—প্রতীকী চিত্র।
লক্ষ্মীর বাহন প্যাঁচা। গজলক্ষ্মীর দু’পাশে হাতিও দেখা যায়। ধনসম্পদের দেবীর পুজোতে সেই প্যাঁচা বা হাতির ডাকের প্রয়োজন হয় না ঠিকই কিন্তু এই অঞ্চলের দেবী উপাসনা শেষ হয় শিয়াল ডাকলে তবেই। পালিত হয় ‘শিয়াল ডাকা লক্ষ্মীপুজো’। লক্ষীপুজো সাধারণত হয় দুর্গাপুজোর পরে। আবার মাড়োয়ারি সম্প্রদায় লক্ষ্মীপুজো করে কালীপুজোর দিনে। এ ছাড়াও অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে পুজো হয়। তবে পূর্ব বর্ধমানের কাঞ্চননগরে পয়লা মাঘের দিন সন্ধ্যায় পালিত হয় ‘শিয়াল ডাকা লক্ষ্মীপুজো’।
এক সময়ে ছিল বর্ধমান রাজাদের (জমিদার) রাজধানী ছিল কাঞ্চননগর। একসময়ে সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসাবেও পরিচিত ছিল এই এলাকা। নদীর ধারে অনেক ঝোপ ও জঙ্গলও ছিল। প্রায় দেড়শো বছর আগে মিঠাপুকুরের কাছে নতুন করে রাজবাড়ি নির্মিত হয়।
রাজবাড়ি স্থানান্তরিত হওয়ার পরে কাঞ্চননগর অবহেলিত হয়ে পড়ে। সেখানকার জঙ্গলে আগে শিয়াল,বাঘরোল,ময়ূর-সহ অসংখ্য পশু-পাখির বাস ছিল। উদ্বাস্তুরা আসার পর থেকে কাঞ্চননগরে আবার জনবসতি বাড়তে শুরু করে। এখন জমজমাট জনবসতি। পূর্ববঙ্গ থেকে অনেকে এসেছেন, আবার অনেকে শুরু থেকেই বংশপরম্পরায় গিয়েছেন এখানে। তাঁদেরই অনেক পরিবার পালন করেন ‘শিয়াল ডাকা লক্ষ্মীপুজো’-র উপাচার।
এইরকমই এক পরিবার হল সিংহ পরিবার। এই পরিবারের বধূরা আজও আন্তরিকভাবে উপাচার মেনে পুজো করে আসছেন। দেড়শো বছরের পিতলের দেবী বিগ্রহের আরাধনা করা হয়। বেশ কিছু নিয়ম আছে এই পুজোর। দেবী আরাধনার জন্য প্রয়োজন হয় মুলোর শাক ফুল। এছাড়াও লাগে বিভিন্ন ধরনের ফল,মূল, ফুল-সহ- আরও অনেক কিছু। পিতলের রেকাবি এই পুজোর অন্যতম উপকরণ। সন্ধ্যার পরে ব্রাক্ষণ এসে পুজোয় বসেন। উপাচার, শিয়ালের ডাক শুনতে পেলে তবেই পুজো শেষ হবে। তারপর প্রসাদ বিতরণের পালা।
গত শতাব্দীতে এই পরিবারের বধূ চারুবালা এলাকায় সুপরিচিত ছিলেন। ১০৭ বছর আগে মিশনারী স্কুলে শিক্ষিত নারী এই পুজোর প্রচলন করেছিলেন। তাঁর পুত্রবধূ দুর্গাবালা শ্বাশুড়ির প্রচলিত সেই প্রথা মেনে চলেছেন। বর্তমানে লেখক ও সাংবাদিক উদিতের ঘরণী কমলা ৩০ বছর ধরে পুজোর দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। বিভিন্ন প্রথা মেনে এ বারেও হল বিশেষ রীতির পুজো।
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, উদিত সিংহের পিতা ভবানীচরণ ছিলেন প্রখ্যাত স্বর্ণকার। বছরে দু’বার জেনানা মহলে গিয়ে রানিদের গয়না পালিশ করতেন তিনি। এছাড়াও আইএফএ শিল্ডে ১০ বছর এনগ্রেভিং করতেন ভবানীচরণ।
এ বছর পয়লা মাঘ পড়েছে বৃহস্পতিবার। লক্ষ্মীবারেই দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা হল পরিবারের লক্ষ্মীশ্রী কামনায়। প্রদীপ, ধূপ জ্বেলে বিভিন্ন উপাচার মেনে হয়ে গেল ঐতিহ্যবাহী ‘শিয়াল ডাকা লক্ষ্মীপুজো’।
এখন অবশ্য শিয়াল অনেক কমে গিয়েছে। সহজে দেখা বা ডাক শুনতে পাওয়া যায় না। জনবসতির চাপে শিয়ালরা এখন অন্যত্র ঠাঁই নিয়েছে। তাই শিয়াল না থাকলেও অতীতের প্রথা স্মরণ করে সেই নামাঙ্কিত পুজো আজও হয়ে চলেছে।