লেডিকেনি আজও স্বাদু, কিন্তু লেডি ক্যানিংয়ের সমাধি ঘিরে অবহেলার পাহাড়

লেডি ক্যানিং-এর সমাধি।

বাংলার মিষ্টি নিয়ে গবেষণা করছেন যে সমস্ত ঐতিহাসিক তাঁদের কথা থেকেই জানা যাচ্ছে যে এই বাংলার একটি অতি প্রসিদ্ধ মিষ্টান্ন ‘লেডিকেনি’ আসলে তৈরি হয়েছিল তৎকালীন বড়লাট ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ভাইসরয় লর্ড ক্যানিং-এর স্ত্রী শার্লট লেডি ক্যানিং-এর জন্মদিনের স্মারক বা উপহার হিসেবে। আনুমানিক ১৮৫৬-য় কলকাতার বিখ্যাত ভীমচন্দ্র নাগের মিষ্টান্নের দোকানে জন্ম নিয়েছিল সুস্বাদু এই মিষ্টি! আজও কিন্তু জনপ্রিয় হয়ে রয়ে গিয়েছে এই মিষ্টি। অথচ যাঁর নামে এই মিষ্টির নামকরণ, তিনি কিন্তু আজও নিভৃতে রয়ে গিয়েছেন। ব্যারাকপুর থেকে মৃত্যুর পর ওঁর স্মৃতি স্থানান্তরিত হয়ে এখন রয়েছে সেন্ট জন’স চার্চে।

জর্জ এবং জোয়ান ক্যানিং-এর কনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন চার্লস ক্যানিং। লন্ডনের ব্রম্পটনে ওঁর জন্ম হয়। ১৮৩৩ সালে তিনি গণিতে দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৩৬-এ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউজ অব কমন্সের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে হাউজ অব লর্ডসের সদস্য হন। ব্রিটিশ রাজকীয় জাদুঘর বা গ্রেট ব্রিটেনের পোস্টমাস্টার জেনারেল হিসাবে কাজ করেও তিনি সরকারি কাজে প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় দেন। ১৮৫৬-র ফ্রেব্রুয়ারিতে তিনি ভারতের গভর্নর-জেনারেল হিসাবে নিয়োজিত হন। সস্ত্রীক তিনি চলে আসেন এই দেশে। ভারত সম্পর্কে ওঁদের আগ্রহ ছিল বরাবরেরই। অতএব, এই দেশ সম্পর্কে বিশদে জানবার তাগিদেই তিনি এবং তাঁর স্ত্রী দু’জনে মিলে এদেশের অধিবাসীদের উপর একটি সমীক্ষা করেছিলেন। ১৮৫৭ ও ১৮৬৮ সালে ওঁদের এই কাজ ‘পিপল অব ইন্ডিয়া’ শিরোনামে নামে আটটি খণ্ডের বই আকারে প্রকাশ পায়। ১৮৫৭-য় ভারতে সিপাহী বিদ্রোহের সূচনা হয়। এই সময় ওঁর কাজ এবং সাহসী ভূমিকার জন্য তিনি প্রশংসিত হন। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ভাইসরয় হিসাবে তিনি দায়িত্বভার নেন। ‘দ্য ভিসি কাউন্ট ক্যানিং’ নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন। তিনি আর্ল ক্যানিং এবং মৃত্যুর কিছু আগে নাইট অব গার্টার উপাধি লাভ করেন।


শার্লট লেডি ক্যানিং

ভারতের সামগ্রিক উন্নতির জন্য তিনি সবসময় সচেষ্ট ছিলেন। স্ত্রীর সান্নিধ্য এবং উৎসাহ পেয়েছেন কাজের ব্যস্ততার মাঝেই। এই উপমহাদেশে তিনিই প্রথম কাগজের মুদ্রার প্রচলন করেন। মাতলা নদীর তীরে একটি আধুনিক বন্দর তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। এ জন্য ওখানকার জঙ্গল কেটে তৈরি হয়েছিল একটি দফতর। এখন ক্যানিং-এর স্মৃতি বিজড়িত সেই ‘পোর্ট ক্যানিং কোম্পানি’র বাড়িটি টিঁকে রয়েছে কালের গ্রাস বাঁচিয়ে! ১৮৭২-এ সেই সংস্থার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। লর্ড ক্যানিং-এর ভারতবাসের শেষদিকে ওঁকে খুব দুঃসময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। তখন কাজের চাপ ছিল অনেক! তিনি যখন তরাই অঞ্চলে কাজে ব্যস্ত সেই সময় স্বাস্থ্য পরিবর্তনের জন্য ওঁর স্ত্রী ছিলেন দার্জিলিঙে, ওখানেই ‘জাঙ্গল ফিভার’ বা ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। দ্রুত ওঁকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয় কলকাতায়, কিন্তু অবস্থা ক্রমশ খারাপের দিকে যেতে থাকে। অবশেষে ১৮৬১-র নভেম্বরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন রাজভবনে। লেডির প্রিয় জায়গা ছিল ব্যারাকপুরে গঙ্গার তীর। অতএব ভোরবেলা ঘোড়ার শকটে ওঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে। ওঁর ইচ্ছেকেই সম্মান জানিয়ে  অতঃপর সেই গঙ্গাতীরে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে ওঁকে সমাধিস্থ করা হয়।

