জালোরি-সোজা-কুলু-মণিকরণ-মানালি

বিপাশা নদীর পাড়ে সুন্দর উপত্যকা কুলু

জালোরি পাস হয়ে সোজা  গ্রাম: রামপুর বাইপাস হয়ে জালোরি পাস। বছরের বেশির ভাগ সময় বরফে মুড়ে থাকে।

যা দেখবেন: পথের সৌন্দর্য অসাধারণ। রাস্তার একপাশে কখনও গভীর খাদ, আবার কখনও নকশাদার চাষজমিন। আর তারই কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে শ্লেটপাথরের ছাদওয়ালা পাথুরে দেওয়ালের ছোট ছোট গ্রাম। নিমন্ড, সেঞ্চ। নদী পেরিয়ে ডালাস। খানাগ আসতেই প্রকৃতির দৃশ্যপটের বদল। পাহাড়ের গায়ে পাইন আর ধুপির আসবুজ আত্মীয়তা। তারই  মাঝে রডোডেনড্রনের সৌন্দর্যে শুধুই বুঁদ হয়ে থাকা। নিশ্চুপ, নির্জন, অল্পচেনা বনতলে হিমেল বাতাসের অবিরাম আসা-যাওয়া। মোড় ঘুরতেই, জালোরি পাস। পুরু বরফের মাঝে ৩,২২৩ মিটার উচ্চতায় এক সংকীর্ণ গিরিপথ। প্রায় তিন তলা সমান পুরু বরফের দেওয়াল। তারই ঢালে যেন রণপা পরা সুদীর্ঘ পাইনের বন বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সূর্যের রশ্মি সেই বরফের চাদরে পিছলে পড়ছে। এখানকার হিলটপে জালোরি মাতার মন্দির। প্রচণ্ড কনকনে ঠাণ্ডা হওয়া আর পুরু বরফের চাদর বিছানো পথে হিলটপে পৌঁছতেই জালোরী মাতার দর্শন সেরে নিতে পারেন। আমার চারপাশে তখন জালোরি পাসের তুষারধবল শৃঙ্গের মায়াবী রূপ। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি তুষারমোড়া পথ চলে গিয়েছে কুলুরাজাদের রঘুপুর দুর্গের দিকে। এখান থেকেই দেখা মেলে পিরপাঞ্জাল, শ্রীখণ্ড, কিন্নর কৈলাশ, ধৌলাধারের মতো শৃঙ্গের।

আরও পড়ুন: কল্পা-নাকো-টাবো-কাজা

সোজা গ্রাম: জালোরি পেরিয়ে চলে আসা যায় ছবির মতো সাজানো এক গ্রামে। সহজ-সরল গ্রাম সোজা। পাইন, ধুপি, ঝাউয়ের বনের ফাঁকে ফাঁকে হাল্কা বরফের চাদর জড়ানো।

যা দেখবেন: জালোরি পাস থেকে মাত্র পাঁচ কিমি দূরে এক অসাধারণ গ্রাম ঠিকানা। নানান পাখির আস্তানা। এখান থেকে ধৌলাধার গিরিশ্রেণির বেশ কিছু রেঞ্জ দেখতে পাওয়া যায়। মে-জুন মাসে হাঁটাপথে চলে আসা যায় সেরোলসার লেকে। পবিত্র লেকের জলে নামা এবং পা দেওয়া নিষেধ। লেকের ধারে ‘বুড়ি নাগিন’ মন্দির সহজেই ভুলিয়ে দেবে। এখানে আসার জন্য মে-জুন মাস হল আদর্শ সময়।

কোথায় থাকবেন: জালোরি পাস পেরিয়ে সোজা গ্রামে ইচ্ছে হলেই থাকতে পারেন। এখানে থাকার জন্য রয়েছে রাজা গেস্ট হাউস (০৯৮৯৯৯২৬৬৮০) ভাড়া ১,৫০০-২,০০০ টাকা। এ ছাড়া টেন্টেও থাকা যায়।

