Omelette of La Mère Poulard

লালচে ডিম, নোনতা মাখন আর অসীম আন্তরিকতায় তৈরি অমলেট! খেয়েছেন নোবেলজয়ী থেকে সাধারণও

আনেত পুলার থেকে 'ম্যের পুলার' বা ‘পুলার-মা’ হয়ে ওঠার পিছনে জড়িয়ে আছে এমনই আতিথেয়তার নানা কিংবদন্তি I ম্যের পুলারের সরাইখানায় বিশ্বখ্যাত রাজনীতিক বা অখ্যাত কৃষক, সকলেই পেতেন সমান আদর আর যত্ন I

Advertisement

সোমঋতা ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ ১০:১১
Share:

‘মা’য়ের হাতের অমলেটের গল্প। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

কাঠের খোলা আগুনে অমলেট বানাচ্ছেন আনেত। লালচে-সোনালি, ফুলো ফুলো, তুলতুলে নরম অমলেট, ঠিক যেন সুফলে! ধোঁয়া-ওঠা, একটু ভাঙলেই কিছুটা গড়িয়ে যায় প্লেটে, কিছুটা যায় মুখে মিলিয়ে।

Advertisement

এমনিতে মঁ স্যাঁ মিশেলের লবণাক্ত তৃণভূমির ভেড়ার মাংস বা দেশি মোরগ অতিথিদের পরিবেশন করাই দস্তুর। তবে তা রান্না করতে তো বেশ কিছুটা সময় লাগে! দূরদূরান্ত থেকে তীর্থযাত্রীরা পায়ে হেঁটে আসেন। জোয়ার কমে দ্বীপের চারদিকে ঘিরে থাকা উপসাগরে (না কি ‘খাঁড়ি’ বলা চলে) একটু ভাটা পড়লে তবেই পথ বেরোয় গির্জা পর্যন্ত, কাদামাটির পথ। কোন সব মুলুক থেকে আসেন তাঁরা, ইতালি, গ্রিস বা আরও দূর, জলাজমি আর ভিজে বালি পেরিয়ে। পৌঁছোনোর সময়ের ঠিকঠিকানা থাকে না। ভিজে হাওয়ায় কাঁপতে কাঁপতে, জামাকাপড় সপসপে, হা-ক্লান্ত, পেটে থাকে এক আকাশ খিদে। চটজলদি, গরম, পুষ্টিকর কিছুই তখন দরকার সবার আগে। তাই আনেত ঠিক করেছেন, চটপট আগে একটা অমলেট বানিয়ে দেবেন।

নরম অমলেট, ঠিক যেন সুফলে! ধোঁয়া-ওঠা, একটু ভাঙলেই কিছুটা গড়িয়ে যায় প্লেটে, কিছুটা যায় মুখে মিলিয়ে।

ফ্রান্সের উত্তর-পশ্চিম উপকূলবর্তী অঞ্চলে নর্মান্ডির মঁ স্যাঁ মিশেল দ্বীপ। দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে কয়েকশো মিটার মাত্র। হাতে-গোনা কয়েক জনের বাস। আজকেও সেখানে পাকাপাকি বাসস্থান জনা তিরিশেক লোকের। এখন তো তা-ও মূল ভূখণ্ড থেকে পাকা পথ হয়েছে, ভ্রমণপিপাসুদের একটু সুবিধে করে দিতে। তবে সেই উনবিংশ শতকে জোয়ার-ভাটার সময় মিলিয়ে ভিজে বালি পেরিয়ে বেশ ঝুঁকি নিয়েই অ্যাবে-তে আসতেন তীর্থযাত্রীরাI সেখানেই শুরু হয় “আ ল’মলেত রোনোমে দো লা ম্যের পুলার” বা পুলার-মায়ের নাম-করা অমলেট।

Advertisement

সরাইখানা খোলার পরে খুব শিগগিরই আনেতের হাতে বানানো অমলেটের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে লোকের মুখে মুখে।

সময়টা ১৮৮৮ সালের আশপাশ I আনেত আর ভিক্তর এই নামেই প্রথম খোলেন তাঁদের সরাইখানাটি I ১৮৭৩ সালে বিয়ে হয়েছিল আনেত বুতিয়ো আর ভিক্তর পুলারের। পনেরো বছরের বিবাহিত জীবন তখন তাঁদের। সরাইখানা খোলার পরে খুব শিগগিরই আনেতের হাতে বানানো অমলেটের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে লোকের মুখে মুখে। বেশ কয়েক রকমের অমলেট ছিল আনেত পুলারের। সময় বদলেছে, মেনুতে আধুনিকত্ব এসেছে I তবে পুলারের অমলেট-রেঞ্জ এখনও খ্যাতির শীর্ষে।

