিমটার এক নম্বর গোলকিপার থিবাও কুর্তোয়া, ফর্মে থাকা স্ট্রাইকার পেদ্রো নেই। এডেন হ্যাজার্ড তো স্বীকারই করে নিয়েছে, জীবনের সবচেয়ে খারাপ ফর্ম যাচ্ছে। ফাব্রেগাস, ফালকাওরাও সেই ছায়া থেকে বেরতে পারেনি। তাই মোরিনহোর হাতে বিকল্প কোথায়!
মোরিনহোর মতো কোচরা তারকা ছাড়াও যে কোন টিমকে চ্যাম্পিয়ন করতে পারেন। পোর্তোকে নিয়েই সেটা দেখিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু এ বার সেই সুযোগটাও তিনি পাচ্ছেন না। টিমটা সে ভাবে সেট না করায়। হতেই পারে। তার জন্য মোরিনহোকে আর একটু সময় দিতে হবে। যখন খারাপ সময় আসে কিছুই কাজ করে না। মোরিনহোর কোনও পরিকল্পনাও এখন কাজ করছে না।
কিন্তু এত সমালোচনার পরও মোরিনহোর জনপ্রিয়তা কমেনি। চেলসির একটা প্লেয়ারও কিন্তু মোরিনহোর বিরুদ্ধে কিছু বলেনি। শনিবার তো টিভিতে দেখলাম স্টেডিয়ামে চেলসি সমর্থকরা মোরিনহোর সমর্থনে লিখেছে, গলা ফাটিয়ছে। আমার মনে হয়, মোরিনহোর বেপরোয়া ব্যক্তিত্বটা সমর্থকরা যেমন পছন্দ করে, প্লেয়ারদেরও তেমনই উদ্বুদ্ধ করতে পারে। কোচ পাশে আছে এই ভরসাটা থাকে বলেই ফুটবলাররা কোচের জন্য জান দিয়ে দিতে পারে। কিন্তু কখনও কখনও এমনও সময় আসে জান বাজি লাগিয়েও লাভ হয় না। মোরিনহোর ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে।
মোরিনহোরা ঠিক উঠে দাঁড়ান। মোরিনহো উঠে দাঁড়াবেন। কিন্তু আব্রামোভিচ সেই সময়টা মোরিনহোকে দেবেন, না ছেঁটে ফেলবেন বলা মুশকিল। তবে চলে গেলেও মোরিনহোদের ছোট করা যায় না। ২০০১-এ মোহনবাগানকে জাতীয় লিগ চ্যাম্পিয়ন করার পর এয়ারপোর্টে নেমেই শুনেছিলাম আমায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাতে আমাকে ছোট করা যায়নি। মোরিনহোও এই খারাপ সময়টা ঠিক কাটিয়ে উঠবেন। সেটা চেলসিতেই হোক বা অন্য কোনও ক্লাবে।