আরও পড়ুন: ভিক্টোরিয়ার গম্বুজটির ভিতরে কী আছে জানেন?

বর্তমানে এখানে রয়েছে পুলিশ ট্রেনিং স্কুল। ১৮০০ সালে লর্ড ওয়েলেসলি এই জায়গায় ব্যারাকপুর পার্ক নির্মাণে উদ্যোগী হন। পরে লেডির সমাধির করুণ দশা দেখে তার উপরে একটি ছাউনি তৈরি করে দেওয়া হয়, কিন্তু দুর্ভাগ্য, রঙিন পাথরের কারুকাজ করা সেই সমাধি সংরক্ষণ করা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কলকাতায় কোন নিরাপদ জায়গায় সমাধিটি স্থানান্তরিত করা হবে, কিন্তু দেহ শায়িত থাকবে ওখানেই। অতঃপর সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেন্ট জন’স চার্চে জায়গা বাছা হয়। ব্যারাকপুর থেকে শুধুমাত্র শিল্পগুণসম্পন্ন সমাধিটি পুনঃস্থাপিত হয় বর্তমানের সেন্ট জন’স চার্চ প্রাঙ্গণে। ব্রিটিশ অ্যাডমিরাল ওয়াটসন, যিনি কলকাতাকে ইংরেজ শাসনাধীনে নিয়ে আসেন, লর্ড ব্রাবোর্ন, লেডি ক্যানিং এবং অন্য ইতিহাসখ্যাত ব্যক্তিত্বদের ভাষ্কর্য মূর্তিও রয়েছে এখানে।


লেডি ক্যানিং-এর সমাধি রয়েছে এই সেন্ট জন’স চার্চে।

১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত হয়েছিল কলকাতার অনন্য সাধারণ স্থাপত্যের এই গির্জাটি। এই গির্জার প্রবেশপথের একপাশে নীরবে রয়েছে মার্বেল পাথরে তৈরি লেডি ক্যানিং-এর এই সুদৃশ্য সমাধিটি। সমাধির বেদিতে রয়েছে মোজাইকের কাজ। আর ওপরে রয়েছে অপূর্ব কারুকাজ সমন্বিত একটি সেনোটাফ এবং লতাপাতার নকশাযুক্ত একটি হেডস্টোন। এখানে লেখা রয়েছে, ‘Honours and praises, written on the tomb, are at best a vain glory, but that her charity, humility, weakness, and watchful faith in her Saviour will, for that Saviour’s sake, be accepted of God, and be to her a glory everlasting, is the firm trust of those who knew her best, and most dearly loved her in life, and who cherish the memory of her departed. Sacred to the memory of Charlotte Elizabeth, eldest daughter of Lord Stuart De Rothesay, born at Paris, 31st March, 1817 : died at Calcutta 18th November, 1861 : wife of Charles John Viscount and Earl of Canning, first Viceroy of India.’ স্ত্রীর সমাধিক্ষেত্রের এই লেখাটি লর্ড ক্যানিং নিজেই লিখেছিলেন ২২ নভেম্বর, ১৮৬১-তে। স্ত্রীর প্রতি অসাধারণ ভালবাসার নিদর্শন হয়ে ইতিহাসের পাতায় রয়ে গিয়েছে এই লেখা। ও দিকে স্ত্রীর মৃত্যুর পর ভগ্ন মনোরথ হয়ে অবসরপ্রাপ্ত ক্যানিং ইংল্যান্ডে ফিরে যান ওই বছরেই। পরের বছর, অর্থাৎ ১৮৬২-র ১৭ জুন তিনিও পরলোকগমন করেন লন্ডনে। ২১ জুন ওঁকে সমাধিস্থ করা হয় ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে।

সেন্ট জন’স গির্জার উপর দিয়ে আজও যখন মৃদু বাতাস বয়ে যায়, গাছের একটি-দু’টি পাতা ঝরে পড়ে পাথরের উপর। সে কি বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস!