ভারত-বাংলাদেশ বৈঠক

অপরাধ রুখতে বাড়বে যোগাযোগ

উত্তর ২৪ পরগনা জেলার ও পারে বাংলাদেশের তিনটি জেলার সীমানা, যশোর-ঝিনাইদহ- সাতক্ষিরা। এ বার ওই তিন জেলার প্রশাসন ও জেলা পুলিশ কর্তাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে সীমান্তের দু’পাশে দুষ্কৃতী কার্যকলাপ বন্ধ করতে উদ্যোগী হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন ও পুলিশের কর্তারা।

Advertisement

সীমান্ত মৈত্র

শেষ আপডেট: ০২ ডিসেম্বর ২০১৫ ০২:১৬
Share:

উত্তর ২৪ পরগনা জেলার ও পারে বাংলাদেশের তিনটি জেলার সীমানা, যশোর-ঝিনাইদহ- সাতক্ষিরা। এ বার ওই তিন জেলার প্রশাসন ও জেলা পুলিশ কর্তাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে সীমান্তের দু’পাশে দুষ্কৃতী কার্যকলাপ বন্ধ করতে উদ্যোগী হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসন ও পুলিশের কর্তারা।

Advertisement

প্রশাসন সূত্রের, খবর ঠিক হয়েছে সীমান্তের দু’দিকের দুষ্কৃতীদের সম্পর্কে ওই চারটি জেলার প্রশাসন ও পুলিশ কর্তারা তথ্য আদান-প্রদান করবেন। যৌথ ভাবে দুষ্কৃতীদের তালিকাও প্রস্তুত করা হচ্ছে।

শনিবার বাংলাদেশের ওই তিনটি জেলার প্রশাসন ও পুলিশ কর্তাদের সঙ্গে সীমান্তের যৌথ সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা করতে তিনদিনের সফরে গিয়েছিলেন উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসক মনমীত নন্দা ও পুলিশ সুপার তন্ময় রায়চৌধুরী। তাঁরা পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে যান। সোমবার ফিরেছেন বসিরহাটের ঘোজাডাঙা সীমান্ত হয়ে। জেলাশাসক ও পুলিশ সুপার বাংলাদেশের তিনটি জেলার প্রশাসন ও পুলিশ কর্তাদের সঙ্গে আলাদা আলাদা করে আলোচনা করেছেন।

Advertisement

উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে চোরাপথে বাংলাদেশ থেকে দুষ্কৃতীদের ঢুকে পড়াটা নতুন ঘটনা নয়। ও দেশ থেকে চোরাপথে ঢুকে জেলার নানা প্রান্তে খুন-ছিনতাই-ডাকাতির ঘটনা ঘটিয়ে বাংলাদেশি দুষ্কৃতী বা ‘সুপারি কিলার’রা ফের নিরাপদে দেশে ফিরে গিয়েছে— এমন উদাহরণ ভুরি ভুরি। আবার এ দেশের দুষ্কৃতীরাও নানা অপরাধমূলক কাজ করে বাংলাদেশে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সব জেনেশুনেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জেলা পুলিশ কর্তাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া আর বিশেষ কিছু করার থাকে না। দুষ্কৃতীদের গ্রেফতার কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

বনগাঁ ও বসিরহাট মহকুমার সীমান্ত পথ ব্যবহার করে জঙ্গি অনুপ্রবেশ ঘটেছে, এমন প্রমাণও আছে। কয়েক বছর আগে পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে এ দেশে ঢোকার সময়ে বিএসএফ জওয়ানদের হাতে ধরা পড়েছিল সন্দেহভাজন লস্কর-ই-তইবার আত্মঘাতী বাহিনীর সদস্য শেখ সামির-সহ চার জন। বসিরহাট সীমান্ত দিয়েও জঙ্গি সন্দেহে অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। আবার বিধাননগর পুলিশের হাতেও ধরা পড়েছে বাংলাদেশের কুখ্যাত দুষ্কৃতী নূর মহম্মদ। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের মতে, উত্তর ২৪ পরগনা জেলাকে জঙ্গিরা নিজেদের যাতায়াতের জন্য ‘সেফ করিডর’ হিসাবে ব্যবহার করে।

দু’দেশের ওই চারটি জেলার প্রশাসন ও পুলিশ কর্তাদের মধ্যে আলোচনায় ঠিক হয়েছে, সীমান্তের দু’দিকের দুষ্কৃতী, যারা গোপনে এ দেশ থেকে অন্য দেশে আশ্রয় নেয়, তাদের তালিকা তৈরি করা হবে। পাশাপাশি দু’দেশের ওই চারটি জেলায় বন্দি দুষ্কৃতী ও সাধারণ অনুপ্রবেশকারীদের তালিকাও তৈরি হবে। প্রশাসন সূত্রের খবর, দু’দেশের মধ্যে বন্দিদের তালিকা বিনিময় হবে। তারপরে উভয় দেশের সরকারের কাছ থেকে সবুজ সঙ্কেত পেলে বন্দি প্রত্যর্পণের কাজও শুরু করা হবে। প্রশাসনের কর্তাদের আশা, এর ফলে দুষ্কৃতীদের হাতে পেতে যেমন সুবিধা হবে, তেমনই সাধারণ অনুপ্রবেশকারীরাও দ্রুত দেশে ফিরতে পারবেন।

প্রশাসন সূত্রের খবর, ও দেশের ওই তিনটি জেলার সঙ্গে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার যে সীমানা নির্ধারণের যে সব ফলক ছিল, তার বেশিরভাগই ভেঙে গিয়েছে বা উধাও হয়ে গিয়েছে। এ নিয়ে একটি যৌথ কমিটি তৈরি হচ্ছে। তারা সমীক্ষার কাজ করবে। তারপরে পরবর্তী পদক্ষেপ করা হবে দু’দেশের তরফে। বাংলাদেশ থেকে জাল টাকা দেদার ঢুকছে এ দেশে। সে সব নিয়েই উত্তর ২৪ পরগনা পুলিশ-প্রশাসনের পক্ষ থেকে সে দেশের হাতে নানা তথ্য তুলে দেওয়া হয়েছে। এবং জাল টাকা পাচার বন্ধে উদ্যোগী হতে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আবার এ দেশের কাছে বেআইনি কাশির সিরাপ পাচার রুখতে সাহায্য চাওয়া হয়েছে।

জেলাশাসক বলেন, ‘‘ও দেশ থেকে জাল টাকা-সহ অন্য নানা পাচার, নারী ও শিশু পাচার, দুষ্কৃতী ও বাংলাদেশিদের দ্রুত শনাক্ত করা-সহ সীমান্তের যৌথ সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ওই তিন জেলার প্রশাসনের সঙ্গে আরও বেশি তথ্য আদান-প্রদান করা হবে।’’ প্রশাসন সূত্রের খবর, বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে আসা মেয়েদের এ দেশে যৌন ব্যবসায় নামানোর ঘটনা আকছার ঘটে। তাদের উদ্ধার করা এবং পুনর্বাসনের বিষয়টির উপরেও জোর দেওয়া হবে। কী ভাবে এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে উঠে এসেছে ইছামতী নদীর সংস্কার, নদীতে ভাঙনের মতো বিষয়গুলি। ইছামতী দু’টি দেশেরই সমস্যা। কয়েক বছর আগে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে গাইঘাটার বর্ণবেড়িয়া থেকে কালাঞ্চি পর্যন্ত যৌথ নদী সীমান্তে ড্রেজিং মেশিন নামিয়ে পলি তুলে নদী সংস্কার করা হয়েছিল। তারপর ওই কাজ থমকে রয়েছে। ইছামতী নদী সংস্কারের বিষয়টিও দুই পড়শি দেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখবে বলে আলোচনায় ঠিক হয়েছে।

পেট্রাপোল বন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে সাম্প্রতিক কালে। বন্দর এলাকা দিয়ে সোনার বিস্কুট, কোকেন, হেরোইন পাচার বেড়ে গিয়েছে। ওই এলাকায় তৈরি হচ্ছে দেশের বৃহত্তম সুসংহত চেকপোস্ট। কাজ প্রায় শেষের পথে। এ মাসেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্বোধন করতে আসার কথা। ওই চেক পোস্টের ও পাড়ে বাংলাদেশের দিকে লিঙ্ক রোড তৈরি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কী ভাবে বন্দরের নিরাপত্তা বাড়ানো যায়, তা নিয়েও কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রের খবর।

আলোচনা, বৈঠক হয়েছে বিস্তর। তারই ফাঁকে প্রতিবেশী দেশের মানুষের আতিথেয়তার তারিফ শোনা গেল পুলিশ সুপার ও জেলাশাসকের মুখে। তন্ময়বাবু বলেন, ‘‘কত রকমের পদ যে ওঁরা খাওয়ালেন। সত্যিই আমরা মুগ্ধ। যশোরে আমাদের জন্য নাটক দেখার ব্যবস্থা করেছিলেন ওঁরা।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement