ইট খসে ভেঙে পড়েছে সেলাইয়ের দোকানের ছাদ। হিঙ্গলগঞ্জে। ছবি: অর্ণব ব্রহ্ম ।
বড় ঢেউ উঠল ইছামতীতে। কোথাও নির্মীয়মাণ বাড়ি থেকে খসে পড়ল ইট, কোথাও চিড় ধরল দেওয়ালে। আতঙ্কে বহু স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী, অফিসের কর্মীরা বেরিয়ে এলেন খোলা জায়গায়। আলোচনায় কেউই মনে করতে পারছিলেন না, এমন ভূমিকম্প এলাকায় কবে হয়েছে!
শুক্রবার দুপুর ১টা ২২ মিনিট নাগাদ যে প্রবল ভূমিকম্প অনুভূত হল, তার উৎসস্থল বাংলাদেশের খুলনার পাইকগাছা বলে জানা গিয়েছে। জায়গাটি বসিরহাট থেকে মাত্র ৬২ কিলোমিটার দূরে। ফলে, প্রবল কম্পন অনুভূত হয়েছে বসিরহাট এবং পাশের বনগাঁ মহকুমায়।
হিঙ্গলগঞ্জের দেউলি গ্রামের একটি নির্মীয়মাণ দোতলা বাড়ি থেকে ইট খসে পড়ে পাশের সেলাইয়ের দোকানের অ্যাসবেস্টসের ছাদে। ছাদটি ভেঙে পড়ায় সেলাই মেশিন ও ঘরের কাচের সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দোকানের মালিক অরুণ তরফদার বলেন, ‘‘জীবনে এমন কম্পন প্রথম টের পেলাম। যদিও সে সময় দোকানে আমরা কেউ ছিলাম না।’’ টাকির ভবনাথ হাই স্কুলের শিক্ষক চিন্ময় মণ্ডল জানান, হঠাৎ তীব্র কাঁপুনিতে কানে তালা লেগে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয়। তিনি বলেন, ‘‘ছাত্রছাত্রীদের দ্রুত বাইরে বের করে আনি। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত যেন নড়ার শক্তিই হারিয়ে ফেলেছিলাম!” টাকি পুরসভার চেয়ারম্যান, ষাটোর্ধ্ব সোমনাথ মুখোপাধ্যায়ের অভিজ্ঞতা, ‘‘এমন ভূমিকম্প আগে অনুভব করিনি। মনে হচ্ছিল, সব কিছু যেন গ্রাস করে নিচ্ছে মাটি!”
বসিরহাট থানার উল্টো দিকে সোনাপট্টির একটি গয়নার দোকানের কাচ ভেঙে পড়ে। বিভিন্ন এলাকায় বাড়িতে ফাটল ধরার খবর মিলেছে। ইছামতী নদীতেও প্রবল ঢেউ উঠতে দেখা যায় বলে দাবি প্রত্যক্ষদর্শীদের। বসিরহাট শহরের বাসিন্দা প্রবীর সেন বলেন, ‘‘এখন আমার ৭০ বছর বয়স। ভূমিকম্প অনেক বার অনুভব করেছি। কিন্তু এ বার ইছামতীতে যে ঢেউ দেখলাম, তা মনে থাকবে।’’ মিনাখাঁতেও বেশ কিছু বাড়িতে ফাটল ধরে।
কম্পনের পরেই বনগাঁর বহু বাড়িতে শাঁখ বেজে ওঠে। যশোর রোডের ধারে বহু চালক গাড়ি দাঁড় করিয়ে দেন। ইছামতীর পাড়ে বাসিন্দারা আতঙ্কে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। গাইঘাটার একটি স্কুলে আচমকা শ্রেণিকক্ষ দুলে উঠতেই চিৎকার করতে থাকে পড়ুয়ারা। শিক্ষকেরা তাদের খোলা মাঠে নিয়ে আসেন। গাইঘাটারই এক বৃদ্ধা কম্পনের জেরে সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে আহত হন। তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়।
গাইঘাটর এক যুবকের কথায়, ‘‘দোতলার ঘরে বসে কম্পিউটারে কাজ করছিলাম। কম্পিউটার কাঁপতে শুরু করে। পুরো ঘর দুলে ওঠে। মনে হচ্ছিল যেন বাড়িটা ভেঙে পড়বে! প্রাণভয়ে সঙ্গে সঙ্গে বাইরে ছুটে যাই।”
কম্পনের সময় সেলাই কারখানা থেকে হুড়োহুড়ি করে বেরোতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে চোট পান হাবড়ার রুদ্রপুর বাঘাডাঙার যুবক আলামিন মণ্ডল। হাবড়ার নবপল্লি বিদ্যাবীথি হাই স্কুলের দশম শ্রেণির আসিফা সুলতানাও তেতলার শ্রেণিকক্ষ থেকে সহপাঠীদের সঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে পড়ে যাওয়ায় জখম পায়। দু’জনকেই হাবরা স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
ভূমিকম্প অনুভূত হয় বারাসত ১, দেগঙ্গা ও দত্তপুকুর ব্লকেও। ব্লক অফিস, হাসপাতাল, স্কুল-সহ সব ভবন নড়ে ওঠে। দুলতে থাকে পাখা। বহু পুকুরের জল কেঁপে ওঠে। দেগঙ্গার পশু চিকিৎসক পিউ পাল বলেন, ‘‘হঠাৎ চেয়ার-টেবিল কেঁপে ওঠে। মাথা ঘুরছিল। আমরা সবাই অফিসের বাইরে বেরিয়ে যাই।’’
ব্যারাকপুরেও ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠে। স্কুল শিক্ষিকা পারমিতা দেবনাথ তখন স্কুটার চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘‘মনে হচ্ছিল, মাথা ঘুরছে, এই বুঝি স্কুটার থেকে পড়ে গেলাম। বুঝতে পারছিলাম না, শরীর খারাপ করল কি না। তারপরে শুনলাম ভূমিকম্প।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে