Sundarbans

বাঘ ও কুমিরের আক্রমণে জখমদের ভরসা সেই কলকাতা

সুন্দরবনের জঙ্গল, নদী-খাঁড়িতে মাছ, কাঁকড়া, মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সময়েই বাঘ ও কুমিরের হামলার শিকার হন মৎস্যজীবী, মউলেরা।

প্রসেনজিৎ সাহা

শেষ আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৬
Share:

বাঘের হামলার মুখে পড়েছিলেন ঝড়খালির বাসিন্দা মিহির সর্দার। একটা চোখ নষ্ট হয়। সেই অভিজ্ঞতার কথা শোনাচ্ছেন তিনি। ফাইল চিত্র

২০২২ সালে সুন্দরবনের পিরখালির জঙ্গল লাগোয়া খাঁড়িতে কাঁকড়া ধরার সময়ে বাঘের আক্রমণে জখম হন নিরঞ্জন সর্দার। দুই সঙ্গী তপু সর্দার ও নিখিল মণ্ডল বাঘের সঙ্গে লড়াই করে নিরঞ্জনকে উদ্ধার করে আনেন গোসাবার কুমিরমারিতে। সেখানে স্থানীয় হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে কলকাতার ন্যাশানাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু সেখানে নিয়ে যাওয়ার পথেই মৃত্যু হয় নিরঞ্জনের। স্ত্রী সুশীলা সর্দার বলেন, “ভোরবেলা বাঘে ধরেছিল ওঁকে। জঙ্গল থেকে গ্রামে নিয়ে আসতেই প্রায় ঘণ্টা তিনেক লাগে। সেখান থেকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এতটাই রক্তক্ষরণ হয়, কলকাতায় নিয়ে যেতে বলে। সেখানে নিয়ে যাওয়ার পথে বারুইপুরের কাছেই মৃত্যু হয় স্বামীর।”

এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সুন্দরবনের জঙ্গল, নদী-খাঁড়িতে মাছ, কাঁকড়া, মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সময়েই বাঘ ও কুমিরের হামলার শিকার হন মৎস্যজীবী, মউলেরা। বহু ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাঁদের, অনেককে আবার বাঘ টেনে নিয়ে যায় জঙ্গলে। কোনও কোনও সময়ে সঙ্গীরা লড়াই করে আক্রান্তকে উদ্ধার করতে পারলেও দ্রুত চিকিৎসার অভাবে তাঁদের প্রাণ বাঁচানো যায় না। বাঘ-কুমিরের হামলায় জখমদের চিকিৎসার জন্য স্থানীয় স্তরে উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলার দাবি দীর্ঘদিনের।

গ্রামবাসীরা জানান, যাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে আনা হয় তাঁদেরও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কলকাতার হাসপাতালে পাঠাতে হয়। সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে বাঘে বা কুমিরে আক্রান্ত রোগীকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে শহরের হাসপাতালে নিয়ে যেতে গিয়ে নদী পারাপার ও দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। এই সময় নষ্ট হওয়ার কারণে একাধিক ক্ষেত্রে প্রাণহানির অভিযোগ উঠছে।

দীর্ঘদিন ধরে বাঘে আক্রান্ত মৎস্যজীবী ও তাঁদের পরিবারের অধিকার নিয়ে আন্দোলন চালাচ্ছে মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর। সংগঠনের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা কমিটির সহ সম্পাদক মিঠুন মণ্ডল বলেন, “সুন্দরবনে মৎস্যজীবীদের জন্য স্থানীয় হাসপাতালে উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকাঠামো নেই। প্রায় সব রোগীকেই প্রাথমিক চিকিৎসা করে কলকাতায় পাঠানো হচ্ছে। বাঘে আক্রান্তদের রক্তক্ষরণে মৃত্যুর হার বেশি। যাঁরা বাঁচেন, তাঁদের অনেককেই কার্যত প্রতিবন্ধী হয়ে জীবন কাটাতে হয়। আমাদের দাবি, বাঘে ও কুমিরে আক্রান্তদের জন্য সরকারি হাসপাতালে বিশেষ পরিকাঠামো তৈরি করা হোক।”

ক্যানিং মহকুমা স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, গোসাবা ব্লক প্রাথমিক হাসপাতাল, ছোট মোল্লাখালি প্রাথমিক হাসপাতাল ও বাসন্তী ব্লক প্রাথমিক হাসপাতালে এই ধরনের রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেই। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে তাঁদের মহকুমা হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে মহকুমা হাসপাতালেও সব সময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় অধিকাংশ রোগীকেই কলকাতার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলিতে স্থানান্তরিত করা হয়।

গোসাবা ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক সুমন সরকার বলেন, “বাঘ বা কুমিরের আক্রমণে জখম রোগীদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ কোনও ব্যবস্থা নেই। জখমের পরিমাণ দেখে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে সাধারণত মহকুমা হাসপাতালে পাঠানো হয়।”

ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালের সুপার তথা ভারপ্রাপ্ত মহকুমা অতিরিক্ত মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক পার্থসারথি কয়াল জানালেন, এই ধরনের রোগীদের জন্য ব্লক হাসপাতাল তো নয়ই, মহকুমা হাসপাতালেও আলাদা বিভাগ নেই। দ্রুত অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে কলকাতার হাসপাতালে পাঠানো হয়।

জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক মুক্তি সাধন মাইতির কথায়, ‘‘ব্লক হাসপাতালগুলিতে আগের তুলনায় পরিকাঠামো অনেকটাই উন্নত হয়েছে। বাঘ-কুমিরের আক্রমণে জখমদের জন্য বিশেষ বিভাগের ব্যবস্থা করার জন্য স্বাস্থ্য দফতরকে জানাব।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন