এ রকম বিজ্ঞাপনেই ছেয়েছে শহর।— নিজস্ব চিত্র।
চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগে রানাঘাট থেকে ছয় যুবককে গ্রেফতার করা হল।
কয়েক দিন আগে চাকদহ থেকেও তিন যুবককে ধরা হয়েছিল। তার মধ্যেও দু’জনের বাড়ি রানাঘাটে। একের পর এক অভিযোগ সামনে আসায় পরিস্থিতি কতটা ঘোরালো, তা-ই ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কিন্তু বিরাট এলাকা জুড়ে প্রতারণার যে জাল ছড়িয়ে রয়েছে বলে অভিযোগ, পুলিশ এখনও তার নাগাল পায়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, সোমবার যে ছ’জনকে ধরা হয়েছে তাদের নাম সঞ্জিত মণ্ডল, প্রশান্ত পাল, সন্তু দাস, অলোক সিংহ, মৃন্ময় দাস ও সুব্রত বারুই। তাদের বাড়ি রানাঘাটের নানা এলাকায়। রানাঘাট কলেজের কাছে একটি তথাকথিত ‘প্লেসমেন্ট সেন্টার’ থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। আজ, মঙ্গলবার তাদের রানাঘাট আদালতে তোলার কথা।
রানাঘাট রেলপুলিশের আইসি সুভাষ রায় বলেন, ‘‘চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওই সংস্থা তাঁর থেকে ১১ হাজার টাকা নিয়েছিল বলে এক জন আমাদের কাছে অভিযোগ করেছিলেন। তিনি জানান, রানাঘাট স্টেশনে ওই টাকা লেনদেন হয়েছিল। তার ভিত্তিতেই ওদের গ্রেফতার করা হয়েছে।’’ তাঁদের কাছে খবর, চাকরি দেওয়ার নামে কয়েক জন যুবকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছিল। আরও কেউ এতে যুক্ত রয়েছে কি না, তা নিয়েও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু এ তো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। বাসস্ট্যান্ড থেকে রেল স্টেশন, ট্রেনের কামরা, বাজার— একটু চোখ খোলা রাখলেই নজরে আসবে নিশ্চিত চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া বিজ্ঞাপন। যেগুলির মোদ্দা কথা, ফোন করলেই চাকরি হাতের মোয়া! কোথাও যেমন সরাসরি শূন্যপদের সংখ্যা বলা হয়, কোথাও আগাম জানিয়ে দেওয়া হয় নিয়োগের ক্ষেত্র। রেল, জাহাজ, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাঙ্ক, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, দেশ-বিদেশের হোটেল— কী নেই সেই তালিকায়!
চাকরিপ্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা কিন্তু বেশি নয়— নাম লিখতে পারা থেকে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক স্তর। সেই যোগ্যতা অনুযায়ীই পদের আশ্বাস। যেমন, নাম সই করতে পারা যুবকদের মাটি কাটার কাজ, চটকল বা কারখানার শ্রমিক। লেখাপড়া জানা যুবকদের জন্য নিরাপত্তা রক্ষী, হোটেলের বয়, হাউস কিপার, ওয়েটার, কুক। বয়স হতে হবে ১৭-৪০ বছরের মধ্যে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেরই কাজের সময় ৮ ঘণ্টা, কিছু ক্ষেত্রে ১২ ঘণ্টা। কর্মস্থল কল্যাণী, মুর্শিদাবাদ, কলকাতা, হাওড়া থেকে শুরু করে দিল্লি, মুম্বই, এমনকী বিদেশ। বেতন পাঁচ হাজার থেকে শুরু করে যদ্দূর যাওয়া যায়। অনেক সময়ে ইএসআই, পিএফ-সহ বিভিন্ন সুযোগের কথাও বলা হয়।
অধিকাংশ বিজ্ঞাপনেই কিন্তু সংস্থার কোনও ঠিকানা থাকে না, এক বা একাধিক মোবাইল নম্বর থাকে। ওই নম্বরে ফোন করলে বলা হয়— ‘এক কপি ছবি ও বায়োডেটা নিয়ে অমুক ঠিকানায় আমাদের অফিসে চলে আসুন। সব জানতে পারবেন।’ ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এক বার ওই অফিসে পা দেওয়া মানেই জালে জড়িয়ে যাওয়া। প্রথমেই নগদ টাকা নিয়ে ‘রেজিস্ট্রেশন’ করানো হয়। তার পর শুরু হয় অনন্ত অপেক্ষা— কবে ডাক আসে। দিনের পর দিন ওই সব অফিসে হত্যে দিয়েও চাকরি পাননি, এই সংখ্যাটা কম নয়। শেষে ক্লান্ত হয়ে এঁদের সিংহ ভাগ ওই অফিসে যাওয়াই ছেড়ে দেন।
