বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিজয়া সারার চল কমছে মফস্‌সলেও

প্রতিমা জলে পড়তে না পড়তেই শুরু হয়ে যেত প্রণাম করার পালা। আর সমবয়সীদের আলিঙ্গন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা হাতে কাপড়ের থলে নিয়ে গ্রামের এ বাড়ি ও বাড়ি বিজয়া করতে যেত।

Advertisement

সীমান্ত মৈত্র

শেষ আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০১৫ ০১:২০
Share:

প্রতিমা জলে পড়তে না পড়তেই শুরু হয়ে যেত প্রণাম করার পালা। আর সমবয়সীদের আলিঙ্গন। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা হাতে কাপড়ের থলে নিয়ে গ্রামের এ বাড়ি ও বাড়ি বিজয়া করতে যেত। বাড়িতে বানানো নাড়ু, তিলের তক্তি, নিমকির সঙ্গে কোথাও কোথাও রসগোল্লা, মিহিদানা, জিলিপি, লুচি, নারকেলের ছাঁচের সন্দেশও মিলে যেত। যতটা পেট ঠেসে খাওয়া যায়, বাকিটা ঝোলায় পুরে আবার অন্য বাড়ির পথে হাঁটা লাগাত ছেলের দল।

Advertisement

বছর কুড়ি আগেও গ্রাম বাংলায় এমন চিত্র দেখা যেত বিজয়ায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখন অনেক কিছু বদলে গিয়েছে। ব্যস্ত দুনিয়ায় গ্রামবাংলার বিজয়ার চিত্র বদলে যাচ্ছে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রণাম সারার প্রথা প্রায় বিরল। ছোটখাট মিষ্টির দোকানগুলোও উঠে গিয়েছে। গজা, বোঁদে, জিলিপি, মিহিদানারা এক সময়ে বিজয়ার বাজারে চালিয়ে ব্যাট করেছে। ইদানীং তারাই কোণঠাসা। মিষ্টির দোকানের মালিকদের মতে, মানুষের মিষ্টি খাওয়ার রুচি বদলেছে। গজা-বোঁদে-জিলিপির দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না খদ্দেররা। বরং ভিড় বেশি ফাস্টফুডের দোকানে।

বনগাঁর একটি ফাস্টফুড দোকানের মালিক সুভাষ হালদার বলেন, ‘‘বিজয়ায় মানুষ এখন লাড্ডু, চানাচুর, সোনপাপড়ি, আইসক্রিম, প্যাটিস, বরফি, ঠান্ডা পানীয় কিনছেন। মিষ্টির চেয়ে স্ন্যাক্সের দিকেই ঝোঁক বেশি।’’ এলাকার কিছু প্রবীণদের মতে, ‘‘আমরা বিজয়ার গ্রামের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রণাম করতাম। এতে বাড়ির মা-কাকিরা খুশি হতেন। আমাদের খাইয়ে তাঁরা তৃপ্তি পেতেন। আর এখন নিমন্ত্রণ না করলে তো ছেলেমেয়েরা কারও বাড়িই যেতে চায় না।’’ অনেকের মতে, এখন কারও বাড়িতে অসময়ে হাজির হলে বিরক্তও হন অনেকে। প্রবীণ কয়েক জনের কথায়, ‘‘স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ ডায়েট কন্ট্রোল করতে গিয়ে মিষ্টি খাওয়াও ভুলতে বসেছেন। অল্পবয়সীদের দেখি, মিষ্টি মুখে তুলতেই অরুচি। আর বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিজয়া করার সময়ই বা কোথায় তাদের!’’

Advertisement

বনগাঁর কবি স্বপন চক্রবর্তী বলেন, ‘‘একটি ধুতি ছিঁড়ে থলে বানানো হতো। আমরা ছোটরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রণাম করতাম। লুচি, সুজি, নারকেল নাড়ু দেওয়া হতো। কোনও জাতপাত দেখতাম না। খোঁজ নিতাম, কোন বাড়িতে মাংস দিয়ে ঘুগনি হয়েছে। সেই বাড়িতে দলবেঁধে হাজির হতে ভুলতাম না।’’ বনগাঁর বাসিন্দা চিকিৎসক আশিষকান্তি হীরার কথায়, ‘‘ছোটবেলায় বিজয়া করতে আমরাও বন্ধুরা দলবেঁধে বাড়ি বাড়ি যেতাম। কিন্তু এখন আর তেমনটা দেখি না।’’

বনগাঁ, হাবরা, অশোকনগর এলাকার বহু মানুষ দেশভাগের পরে ও পার বাংলা থেকে এ দেশে এসেছেন। স্মৃতি এখনও টাটকা অনেকেরই। ও পার বাংলা থেকে আসা কেউ কেউ জানালেন, এ দেশে আসার পরেও বিজয়ার পরে বাড়ি বাড়ি ঘোরার সংস্কৃতি দেখেছেন। আশির দশক বা নব্বই দশকের শুরুতেও চলটা ছিল। ইদানীং বিরল। বিমল বিশ্বাস নামে অবসরপ্রাপ্ত এক শিক্ষকের কথায়, ‘‘এখন ছোটরা বিজয়ার পরে রাস্তায় দেখা হলে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। পাছে নিচু হয়ে প্রণাম করতে হয়!’’ বনগাঁর প্রাক্তন বিধায়ক গোপাল শেঠ বলেন, ‘‘বিজয়া দমশীর পরে ছোটদের আর দেখা যায় না। বড়দের পায়ে হাত দিয়ে নমস্কার করার রেওয়াজ প্রায় উঠেই গিয়েছে।’’

তবে মাঝবয়সে পৌঁছে অনেকের মনে হচ্ছে ভুলতে বসা সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা দরকার। পুজোয় নিউজিল্যান্ড থেকে বারাসতের বাড়িতে এসেছেন পেশায় ইঞ্জিনিয়ার প্রতীম বিশ্বাস। বয়স চল্লিশের কোঠা ছুঁয়েছে। জানালেন, এ বার ঠিক করেছেন, স্কুলের দিনগুলোর মতো বন্ধুদের বাড়িতে ঘুরে ঘুরে বিজয়া সারবেন। অনিন্দ্য চক্রবর্তী পেশায় শিক্ষক। প্রতীমের বন্ধু অনিন্দ্য জানালেন, আইডিয়াটা বন্ধু-মহলে হিট। অনেক দিন পরে এর ওর বাড়িতে যাওয়ার সূত্রে দেখা হচ্ছে পুরনো বন্ধুদের বাবা-মায়েদের সঙ্গেও। ফিরে আসছে ছোটবেলার নানা স্মৃতি।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement