উত্তেজনা: আটকে দেওয়া হয়েছে থানার মূল ফটক। ছবি: নির্মাল্য প্রামাণিক
চাপা উত্তেজনা ছিল অনেক দিন ধরেই। পুরভোটের আবহে ধামাচাপা ছিল সেই আঁচ। বোর্ড গঠন পর্ব সমাধা হতেই দোলের দিন তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর গোলমালে দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়াল বনগাঁয়।
শুক্রবার দুপুরে পুরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডে শুরু হয় গোলমাল। মহিলাকে মারধর, শ্লীলতাহানির অভিযোগ, পাল্টা আর এক মহিলাকে মারধর ও শ্লীলতাহানির অভিযোগ সামনে আসে। রাত পর্যন্ত দফায় দফায় দু’পক্ষই বনগাঁ থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখায়। থানা চত্বরেই মারপিট বাধে দু’পক্ষের। থামাতে গেলে পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি হয়। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগ, তৃণমূলের নেতা-নেত্রীদের ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ের জেরেই অশান্তির বাতাবরণ তৈরি হয়েছে শহরে।
নব নির্বাচিত পুরপ্রধান গোপাল শেঠ এবং প্রাক্তন পুরপ্রধান শঙ্কর আঢ্যের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে রেষারেষির জেরেই এই কাণ্ড বলে মনে করছেন তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশ। এই দুই নেতার আকচাআকচি দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছেন শহরবাসী। তবে বুধবার পুরবোর্ড গঠনের দিন গোপালকে ফুলের স্তবক দিয়ে সংবর্ধনা জানান শঙ্কর। পুরপ্রধান হিসেবে গোপালের নাম প্রস্তাব করেন শঙ্করের স্ত্রী, এ বারের উপপুরপ্রধান জ্যোৎস্না আঢ্য। জ্যোৎস্নার নাম আবার ঘোষণা করেছিলেন গোপাল।
দলের অনেকেই ভেবেছিলেন, এই সৌজন্যের আবহে হয় তো দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার চোরা স্রোত প্রশমিত হবে। কিন্তু শুক্রবার দোলের দিন দেখা গেল উল্টো ছবিই। সামনে আরও বড় গোলমাল বাধতে পারে দু’পক্ষের, এমন আশঙ্কা করছেন শহরের অনেকেই। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার পরে জ্যোৎস্নার নেতৃত্বে একটি মিছিল থানায় আসে। সঙ্গে ছিলেন তাঁর মেয়ে ঋতুপর্ণা ও দেওর মলয়। দু’জনেই এ বার পুরভোটে দাঁড়িয়েছিলেন কংগ্রেসের টিকিটে। মলয় হেরে গেলেও শঙ্কর-জ্যোৎস্নার মেয়ে ঋতুপর্ণা ভোটে জিতেছেন।
থানা চত্বরে এসে তাঁরা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। স্লোগান ওঠে, ‘‘শান্ত বনগাঁ অশান্ত হচ্ছে কেন, গোপাল শেঠ জবাব দাও।’’ থানা চত্বরে টোটোয় মাইক বেঁধে যখন স্লোগান দেওয়া চলছে, তখনই সেখানে পুরপ্রধানের অনুগামী বলে পরিচিত এক যুবক এসে প্রতিবাদ করেন। অভিযোগ, ওই যুবককে মারধর করা হয়। মারতে মারতে তাঁকে থানার বাইরে নিয়ে আসা হয়। এক পুলিশ অফিসার যুবককে বাঁচাতে গেলে তাঁকেও ধাক্কা মেরে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়। কোমরে চোট পান তিনি। ওই অবস্থায় পুলিশ অফিসার এক জনকে ধরে থানায় নিয়ে যান।
কিছুক্ষণ পরে গোপালের অনুগামীদের দেখা যায় থানায় জড়ো হতে। সেখানে ছিলেন কাউন্সিলর প্রসেনজিৎ বিশ্বাস। দু’পক্ষ থানায় বিক্ষোভ দেখাতে থাকে। থানা চত্বরেই মারপিট বেধে যায়। পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে দু’পক্ষের লোকজনকে থানার বাইরে বের করে গেট আটকে দেয়। পরে থানায় আসেন শঙ্কর।
জ্যোৎস্না বলেন, ‘‘আমি কোনও দিন থানায় আসি না। কিন্তু মহিলাকে মারধর হলে ঘরে বসতে থাকতে পারি না।’’ তাঁর দাবি, ‘‘৩ নম্বর ওয়ার্ড থেকে গোপালদা ভোটে জিতেছেন। ওখানে গোলমাল হলে দায় ওঁরই উপরে বর্তায়।’’ শঙ্কর বলেন, ‘‘৩ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কোনও অভিযোগ এলে তা দেখা জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব।’’
গোপালের পাল্টা প্রতিক্রিয়া, ‘‘বনগাঁর বিভিন্ন এলাকায় কংগ্রেসের ব্যানার নিয়ে কিছু লোক সন্ত্রাস সৃষ্টি করছে। তাতে আমাদের কিছু লোক যুক্ত হয়েছে। শুক্রবার ৩ নম্বর ওয়ার্ডেও সন্ত্রাস চালানো হয়েছে। পুলিশকে বিষয়টি বলা হয়েছে। তারা এখনও পদক্ষেপ করেনি।’’
গোটা ঘটনা নিয়ে বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার সভাপতি গোপাল শনিবার দলীয় বৈঠক করেন। পরে তিনি বলেন, ‘‘শুক্রবার যা যা হয়েছে, তা দলের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বকে জানানো হয়েছে। তাঁদের নির্দেশ মতো পদক্ষেপ করা হবে। দলের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, যাঁরা দলবিরোধী কাজ করছেন বা অন্য দলের সঙ্গে মিশে কাজ করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কী অবস্থান হবে।’’
গোপালের অভিযোগের তির শঙ্কর-জ্যোৎস্নাদের দিকেই। শঙ্কর বলেন, ‘‘এক জন মহিলার উপরে অত্যাচার হয়েছে। তিনি সাহায্য চাইলে কি আমি বাড়ি বসে থাকতে পারি?’’
অন্য একটি ঘটনায়, শুক্রবার সুভাষপল্লি এলাকায় দুষ্কৃতীরা কয়েক রাউন্ড গুলি চালায় বলে অভিযোগ। ১ নম্বর ওয়ার্ডেও গোলমাল হয়েছে। বনগাঁর পুলিশ সুপার তরুণ হালদার বলেন, ‘‘প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ করা হচ্ছে।’’
শাসক দলের কোন্দল নিয়ে বিরক্ত বনগাঁর আমজনতা। সিপিএম নেতা পীযূষকান্তি সাহা বলেন, ‘‘তৃণমূলের নেতানেত্রীদের ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে শান্ত বনগাঁ অশান্ত হয়ে উঠছে। আর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। পুলিশ-প্রশাসনের উচিত যথাযথ পদক্ষেপ করা।’’ বনগাঁ শহর কংগ্রেসের কার্যকরী সভাপতি সাধন ঘোষ বলেন, ‘‘বনগাঁ শহরে ফের দুষ্কৃতীদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। দুষ্কৃতীদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র থাকছে।’’ বিজেপি নেতা তথা পুরসভার কাউন্সিলর দেবদাস মণ্ডল বলেন, ‘‘বনগাঁয় পুলিশ-প্রশাসন বলে কিছু নেই। শুক্রবার থানায় হামলা হয়েছে। পুলিশকে ধাক্কাধাক্কি করা হয়েছে। তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দলে বনগাঁর মানুষ আতঙ্কিত।’’