এ ক্ষেত্রে আবার বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল একটি দৈনিক সংবাদপত্রে। তাতে মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়। অভিযোগকারী জানিয়েছেন, বিজ্ঞাপন দেখেই তিনি ও তাঁর মতো কয়েক জন মোবাইল মারফত রানাঘাট কলেজের কাছে ‘প্লেসমেন্ট সেন্টারে’ যোগাযোগ করেছিলেন। মুর্শিদাবাদের খড়গ্রামের বাসিন্দা সুমন প্রামাণিক ও সুমন মণ্ডলের অভিযোগ, ‘‘জাহাজে রাঁধুনি, স্টোরকিপার-সহ বিভিন্ন পদে চাকরি দেওয়া হবে বলে আমাদের কাছ থেকে এ পর্যন্ত ১১২০০ টাকা নেওয়া হয়েছে।’’ হুগলির তারকেশ্বরের মানস রায়ের অভিযোগ, জাহাজে স্টোর কিপারের চাকরি দেওয়ার নাম করে তাঁর কাছ থেকেও হাজার তিনেক টাকা নেওয়া হয়েছে।
ঘটনাচক্রে, এর আগে চাকদহে যারা ধরা পড়েছিল, তারাও জাহাজে চাকরি দেওয়ার নাম করে ‘রেজিস্ট্রেশন ফি’ বাবদ তিন হাজার টাকা করে নিচ্ছিল। অন্তত শ’খানেক যুবকের কাছ থেকে ওই ‘ফি’ নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। দীর্ঘদিন ঘুরেও চাকরি না পেয়ে কয়েক জন এনফোর্সমেন্ট বিভাগে অভিযোগ জানান। তার ভিত্তিতেই পুলিশ তিন জনকে গ্রেফতার করে।
কানাই বিশ্বাস নামে রানাঘাটের এক যুবকের কথায়, ‘‘প্রথমত রেজিস্ট্রেশনের জন্য খুশি মতো টাকা নেওয়া হয়। পরে আবার পোশাক বানাতে হবে, প্রশিক্ষণ দিতে হবে বলেও টাকা নেয়। কয়েক জন হয়তো কাজ পায়, বাকিরা ঘুরতে থাকে।’’ যাঁরা চাকরি পান, তাঁদেরও বেশির ভাগ খুশি হতে পারেন না। সৌমেন দাস নামে এক যুবকের অভিযোগ, ‘‘যে পদে নিয়োগ করার কথা বলা হয়, সেই পদে নিয়োগ হয় না। বেশ কিছু দিন চাকরি করেও ঠিক মতো বেতন পান না অনেকে। সুযোগ-সুবিধা তো মেলেই না, দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ করানোর কথা বলে নিয়ে গিয়ে ১২ ঘণ্টা কাজ করানো হয়। এ ভাবে কিছু দিন চলার পরে বাধ্য হয়ে কাজ ছেড়ে চলে যান।
স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এই ধরনের কারবার চলছে কী করে? ‘জব সেন্টার’ চালিয়ে ধৃতদের একাংশের দাবি, তাঁরা মোটেই লোক ঠকানো কারবার করেন না। কিছু দিন দেরি হলেও চাকরি ঠিকই দেন। চাকরি নিয়ে কারও কোনও সমস্যা হয়েছে বলেও তাঁদের জানা নেই। যদিও এই ধরনের কারবার করার ছাড়পত্র তাঁরা কোথা থেকে পেলেন, তা পরিষ্কার নয়। নদিয়া জেলা পুলিশের বক্তব্য, তারা অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু এই ধরনের কারবার কী করে চলছে, তা ‘ট্রে়ড লাইসেন্স’ যাঁরা দেন, তাঁরাই বলতে পারবেন।
শহরাঞ্চলে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষমতা পুরসভার হাতে। রানাঘাটের পুরপ্রধান পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায়ের দাবি, ‘‘এই সব ব্যবসার জন্য ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার প্রশ্নই নেই। কযেক জন এমন আবেদন করেছিলেন। কিন্তু আমরা একটি ক্ষেত্রেও ট্রেড লাইসেন্স দিইনি।’’ চাকদহের পুরপ্রধান দীপক চক্রবর্তীর মতে, এই সব সংস্থা প্রথমে সাধারণত ‘কোচিং সেন্টার’ খুলে বসে। পরে বেকার যুবক-যুবতীদের সমস্যার ফায়দা ওঠায়। তাঁর কথায়, ‘‘এই সংস্থাগুলি বহু যুবক-যুবতীর ক্ষতি করে চলেছে।’’ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুই পুরপ্রধানই পুলিশের কাছে আর্জি জানিয়েছেন।
কল্যাণী মহকুমাশাসক স্বপনকুমার কুণ্ডু জানান, কেউ যদি প্রশিক্ষণ নিয়ে চাকরি পেতে চান, তার সরকারি বেশ কিছু প্রকল্প রয়েছে। সেই রাস্তায় না গিয়ে ভুঁইফোড় সংস্থার দ্বারস্থ হলে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
পুলিশ-প্রশাসন শুধুই অভিযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকবে, না কি নিজেরাই সক্রিয় হয়ে বিজ্ঞাপনের মোবাইল নম্বর ধরে খোঁজখবর শুরু করবে, প্রশ্ন এখন সেটাই।