কথার পর একমত। বাংলাদেশের শ্যামনগর থানার ওসির সঙ্গে এ বাংলার হেমনগর থানার ওসি।— নিজস্ব চিত্র।
মৈত্রীর বার্তা দিতে গিয়েই অশান্তির ঘনঘটা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঢাকা সফরের আগে বন্ধুত্বের বার্তা দিতে রাজ্যের বিভিন্ন জেলে বন্দি ১১১ জন বাংলাদেশি মৎস্যজীবীকে বৃহস্পতিবার মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু কী ভাবে সে কাজ হবে, তা নিয়ে মন কষাকষি ও বচসা এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে আসল উদ্দেশ্যটাই ভেস্তে যেতে বসেছিল। শেষ পর্যন্ত দু’দেশের পুলিশ মধ্যস্থতা করে সমঝোতার রাস্তা বার করে। বেলা বারোটার অনুষ্ঠান শেষ হয় বিকেল তিনটেয়। সুন্দরবনের জঙ্গল লাগোয়া কালিন্দী নদীর মাঝে ফ্ল্যাগ মিটিং করে ৬টি ট্রলার-সহ বাংলাদেশি মৎস্যজীবীদের তুলে দেওয়া হল বাংলাদেশের প্রশাসনের হাতে।
বুধবার দুপুরে উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জের কালিতলা পঞ্চায়েতের সামসের নগরে এই অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিল। জেলা পুলিশ সূত্রের খবর, ধরা পড়া মৎস্যজীবীদের নিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) এ পারে বিএসএফের ঘাঁটিতে আসতে অস্বীকার করে। বিএসএফ-ও জানায়, মৎস্যজীবীদের ফিরিয়ে দিতে তারা তাদের নিয়ে ওপারে যাবে না। এ নিয়ে বিএসএফ ও বিজিবি-র মধ্যে তুমুল বচসা হয়। পরিস্থিতি বিস্ফোরক হয়ে ওঠে। হেমনগর থানার ওসি অমলেশ বালা ঘটনাটি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানান। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে আসা বাংলাদেশের শ্যামনগর থানার ওসি আমিনুল ইসলামও তাঁর সঙ্গে আলোচনা করেন। পরে দু’দেশের ওসি পরিস্থিতি সামাল দেন। আলোচনায় ঠিক হয়, কালিন্দী নদীর মাঝখানে হবে ফ্ল্যাগ মিটিং। সেখানেই এক পক্ষ অপর পক্ষের হাতে তুলে দেবে মৎস্যজীবীদের। অবশেষে বিকেল তিনটের পরে সে পর্ব সমাধা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই মৎস্যজীবীরা বিভিন্ন সময়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে এসে অবৈধ ভাবে এ দেশে ঢোকেন। সেই অভিযোগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার কাকদ্বীপ, ফ্রেজারগঞ্জ, বকখালি-সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে তাঁদের ধরা হয়েছিল। এত দিন তাঁরা আলিপুর ও দমদম-সহ বিভিন্ন জেলে বন্দি ছিলেন। সরকার তাদের মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মঙ্গলবার তাঁদের হিঙ্গলগঞ্জের হেমনগর উপকূলবর্তী থানায় নিয়ে আসা হয়। বাংলাদেশের বড়গোড়া গ্রামের বাসিন্দা মহম্মদ হাসান হাওলাদার ২০১২ সালে মাছ ধরতে বেরিয়ে ভুল করে বকখালিতে এসে পুলিশের হাতে ধরা পরেছিলেন। কেমন লাগছে বাড়ি ফিরতে? প্রশ্ন করতেই হাসিমুখে হাসান বলেন, “শুনেছি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যাচ্ছেন বাংলাদেশে। সে কারণেই নাকি আমাদের মুক্তি! এই সিদ্ধান্তে আমরা অত্যন্ত খুশি। দেশে ফিরতে পারছি। খুব ভালো লাগছে।” কক্সবাজারের নুহারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মাফিজ আলম ধরা পড়েছিলেন ফ্রেজারগঞ্জ থেকে। তাঁর কথায়, “এ দেশে যে ক’দিন ছিলাম, কোনও অসুবিধা হয়নি।” এ দেশের পুলিশ তাঁদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করেছে বলেও ওই মৎস্যজীবীরা জানান।
বন্দি প্রত্যাবর্তনের অনুষ্ঠানে ছিলেন বিএসএফের ৩ নম্বর ব্যাটেলিয়নের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমান্ড্যান্ট অভিষেক কুমার, হেমনগর উপকুলবর্তী থানার ওসি। ছিলেন বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজেবি) কমান্ড্যান্ট আতাউর রহমান এবং সেখানকার শ্যামনগর থানার ওসি আমিনুল ইসলামও। অনুষ্ঠানে কাগজপত্র লেখালেখির পর বিএসএফ ক্যাম্পে সকলকে মিষ্টি মুখ করানো হয়। মন কষাকষি মুছে হাতে হাত মিলিয়ে ফিরে যান বিএসএফ ও বিজিবি-র অফিসাররা।