দূষণ বাড়াচ্ছে কাটাতেলে চলা ইঞ্জিনভ্যান

ঘটা করে পালিত হল বিশ্ব পরিবেশ দিবস। কিন্তু কাটা তেলের বিষবাষ্প থেকে কবে মুক্ত হবে সুন্দরবন-সহ দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকা, প্রশ্নটা প্রতিবারের মতো এ বারও অমীমাংসিত থেকে গেল। কাটা তেলে চলা বেআইনি মেশিনভ্যান বা ছোট গাড়িতে দুর্ঘটনাও ঘটে চলেছে। এ সব ক্ষেত্রে বিমার টাকা পেতেও মুশকিল হয় বলে বহু মানুষের অভিজ্ঞতা।

Advertisement

শান্তশ্রী মজুমদার

শেষ আপডেট: ০৬ জুন ২০১৬ ০১:৪৬
Share:

ঘটা করে পালিত হল বিশ্ব পরিবেশ দিবস। কিন্তু কাটা তেলের বিষবাষ্প থেকে কবে মুক্ত হবে সুন্দরবন-সহ দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিস্তীর্ণ এলাকা, প্রশ্নটা প্রতিবারের মতো এ বারও অমীমাংসিত থেকে গেল। কাটা তেলে চলা বেআইনি মেশিনভ্যান বা ছোট গাড়িতে দুর্ঘটনাও ঘটে চলেছে। এ সব ক্ষেত্রে বিমার টাকা পেতেও মুশকিল হয় বলে বহু মানুষের অভিজ্ঞতা।

Advertisement

কাকদ্বীপ মহকুমার কথাই ধরা যাক। প্রায় ৪০ কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে কাটা তেলে চলে হাজার হাজার মেশিন ভ্যান, বেআইনি ছোট গাড়ি। এক দিকে দুর্ঘটনার আশঙ্কা যেমন বাড়ে, তেমনই বাড়ে বায়ু দূষণ। প্রসঙ্গ উঠলেই পুলিশ-প্রশাসন তরফে নজরদারির অভাবটা প্রকট হয়। জেলা প্রশাসনের কর্তারা দাবি করছেন, ব্যবস্থা নেওয়া হবে আরও কড়া ভাবে। কিন্তু কবে, প্রশ্ন সহজ। তবে উত্তর অজানা।

মহকুমার দু’টি গুরুত্বপূর্ণ রুট কাকদ্বীপ থেকে নামখানা এবং নামখানা থেকে বকখালি। ১১৭ নম্বর এই জাতীয় সড়কের উপরে ৪০ কিলোমিটার জুড়ে বেআইনি মেশিন ভ্যান এবং ছোট গাড়ির দাপট দিন দিন বাড়ছে। ভাড়া দু’পয়সা কম বলে যাত্রীরাও ঝুঁকছেন মেশিনভ্যান, জিও বা ম্যাজিক গাড়ির দিকে। লট ৮ ঘাট থেকে নামখানায় চলত ২১টি বাস। গত ছ’সাত মাসে মেশিনভ্যান এতটাই বেড়ে গিয়েছে, এখন ৭টি বাস বসে গিয়েছে। বাস মালিকদের দাবি, গত বছর ৮০টি ছিল, এ বছর মেশিনভ্যান হয়ে গিয়েছে ১১৫টি। কাকদ্বীপ-নামখানা বাস মালিক সংগঠনের নেতা রমাপতি মিশ্রের কথায়, ‘‘মেশিনভ্যানের জন্য পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। আমরা ভোটের আগে মহকুমার পুলিশ-প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। কিন্তু কেউ কোনও ব্যবস্থা কেউ নিচ্ছে না।’’

Advertisement

কাকদ্বীপ, হারুড পয়েন্ট উপকূল, নামখানা এবং ফ্রেজারগঞ্জ উপকূল, ১১৭ নম্বর জাতীয় সড়কের উপরে এই চারটি থানা এলাকায় পড়ে ৪০ কিলোমিটার রাস্তা। এর মধ্যে একমাত্র নামখানা থানা এলাকায় পুলিশের কড়াকড়ির জন্য বছরখানেক বন্ধ ছিল বেআইনি মেশিনভ্যান এবং ছোটগাড়িগুলি। কিন্তু মাসখানেক হল সেগুলি আবার চালু হয়েছে বলে জানালেন স্থানীয় মানুষজন। গত এক বছরে কাকদ্বীপ থেকে নামখানা এবং নামখানা থেকে বকখালি রুটে জাতীয় সড়কের উপরে মেশিনভ্যানে দুর্ঘটনায় অন্তত ৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। দু’টি জায়গাতেই দেখা গিয়েছে, প্রতিনিয়ত এই বেআইনি গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে। বাস মালিকেরা জানাচ্ছেন, এই রুটে কয়েক হাজার ছাত্রছাত্রী বাসে স্কুলে যাতায়াত করে মাত্র ২ টাকা ভাড়া দিয়ে। কিন্তু তাদের অভিভাবকেরা কম ভাড়ার মেশিনভ্যানে চড়ছেন। তাতে বাসগুলি পর্যাপ্ত যাত্রী না পেয়ে বসে যাচ্ছে। মেশিন ভ্যানে দুর্ঘটনা ঘটলে বিমার টাকাও মিলছে না।

নামখানা-বকখালি রুটে আইএনটিটিউইসি নেতা চিত্তরঞ্জন কাঁপ বলেন, ‘‘মেশিনভ্যান কিছু দিন বন্ধ ছিল। কিন্তু ফের চালু হয়েছে। তাতে বাসের শ্রমিকেরাও পর্যাপ্ত কমিশন না পেয়ে কাজ হারাচ্ছেন। অন্তত দু’হাজার মেশিনভ্যান রয়েছে এই রুটে। আমরা শীঘ্রই এগুলি বন্ধ করা নিয়ে বৈঠক করব।’’

Advertisement

মহকুমা প্রশাসনের কর্তারা বিষয়টি নিয়ে কিছুই বলতে চাননি। জেলা প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, এ সবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলাশাসক পিবি সালিম বলেন, ‘‘আমরা বেআইনি সমস্ত যাত্রিবাহী গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তোড়জোড় শুরু করছি।’’

কিন্তু এ সব বন্ধ করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছাও লাগে। তার অভাব আছে বলে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা। শাসকদলের দাপটেই এই সব গাড়ির রমরমা বলে অভিযোগ তুলছেন তাঁরা। যদিও তৃণমূলের তরফে দাবি করা হয়েছে, এ সবের পিছনে তাদের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই।

কাটাতেলের প্রভাবে পরিবেশের ক্ষতি নিয়ে বহুদিন আগেই সরব হয়েছেন পরিবেশপ্রেমীরা। পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত জানিয়েছেন, কাকদ্বীপে কাটাতেলে চলা ভ্যান দিনের পর দিন চলতে দেওয়া একেবারেই ঠিক নয়। জীববৈচিত্র্যের উপর, জনজীবনের উপর কাটা তেলের কী প্রভাব রয়েছে তা ঠিক করার জন্যও এর আগে তিনি দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদকে চিঠি দিয়েছেন। সুভাষবাবুর কথায়, ‘‘এরকম কাজ কলকাতাতেও হয়নি, তো সুন্দরবন তো অনেক দূরে। যদিও, আমার দায়ের করা একটি মামলায় কয়েক মাস আগে রাজ্যের মুখ্যসচিব পরিবেশ আদালতে জানিয়েছে তাঁরা সুন্দরবন এলাকায় কাটাতেল ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement