নাচিন্দা। ছবি: সংগৃহীত।
বেরিয়ে পড়তে মন চাইছে, কিন্তু যাবেন কোথায়? জায়গার কথা ভাবতে বসলেই বেশ কিছু নাম মনে আসে, কিন্তু পরক্ষণেই তা বাতিল হয়ে যায়। তবে এই কনকনে ঠান্ডায় বেরিয়ে পড়তে পারেন রাজ্যেের আনাচ-কানাচে। স্থানীয় অনেক মন্দির রয়েছে, যেগুলিকে ঘিরে ছড়িয়ে রয়েছে বিবিধ কিংবদন্তি। কোনও মন্দিরের সৌন্দর্য তার নির্মাণ কৌশলে, কোনটি আবার চর্চিত তার ইতিহাসের কারণে। তিন জেলার এমন তিন মন্দিরের সন্ধান রইল। সুযোগ পেলে বাড়ির কাছেরটিতে একবার ঢুঁ মেরে আসতেই পারেন।
হংসেশ্বরী মন্দির। ছবি: সংগৃহীত।
হংসেশ্বরী মন্দির: হুগলির বাঁশবেড়িয়াতেই রয়েছে এমন এক মন্দির, যার নির্মাণশৈলীর সঙ্গে বাংলার অন্য মন্দিরের সাদৃশ্য মিলবে না। মন্দিরের গঠনের পিছনে রয়েছে তন্ত্রোক্ত বৈশিষ্ট্য। নির্মাণশৈলীর মধ্যেই নিহিত গূঢ় অর্থ। ৫ তলা এই মন্দিরের ১৩টি চূড়া। চূড়ার মাথায় পদ্মের কুঁড়ি। জানা যায়, ১৭৯৯ সালে এই মন্দির নির্মাণ শুরু করেছিলেন বাঁশবেড়িয়ার রাজা নৃসিংহ দেব। তাঁর মৃত্যুর পর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন তাঁর স্ত্রী শঙ্করী দেবী।
এই মন্দিরে আরাধ্যা দেবী হংসেশ্বরী। কার্যত তিনি মা কালীরই এক রূপ। পদ্মের উপর দেবী অধিষ্ঠিতা। চতুর্ভুজা মূর্তির গাত্রবর্ণ নীল। উপরের বাম হাতে তরবারি, নীচের বাম হাতে নৃমুণ্ড, উপরের ডান হাতে অভয় মুদ্রা, নীচের ডান হাতে আশীর্বাদের ভঙ্গিমা। মন্দির চত্বরে সুসজ্জিত বাগিচা। মূল মন্দিরের পাশেই অনন্ত বাসুদেবের মন্দির। মন্দিরগাত্রের টেরাকোটার সূক্ষ্ম কারুকাজ মনোমুগ্ধকর।
কী ভাবে আসবেন
হাওড়া-কাটোয়া লাইনে বাঁশবেড়িয়া স্টেশনে নেমে হংসেশ্বরী মন্দিরে আসতে পারেন। ব্যান্ডেল স্টেশনে নেমে অটো বুক করেও এখানে আসতে পারেন। কলকাতা থেকে দিল্লি রোড ধরে গাড়ি নিয়েও আসতে পারেন। দূরত্ব মোটমুটি ৫০ কিলোমিটার।
কোথায় ঘুরবেন
বাঁশবেড়িয়া থেকে ঘুরে নিতে পারেন ত্রিবেণীর কাছে জাফর খাঁ গাজির দরগা। বাংলায় ইসলামিক স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন এটি। এ ছাড়াও ঘুরে নিতে পারেন ব্যান্ডেল চার্চ ও বড় ইমামবড়া।
শ্যামচাঁদ মন্দির। ছবি: সংগৃহীত।
শ্যামচাঁদ মন্দির: শান্তিপুরের নামের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে শ্রীচৈতন্যেরও। সন্ন্যাস গ্রহণের পরে প্রথম শান্তিপুরেই এসেছিলেন চৈতন্য। শান্তিপুর কিন্তু শুধু চৈতন্যতীর্থই নয়,এই অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে নানা ঐতিহাসিক নিদর্শনও। রয়েছে গিয়েছে ইংরেজ আমলের ভগ্নপ্রায় নীলকুঠিও। এখানকার দর্শনীয় স্থানের মধ্যে অন্যতম হল ইটের তৈরি আটচালার শ্যামচাঁদ মন্দির।
শোনা যায়, শান্তিপুরের ব্যবসায়ী রামগোপাল খান চৌধুরী ১৭২৬ খ্রিস্টাব্দে এটি নির্মাণ করেন। এ-ও শোনা যায়, সে যুগে এটি তৈরি করতে প্রায় ২ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছিল। ইটের তৈরি আটচালার মন্দিরগাত্রে রয়েছে সূক্ষ্ম টেরাকোটার কারুকাজ। তাতে বর্ণিত বিবিধ পৌরাণিক কাহিনি। ১১০ ফুট উঁচু মন্দিরটির পাঁচ খিলান বিশিষ্ট প্রবেশদ্বার। মন্দিরের সামনে রয়েছে নাটমন্দির। মন্দিরের গর্ভগৃহে কষ্টিপাথরের তৈরি শ্রীকৃষ্ণ (শ্যামচাঁদ) এবং অষ্টধাতুর রাধিকার মূর্তি রয়েছে। প্রতি বছর রাস উৎসবে এই মন্দির সেজে ওঠে। অসংখ্য ভক্ত আসেন এখানে। তবে এই শীতেই এক বার মন্দিরটি ঘুরে যেতে পারেন।
কী ভাবে আসবেন
শিয়ালদহ থেকে শান্তিপুর লোকাল ধরে পৌঁছোতে পারেন সেখানে। স্টেশন থেকে মন্দির ঘোরার জন্য টোটো, অটো ধরে নিন। গাড়ি ভাড়া করে সড়কপথেও যেতে পারেন।
কোথায় ঘুরবেন
শান্তিপুরে একাধিক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। আগমেশ্বরী মায়ের মন্দির, গঙ্গার ঘাট, তোপখানা মসজিদ সহ বেশ কয়েকটি জায়গা ঘুরে নিতে পারেন। শান্তিপুরের তাঁতের শাড়ি বিখ্যাত। তাই এক বার এখানকার তাঁতিদের জায়গাগুলিও ঘুরে যেতে পারেন।
নাচিন্দা: দিঘা, মন্দারমণি অনেক সময়ই যাওয়া হয়। তবে কখনও কাঁথি নাচিন্দা গ্রামের নাচিন্দা বাজার এলাকায় নাচিন্দা মায়ের মন্দিরটিও ঘুরে নিতে পারেন। বর্তমান মন্দিরটি বেশ ঝকঝকে এবং আধুনিক। রাস্তার উপর বাঁধানো চত্বরেই মন্দির। স্থানীয়দের কাছে এই স্থান বেশ জাগ্রত। এই মন্দির ঘিরে রয়েছে লোককথাও। কথিত রয়েছে, এক বৃদ্ধা দেবী শীতলার স্বপ্নাদেশ পেয়ে পুজো শুরু করেছিলেন। পরে মন্দির তৈরি হয়। জনশ্রুতি, দেবী এখানে নানা রূপে ঘুরে বেড়ান। এখানে মা চণ্ডী, শীতলা, কালী এবং রক্তাবতীর পুজো হয়।
কী ভাবে আসবেন
কলকাতা বা শহরের যে কোনও প্রান্ত থেকে দিঘা বা কাঁথিগামী বাস ধরে নাচিন্দায় নেমে মন্দির ঘুরে নিতে পারেন। ট্রেনে কাঁথি এসে সেখান থেকেও টোটো বা অটো ধরে পৌঁছোতে পারেন।
কোথায় ঘুরবেন
দিঘা বা মন্দিরমণি যাওয়ার পথে নাচিন্দা মন্দির ঘুরে নিতে পারেন। বা দিঘা থেকে ফেরার সময়েও জায়গাটি ঘুরে নেওয়া যায়।