জালোরি পাসের তুষারধবল শৃঙ্গের মায়াবী রূপ

কুলু: বিপাশা নদীর পাড়ে এক সুন্দর উপত্যকা। কুলু জেলার সদর শহর। হিমাচলের আরও এক দেবভূমি।

মিথ বলছে: প্রতি বছর এ মন্দিরের শিবলিঙ্গের মাথা বজ্রপাতে ফেটে যায়, আর মন্দিরের সেবায়েত ঘি, মাখন দিয়ে সেই ক্ষত প্রলেপ লাগান। আবার আগের জায়গায় চলে আসে শিবলিঙ্গ।এই বিশ্বয় দেখতে হলে অবশ্যই আসতে হবে বিজলি মহাদেব মন্দিরে। শহর থেকে ১৪ কিমি দূরে প্রকৃতির কোলে আরও এক নিসর্গের ঠিকানা। মহারাজা জগৎ সিংহ মায়াময় প্রকৃতির ঢালে রঘুনাথ মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন। কাটরার বৈষ্ণোদেবীর আদলে কুলু বৈষ্ণোদেবী মন্দির শহর থেকে মাত্র চার কিমি দূরে।

যা দেখবেন: ঘন নীল আকাশ, মেঘের ভেলায় ভাসা পাহাড়ি উপত্যকা, কুলু। বিপাশা নদী কুলুর সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। কুলুকে ভ্যালি অফ গডস বলা হয়। অপরূপ চিত্রকলা সম্বলিত কুলু থেকে পাঁচ কিমি দূরে ভিখালির কাছে ভুবনেশ্বরী মন্দিরটি অনবদ্য।

জালোরি পেরিয়ে চলে আসুন ছবির মতো সাজানো সোজা গ্রামে

কুলুর উৎসব: ১,২৩০ মিটার উচ্চতায় ছবির মতো সাজানো পাহাড়ঘেরা শহরে মাঝে ঢোলপুর ময়দান। এখানেই বিজয়া দশমীতে মহাসমারোহে পালিত হয় কুলু দশেরা উৎসব। বিয়াস নদীর পাড়ের কাতরাইন হল র‌্যাফটারদের স্বর্গরাজ্য। এখানে র‌্যাফটিং ছাড়াও ট্রাউট ফিশিং-এর রোমাঞ্চে মেতে ওঠা যায়।

কেনাকাটা: কুলুর মনোরম প্রকৃতি ছাড়াও এখানকার শালের কদর জগৎজোড়া। নানা দোকান থাকলেও, সরকারি হ্যান্ডলুম থেকে কেনাকাটা করাই ভাল। এখানকার আপেল, অ্যাপ্রিকট, খোবানি, জ্যাম, জেলি, আচার খুবই বিখ্যাত।

আরও পড়ুন: শিমলা-চেইল-সারাহান-সাংলা-ছিটকুল

কী ভাবে যাবেন: মানালি থেকে মাত্র ৪০ কিমি দূরে কুলু। কাতরাইন ১৯ কিমি।

বিয়াস নদীর বহতাকে সঙ্গী করে চলে আসুন বশিষ্ঠমুনির মন্দিরে

কোথায় থাকবেন: এখানে থাকার জন্য রয়েছে রাজ্য পর্যটন দফতরের হোটেল সিলভার মুন (০১৯০২-২২২৪৮৮) ভাড়া ১,৭০০-২,৬০০ টাকা। হোটেল শর্বরী (০১৯০২-২২২৪৭১) ভাড়া ১,৮০০-৩,৪০০ টাকা। হোটেল নেস্ট (০১৯০২-০২২২-২৬৮৫) ভাড়া ১,০০০-১,৫০০ টাকা।

মণিকরণ: মানালি থেকে কুলু পার হয়ে বিয়াসকে সঙ্গী করে চলে আসুন হিন্দু ও শিখদের এক ধর্মক্ষেত্রে। পার্বতী নদীর উষ্ণ প্রস্রবণে অবগাহন করে পবিত্র হন ভক্তকুল।

পথের শোভা: কুলু জুড়ে যে দিকে তাকানো যাক সে দিকেই কেবল ছবি। বিপাশা এখানে বিয়াস নাম নিয়েছে। তার রূপমাধুর্যের বর্ণনা মুখের কথা নয়। তা কেবলই ছবি আঁকা। উত্তাল বিয়াসের বুকে অ্যাডভেঞ্চার-প্রেমীরা দাপিয়ে খড়কুটোর মতো ভেসে বেড়াচ্ছেন। রবারের বিশাল নৌকোয় র‌্যাফটিংও দেখতে পাবেন। কুলু থেকে কাসল আসার রাস্তা এতটাই সুন্দর। মাঝে মাঝে গাড়ি থামাতে হবে। পথের পাশে পাশে নদী চলেছে এঁকেবেঁকে। বিয়াস আর পার্বতীর মিলনস্থল পেরিয়ে চলে আসা যায় হিন্দু ও শিখদের ধর্মস্থল মণিকরণ।

মিথ বলছে: এখানে শিব-পার্বতী বাস করতেন। এক দিন পার্বতীর মনিকুণ্ডল হারিয়ে যায়। খোঁজ খোঁজ। অবশেষে শেষনাগ মাটি ফুঁড়ে সেই মনিকুণ্ডল নিয়ে আসেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন উষ্ণপ্রস্রবণের ধারা। শিব সেই ধারাকে পাথর চাপা দিয়ে কুণ্ডে আবদ্ধ রাখেন। সেই অবরুদ্ধ কুণ্ড থেকে পাথর সরিয়ে উদ্ধার করেন স্বয়ং গুরুনানক।

যা দেখবেন: দুই পাহাড়ের মাঝ বরাবর বয়ে চলেছে পার্বতী নদী। পার্কিং জোনে গাড়ি রেখে, বিশাল দোলনা সেতু পেরিয়ে চলে আসুন ১৭৩৭ মিটার উচ্চতার মণিকরণে। ১৫৭৪ সালে এখানে গুরুনানক আসেন। মাথায় পাট্টা দিয়ে এখানে প্রবেশ করতে হয়। নামগান আর লঙ্গ চলতে থাকে। পবিত্র প্রস্রবনে স্নান সেরে নিতে পারেন। পুরুষ ও মহিলাদের পৃথক স্নানের বাবস্থা রয়েছে। এর আশপাশে রয়েছে আরও নানা মন্দির। এখান থেকে নানান ট্রেক রুট রয়েছে।

কী ভাবে যাবেন: কুলু থেকে মণিকরণের দূরত্ব ৪৫ কিমি। মানালি বা কুলু থেকে গাড়িতে চলে আসতে পারেন।

কোথায় থাকবেন: এখানে থাকার বেশ কিছু হোটেল রয়েছে। রয়েছে গুরুদুয়ারা ধর্মশালা (০১৯০২-২৭৩৮২১)। রয়েছে হোটেল শিবালিক (০১৯০২-২৭৩১৫৭) ভাড়া ২,০০০-৩,০০০ টাকা। পার্বতী ভ্যালি ( ০১৯০২- ২৭৩১৫৭) ভাড়া ১,৮০০- ২,০০০ টাকা।

মানালি: হিমাচলের আরও এক শৈলশহর। ২০৫০ মিটার উচ্চতায় মনু ঋষির তপস্যাক্ষেত্র। তাঁর নাম থেকেই এই পাহাড়ি উপত্যকার নাম হয় মানালি।