বেশ কয়েক রকমের অমলেট ছিল আনেত পুলারের।

তা সে পিজ়ান্ট’স কান্ট্রি অমলেট হোক, বা কালো-রসুনের চিজ় অমলেট অথবা শেফ'স ডে-স্পেশ্যাল। পাঁচ পুরুষ ধরে দোলনে পরিবারের খামার থেকে আসে টাটকা লাল ডিমI সঙ্গে ইসিনি-র হালকা নোনতা মাখন। কব্জির বিশেষ কায়দায় অনেক ক্ষণ ধরে ফেটিয়ে, তামার প্যানে কাঠের আগুনে আজও তৈরি হয় আনেতের কিংবদন্তি অমলেট।

কাঠেক আগুনে তামার প্যানে তৈরি হয় অমলেট।

এ ছাড়াও, রয়েছে আরও সব স্থানীয় উপকরণে তৈরি বিশেষ বিশেষ পদ, এমনিতে মঁ স্যাঁ মিশেলের লবণাক্ত তৃণভূমির ভেড়ার মাংস, খামারবাড়ির দেশি মোরগ, বাজরার আস্তরণে ভাজা নর্মান্ডির সি-বাস (আমাদের ভেটকির সে দেশীয় সংস্করণ বলা চলে), সংলগ্ন ব্রিটানির স্যাঁ মালো থেকে ধরা মাছ আর লবস্টার সস দিয়ে তৈরি ফিশ কেনেল।

“আপনার বিল, মঁসিয়? ও সব আমরা করি না এখানে, এটা তো নিজের বাড়ির মতো! এখন যদি তাড়া থাকে, পরে যখন আসবেন, দেবেন না হয় বিল মিটিয়েI”

“এখনই দেবেন? আচ্ছা তা হলে, আপনিই তো জানেন কী কী ছিল, আপনিই করে দিন বিল!”

পুলারের অমলেটের টানে একশো তিরিশ বছরেরও বেশি সময়ের ঐতিহ্যমণ্ডিত এই রেস্তরাঁয় এসেছেন শিল্প, সাহিত্য, ক্রীড়া ও রাজনীতি জগতের দিকপালেরাও।

আনেত পুলার থেকে 'ম্যের পুলার' বা ‘পুলার-মা’ হয়ে ওঠার পিছনে জড়িয়ে আছে এমনই আতিথেয়তার নানা কিংবদন্তি। ম্যের পুলারের সরাইখানায় বিশ্বখ্যাত রাজনীতিক বা অখ্যাত কৃষক, সকলেই পেতেন সমান আদর আর যত্ন।

শুধু তীর্থযাত্রীরাই নন, পুলারের অমলেটের টানে একশো তিরিশ বছরেরও বেশি সময়ের ঐতিহ্যমণ্ডিত এই রেস্তরাঁয় এসেছেন শিল্প, সাহিত্য, ক্রীড়া ও রাজনীতি জগতের দিকপালেরাও। এসেছেন সালভাদোর দালি, পাবলো পিকাসো, মেরিলিন মনরো, জ়াক দেরিদা, মার্গারেট থ্যাচার, শার্ল দ্য গল, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরঁ। তালিকা অন্তহীন। এসেছেন নোবেলজয়ী মার্কিনি ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। হেমিংওয়ে তখন নর্মান্ডিতে মিত্রশক্তির সঙ্গে সাংবাদিক হিসেবে ছিলেন।

পূর্ণচাঁদের মায়াবী রাতে চিকচিকে বালির সঙ্গে সঙ্গে রং বদলায় সেই পাথুরে বাড়িও।

আনেত পুলারের সুখ্যাতি পেরিয়েছে দেশ-কালের গণ্ডি, তিনি নিজে কিন্তু মঁ স্যাঁ মিশেলের বাইরে প্রায় পা রাখেননি বললেই চলে। তাই অতিথিদের কাছ থেকে ছবি বা সই চেয়ে নিতেন আনেত, তাই দিয়ে সাজিয়ে তুলতেন সরাইখানার দেওয়াল, সেগুলোই ছিল তাঁর কাছে বাইরের পৃথিবীর জানলা। অন্দরসজ্জার একটা বড় অংশ জুড়ে এখনও ছড়িয়ে আছে টুকরো টুকরো সেই ইতিহাস। মঁ স্যাঁ মিশেল গ্রামে ঢুকে মূল দরজা পেরোলেই বাঁ হাতে ঝুলছে লম্বা হাতল-ওয়ালা এক প্রতীকী তামার কড়াই। ছিটেফোঁটা লাল আর পাথুরে ইমারত। ঘন মেঘলা দিন, ঝকঝকে নীলাকাশের দিন, বা পূর্ণচাঁদের মায়াবী রাতে চিকচিকে বালির সঙ্গে সঙ্গে রং বদলায় সেই পাথুরে বাড়িও। প্রবেশপথের গায়ে ছবিতে স্থির হয়ে আছেন আনেত, হাসিমুখে স্বাগত জানাচ্ছেন অভ্যাগতদের আগের মতোই, তাঁর যত্নের 'লা ম্যের পুলার'-এ।

ছবি : লেখক, লা ম্যের পুলার-এর ওয়েবসাইট।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement