দু’হাত বাড়িয়ে ডাকছে হায়দরাবাদ

শহরের অন্যতম মুখ্য আকর্ষণ চারমিনার

নাম ছিল তার ত্রিলিঙ্গ দেশ। অর্থাৎ তিন লিঙ্গের দেশ। কালেশ্বরম, শ্রী শৈলম এবং দ্রক্ষরামামের তিনটি শিবমন্দিরে নাকি বিরাজমান ছিলেন মহাদেব। আলেকজান্ডার ডানকান তাঁর ‘আ গ্রামার অফ তেলেগু ল্যাঙ্গুয়েজ’ বইয়ে বলেছেন সেই ত্রিলিঙ্গ থেকেই রাজ্যের নাম তেলঙ্গানা। অনেকে আবার মনে করেন ছত্তীসগঢ়ের গেন্ডু ভাষা থেকে তেলু শব্দটি এসেছে, যেটি নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তেলঙ্গানায় পরিণত হয়। তেলুগুভাষী জেলাগুলি নিয়ে একটি পৃথক রাজ্য গঠনের দাবি বহু দিন ধরেই ছিল। ২০১৪ সালের ২রা জুন ভারতের ২৯তম রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ তেলঙ্গানার৷ অন্ধ্রপ্রদেশ ভেঙে নতুন রাজ্য হলেও ১০ বছর উভয়েরই রাজধানী থাকবে হায়দরাবাদ৷

সাতবাহন, ইক্ষবাকু, কাকাতীয়, বাহমনি, কুতুবশাহি, মোগল ও নিজামদের দীর্ঘ শাসনকালকে সঙ্গী করে গড়ে উঠেছে তেলঙ্গানার ইতিহাস৷ শিল্প, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের অন্যতম পীঠস্থান রাজ্যটি৷ এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অফুরন্ত ভাণ্ডার৷

প্রসিদ্ধ তীর্থস্থান ভদ্রাচলম

আরও পড়ুনদার্জিলিং-কালিম্পং-লাভা-রিশপ-লোলেগাঁও

হায়দরাবাদ

১৫৯০ সালে কুলী কুতুব শাহের উদ্যোগে পত্তন এই শহরের, ভাগমতী দেবীর নামে নাম হয় ভাগ্যনগর৷ দু’বছর পরে ভাগমতী দেবী নাম পরিবর্তন করে হন হায়দারমহল, শহরের নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় হায়দরাবাদ৷ হায়দরাবাদের যমজ শহর সেকেন্দরাবাদ, মধ্যিখানে হুসেন সাগর৷ ১৫৬২ সালে এই বিশালাকার হ্রদটি খনন করান হুসেন শাহ ওয়ালি৷ হ্রদের মধ্যে ৬০ ফুট উঁচু বুদ্ধমূর্তিটি খুবই সুন্দর৷ হাইটেক এই শহরের অন্যতম মুখ্য আকর্ষণ চারমিনার৷ ভয়াবহ প্লেগ মহামারী নির্মূল করার স্মারক হিসাবে ১৫৯১ থেকে ১৫৯৩ সালের সময়কালে মহম্মদ কুলী কুতুব শাহের আমলে গড়ে উঠেছিল চারমিনার৷ চারটি মিনারের উপর নির্মিত অপরূপ কারুকার্যময় এই মিনারটি। নিজামের প্রধানমন্ত্রিত্বে ইস্তফা দিয়ে মির ইউসুফ আলি খান (৩য় সালার জং) নিজেকে নিয়োজিত করেন এক ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা তৈরির কাজে, যা সালার জং মিউজিয়াম নামে খ্যাত৷ চারমিনার-এর কাছেই অবস্থিত চারটি মহলের সমাহারে তৈরি চৌমহলা প্যালেস তৈরি শুরু হয় নিজাম সালাভাত জং-এর আমলে। শেষ হয় নিজাম আফসার-উদ্দৌলা বাহাদুরের আমলে৷ বড় ইমামবাড়া, ভিন্টেজ গাড়ি মিউজিয়ামের অন্যতম আকর্ষণ৷ দক্ষিণ ভারতের বৃহত্তম মক্কা মসজিদটি স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন৷ মসজিদটিতে মক্কা থেকে আনা একটি ইট ব্যবহৃত হওয়াতে এই নামকরণ, আবার কেউ কেউ বলেন, মক্কা মসজিদের আদলে তৈরি বলে এই নাম মসজিদের৷ হুসেন সাগরের পাশেই অবস্থিত অসাধারণ লেসার শোয়ের জন্য প্রসিদ্ধ লুম্বিনী পার্ক৷ কাকাতীয় রাজা গণপতির সময়কালে তৈরি ইতিহাসখ্যাত গোলকোন্ডা ফোর্ট৷ দুর্গটির নির্মাণশৈলী অভিনব৷ হাতির আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য গজাল বসানো দরজা, ৩৬০ ধাপ উঁচু পাহাড় শিখরে দরবার হল, হারেম মহল, নাগিনা বাগ, তোপখানা এখানকার মুখ্য আকর্ষণ৷ কোহিনূর ও হোপ, দু’টি রত্ন এখান থেকেই ঔরঙ্গজেবের দখলে আসে৷ দুর্গটির বানজারা দরজা থেকে ১ কিমি দূরে ইব্রাহিম বাগে কুতুবশাহি রাজাদের পারিবারিক সমাধিস্থলটি পারসীয় ও পাঠান স্থাপত্যের মিলনশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন৷

বিশেষ আকর্ষণ গোলকোণ্ডা ফোর্ট 

 

হায়দরাবাদকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু ট্যুর হয়

রামোজি ফিল্ম সিটি ট্যুর: হায়দরাবাদ থেকে ৪০ কিমি দূরে ২০০০ একর জুড়ে গড়ে ওঠা রামোজি ফিল্ম সিটি বিশ্বের বৃহত্তম ইন্টিগ্রেটেড ফিল্ম প্রোডাকশন কমপ্লেক্স৷ ফিল্ম সিটির মধ্যে স্কুল, কলেজ, মন্দির-মসজিদ-চার্চ, রেলস্টেশন, বিমানবন্দর, ঝাঁ চকচকে রাস্তাঘাট হায়দরাবাদ ভ্রমণে অবশ্য দ্রষ্টব্য৷ আনুমানিক ১১২০ টাকা থেকে ১৪০০ টাকা খরচ হয় ট্যুরে। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত হয় ট্যুরটি। রামোজি ফিল্ম সিটির মধ্যে থাকতে চাইলে সেই ব্যবস্থাও আছে। এখানে তারা এবং সিতারা বলে দু’টি বেসরকারি হোটেল আছে। দুই দিন এক রাতের প্যাকেজে খরচ পড়ে জনপ্রতি ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা।

রামোজি ফিল্ম সিটি

ভদ্রাচলম ট্যুর: গোদাবরী নদীর দক্ষিণপ্রান্তে ভদ্রাগিরি পাহাড়ে শ্রীরামের মন্দিরের জন্য প্রসিদ্ধ এই তীর্থস্থান পুরাণ অনুযায়ী একসময় দণ্ডকারণ্যের অংশ ছিল৷ বনবাসের ১৪ বছর শ্রীরাম, লক্ষণ ও সীতার সঙ্গে কাটিয়েছিলেন ৩২ কিমি দূরে পর্ণশালাতে৷ মন্দিরে রয়েছেন তির, ধনু্,‌ শঙ্খ ও চক্র হাতে চতুর্ভুজ শ্রীরাম, লক্ষণ ও সীতা৷ জনশ্রুতি, লঙ্কার পথে শ্রীরাম এখান থেকেই গোদাবরী পার হন৷

নাগার্জুন সাগর ট্যুর: শহরকে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করতে নির্মাণ করা হয়েছে বিশাল বাঁধ৷ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এই কৃত্রিম জলাধারে হারিয়ে গিয়েছে অতীতের ধান্যকটক, শ্রীপর্বত, বিজয়পুরী প্রমুখ বৌদ্ধকেন্দ্র৷ পুরনিদর্শন নিয়ে নাগার্জুন পাহাড়ের বুকে গড়ে উঠেছে মিউজিয়াম৷ মিউজিয়ামের বুদ্ধমূর্তিটি অনবদ্য৷ সিংহল থেকে বুদ্ধের বাণীর প্রচারে আগত মহাপন্ডিত নাগার্জুনের নামে শহর নাগার্জুনকোন্ডা৷ এখানে ইতিহাসের স্মৃতি রোমন্থন করায় সম্রাট অশোক নির্মিত মহাচৈত্য, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় খ্রিস্টাব্দে নির্মিত মঠ, বিহার, প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ৷ দেভেরাকোন্ডা ফোর্ট এই অঞ্চলের অবশ্য দ্রষ্টব্য৷ ত্রয়োদশ শতকে ভেমুলা রাজাদের হাতে তৈরি হয় ফোর্ট৷ পরবর্তীকালে রাজা মাদা নায়ডু দখল করেন এটি৷ তাঁর শাসনকালে নির্মিত বিস্ময়কর সিঁড়ি নিয়ে যায় শ্রীশৈলমের পাতালগঙ্গায়৷ তবে এই ট্যুরটি কিন্তু চাহিদার ওপর নির্ভর করে। পর্যাপ্ত পর্যটক না থাকলে ট্যুর বাতিল হয়ে যায়।

নাগার্জুন সাগরের বিশাল বাঁধ

নাগার্জুন সাগর ট্যুর বাতিল হলেও শ্রীশৈলম ট্যুরে নার্গাজুন সাগর ঘুরে দেখা যায়। সকাল ১০টায় হায়দরাবাদ থেকে বেরিয়ে সন্ধ্যে ৬টায় শ্রীশৈলম পৌঁছয়। রাতে ওখানে থাকার ব্যবস্থা আছে। যাতায়াত এবং থাকার খরচ ১৮০০ টাকা। খাওয়া আলাদা। এ ছাড়াও আছে হায়দরাবাদ সিটি ট্যুর। সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যে ৭টা পর্যন্ত। খরচ পড়ে ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা।

হায়দরাবাদের বিরিয়ানি বিখ্যাত। মদিনা বিল্ডিংয়ের বিপরীতে ‘শাদাব’ বিরিয়ানির জন্য বিখ্যাত। মাধপুরের ‘বিরিয়ানি ঘর’-এরও সুখ্যাতি আছে। এখানকার আর এক বিখ্যাত জিনিস মুক্তো। মনমাতানো রং আর নানা ছাঁদের মুক্তোর অলঙ্কার পাওয়া যায় হায়দরাবাদে।

নাগার্জুনকোন্ডার অন্যতম আকর্ষণ এই বুদ্ধ মূর্তি

কী ভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে ফলকনামা এক্সপ্রেস, শালিমার থেকে সাপ্তাহিক ট্রেন যাচ্ছে সেকেন্দরাবাদ৷ প্রি-পেড অটো, প্রাইভেট গাড়ি ধরে চলে যাওয়া যায় ৭ কিমি দূরে হায়দরাবাদ৷ ইস্ট কোস্ট এক্সপ্রেস যাচ্ছে হায়দরাবাদ ডেকান স্টেশন৷

কোথায় থাকবেন: তেলঙ্গানা পর্যটনের হোটেল হরিথা, ফোন: (০৪০)২৩৫২১৮৮৪, ভাড়া: ১৭০০ থেকে ২৬০০ টাকা৷ তেলঙ্গানা পর্যটনের আর একটি হোটেল প্লাজা, ফোন-৯৫৫৩৮৩৩৩১৯, ভাড়া: ৩০০০ থেকে ৪৫০০ টাকা৷ হোটেল লেমন ট্রি, গাছিবোলি, হায়দরাবাদ, ফোন: (০৪০) ৪৪১৪১৪১৪। ইমেল: hi.gb@lemontreehotels.com, ভাড়া, ভাড়া: ৩৫০০ টাকা থেকে শুরু৷ হোটেল লেমন ট্রি প্রিমিয়ার, হাইটেক সিটি, হায়দরাবাদ, ফোন: (৪০) ৪৪২১২১২১। hi.gb@lemontreehotels.com, ভাড়া: ৩৫০০ টাকা থেকে শুরু৷ রেড ফক্স হোটেল, ফোন: (৪০) ৪৪৪৮৪৮৪৮। ইমেল- contactus.hy@lemontreehotels.com, ভাড়া – ২৮০০ টাকা থেকে শুরু৷ সব হোটেলেই অনলাইন বুকিং করা যায়।

আরও পড়ুনহাতে সময় নিয়ে দেখুন, মুগ্ধ করবে খাজুরাহো

তেলঙ্গানা পর্যটনের অফিস ৩-৫-৮৯১, ট্যুরিজম হাউস, হিমায়ত নগর, হায়দরাবাদ-৫০০০২৯৷ ফোন: (০৪০) ২৩২৬২১৫১-২৩২৬২১৫৪, (০৪০) ২৩২৬২১৫৭৷ কেন্দ্রীয় বুকিং অফিস: বশিরবাগ, ফোন: (০৪০) ২৯৮০১০৪০, ২৭৮৯৩১০০৷

তেলঙ্গানা পর্যটনের ওয়েবসাইট www.telanganatourism.gov.in

তেলঙ্গানা স্টেট ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের অনলাইন বুকিং ওয়েবসাইট tstdc.in। কলকাতায় ডায়মন্ড ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস (ফোন-২২২৫ ৯৬৩৯) এবং ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম মেকার ইন্ডিয়া-র (২২৮৪ ৫০৬২) মতো কিছু সংস্থা এই ট্যুরগুলির ব্যবস্থা এবং পরিচালনা করে। প্রয়োজনে এদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যেতে পারে।