যা দেখবেন: পাইন, দেওদার, ধুপির ঠাসবুনোটে মোড়া মানালিতে প্রায় সারা বছর পর্যটকের ভিড় লেগেই থাকে। দেখে নিন বনবিহারী নেচার পার্ক, হিড়িম্বা মন্দির, হিমাচলি ফোক মিউজিয়াম এবং ম্যাল। পরদিন শহর থেকে ৩ কিমি দূরে বিয়াস নদীর বহতাকে সঙ্গী করে চলে আসুন বশিষ্ঠমুনির মন্দিরে। হিমাচলি কাটকোনা শিল্পের সুষমায় ভরা মন্দিরে রয়েছে উষ্ণপ্রস্রবণ। এ বার পালচান মোড় থেকে ঢুকে পড়ুন আরও এক অনবদ্য উপত্যকা সোলাং-এর অন্দরমহলে। শীতে পুরু বরফের চাদরে মুড়ে থাকে সোলাং। অন্য সময় গুঁড়ো গুঁড়ো রঙিন ফুল আর দূরে পাহাড়ে বরফের আস্তরণে মোড়া আর আকাশের সীমান্তে অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী প্যারাগ্লাইডারদের দাপাদাপি। এপ্রিল-মে মাসে গেলে সোলাং ভ্যালি বরফেমোড়া থাকে। সেই সময় এখানে কাঠের শ্লেজ, স্কি, আইস স্কুটার নিয়ে অ্যাডভেঞ্চারে মেতে ওঠা যায়। সোলাং থেকে আঁকাবাঁকা পথ ধরে চলে আসা যায় ৩,৯৭৮ মিটার উচ্চতার রোটাং পাসে। জুন মাস পর্যন্ত এ পথ বন্ধ থাকে। বাকি সময় নিজস্ব আবহে থাকে রোটাং পাস।

কাঠের শ্লেজ, স্কি, আইস স্কুটার নিয়ে অ্যাডভেঞ্চারে মেতে উঠুন বরফে মোড়া রোটাং ভ্যালিতে

কেনাকাটা: মানালির ম্যালের চারপাশে রয়েছে নানান দোকানপাট। শাল, সোয়েটার, উলেন শীতবস্ত্রের দেদার আয়োজন।

কী ভাবে যাবেন: মানালি থেকে ৫১ কিমি দূরে রোটাং। গাড়ি ভাড়া করে চলে আসা যায়। সিজন অনুযায়ী গাড়ি ভাড়া বাড়ে-কমে।

কোথায় থাকবেন: মানালিতে থাকার জন্য রাজ্য পর্যটন দফতরের দ্য লগ হাট (০১৯০২-২৫৩২২৫-২৬) ভাড়া ৭,০০০-৯,৫০০ টাকা। দ্য অর্কিড হাটস (০১৯০২-২৫৩২২৫/২৫৩২২৬) ভাড়া ১,৬০০-৫,৯০০ টাকা। দ্য কুনজুম (০১৯০২-২৫৩১৯৭/৯৮) ভাড়া ২,১০০-৪,২০০ টাকা। হিড়িম্বা কটেজ (০১৯০২-২৫২৩৩৪) ১২টি কটেজের ভাড়া ৩,২০০ টাকা। দি রোটাং মানালসু (০১৯০২-২৫২৩৩২/২৫৩৭২৩) ভাড়া ৯০০-৩,০০০ টাকা। বেসরকারি হোটেলের মধ্যে রয়েছে হোটেল পোলোস্টার (৯১৬৩৯৬০৭৫২) ভাড়া ১,১০০-১,৮০০ টাকা। হোটেল হিল টপ (০৯৮৩০৩-৭১৭৪৪) ভাড়া ১,২০০- ৩,৫০০ টাকা। পুজারা সিরাজ (০9831642456), ভাড়া ১,২০০-৩,৫০০ টাকা।

(লেখক পরিচিতি: ক্লাস নাইনে পড়াকালীন পাড়াতুতো মামার সঙ্গে মাত্র ৭০০ টাকা পকেটে নিয়ে সান্দাকফু ট্রেক। সুযোগ পেলেই প্রিয় পাহাড়ে পালিয়ে যাওয়া। বছরে বার কয়েক উত্তরবঙ্গের অল্পচেনা ডেস্টিনেশনে যাওয়া চাই। কুয়াশামাখা খরস্রোতা নদী কিংবা চলমান জীবনছবিতে ক্লিক, ক্লিক। চলতি পথে মেঠো গানের সুর শুনলেই ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়া। লাদাখে গর্তে সেঁধিয়ে যাওয়া মারমটের ছবি তুলতে ভিজে মাটিতে সটান শুয়ে অপেক্ষায় থাকা— এই নিয়েই ক্যামেরা আর কলম সঙ্গী করে ২২টা বছর। প্রকৃতির টানে ছুটে বেড়ানোটা থামেনি।)