নদিয়ার তাহেরপুরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি(আইপ্যাক)-এর দফতর এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে ইডি অভিযান নিয়ে অবশেষে মুখ খুললেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় তৃণমূলকে সহায়তা করছে বলে ইডি হানার মুখে পড়েছে আইপ্যাক। বিজেপিকে নিশানা করে অভিষেক জানান, তাঁকে, তাঁর স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মাকে হেনস্থা করেছে ইডি। সামনেই বিধানসভা নির্বাচন। তাই আবার ইডি-সহ কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে কাজে লাগিয়ে তাঁদের হেনস্থার চেষ্টা চলবে। কিন্তু তিনি বা তৃণমূলের কেউ ‘দিল্লির কাছে’ মাথানত করবেন না।
শুক্রবার নদিয়ার তাহেরপুর সভা করেন অভিষেক। সেখানে তিনি বৃহস্পতিবারের ইডি হানা নিয়ে মন্তব্য করেন। তৃণমূলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলেন, ‘‘বাংলার মানুষকে শোষিত, অবহেলিত করতে চাইছে ওরা (বিজেপি)। কিন্তু বাংলার মানুষ মাথা নত করবে না।’’ এর পর কেন আইপ্যাকের অফিস এবং কর্ণধারের বাড়িতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারীরা গেলেন, তার ব্যাখ্যা দেন। তাঁর কথায়, ‘‘এরা ইডিকে ব্যবহার করবে। তৃণমূলের জন্য একটা সংস্থা কাজ করে। এই ভোটে যাতে মানুষের অসুবিধা না-হয় তারা তৃণমূলের জন্য একটা অ্যাপ তৈরি করেছে।
‘দিদির দূত’ বলে একটি অ্যাপ তৈরি করেছে আইপ্যাক বলে একটি সংস্থা। কিন্তু কেন তারা এসআইআরে তৃণমূলের হয়ে কাজ করছে, কেন গরিব মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতায় অংশগ্রহণ করছে, (সে জন্য) গতকাল ইডি পাঠিয়ে রেড করিয়েছে। আর সাধারণ মানুষের অধিকার ইসি (নির্বাচন কমিশন)-কে পাঠিয়ে হরণ করছে। আর ইডিকে পাঠিয়ে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করছে। তোমাদের সব আছে। কিন্তু মানুষ সঙ্গে নেই। আমাদের কিচ্ছু নেই। সঙ্গে মানুষ আছে।’’ বিজেপিকে নিশানা করে সাংসদ অভিষেক মন্তব্য করেন, গণতন্ত্রে গণদেবতাই শেষ কথা। এখানে খেটে খাওয়া মানুষই ঠিক করবেন, তাঁরা কাদের সঙ্গে চলবেন। ওই প্রসঙ্গে অভিষেক এ-ও বলেন, ‘‘ওরা ভাবছে, ‘ইসিকে দিয়ে ভোটাধিকার কেড়ে নেব। ইডি লাগিয়ে বিরোধীদলের কণ্ঠরোধ করব।’ ইডি, সিবিআই, কেন্দ্রীয় বাহিনী, মিডিয়া, বিচারব্যবস্থা ইনক্যাম ট্যাক্স, অর্থব্যবস্থা আছে লাগাও। বাংলার মানুষ জল্লাদ আর দিল্লির জমিদারদের কাছে মাথা নত করবেই না।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আপনারা দেখেছেন, আমার স্ত্রী, বাবা-মা-বাচ্চা, কাউকে ছাড়েনি (তদন্তকারী সংস্থার ‘হয়রানি’ নিয়ে)। আমরা অন্য ধাতুতে তৈরি। আমাদের মেরুদণ্ড ‘নট ফর সেল।’ দিল্লির জল্লাতদের সামনে মাথা নিচু করার লোক নই।’’
গত বছরের ২০ ডিসেম্বর এই তাহেরপুরেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জনসভা ছিল। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে হেলিকপ্টার তাহেরপুরে নামতে না-পারায় কলকাতা বিমানবন্দরে ফিরে গিয়ে ফোনে ভাষণ দেন মোদী। এসআইআর আবহে তাঁর বক্তৃতায় মতুয়াদের উল্লেখ থাকলেও তাঁদের এসআইআর-উদ্বেগ কমানোর মতো কোনও বার্তা ছিল না। শুক্রবার সেই প্রসঙ্গ তুলে অভিষেক খোঁচা দেন। তিনি দাবি করেন, ওই সভা ভরাতে হিমশিম খেয়ে পাশের জেলাগুলি থেকে লোক নিয়ে গিয়েছিল বিজেপি। কিন্তু তৃণমূলকে তা করতে হয়নি। মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এসেছেন। অভিষেকের দাবি, ‘‘এই মাঠে যে দিকে চোখ যাচ্ছে, মানুষ আর মানুষ। মানুষময়। এর দ্বিগুণ মানুষ রাস্তায়। তাঁরা এখনও পৌঁছোতে পারেননি সভায়। শুধু রানাঘাট সাংগঠনিক জেলার শক্তিতে নদিয়ার এত মানুষ ছুটে এসেছেন সভায়।’’
সভায় লোক দেখে অভিষেক মনে করেন, আগামিদিন তৃণমূলময় হতে যাচ্ছে নদিয়া। শুধু সময়ের অপেক্ষা। তাঁর দাবি, আর বিজেপির মিথ্যা নাগরিকত্বের আশ্বাসে ভুলবে না মানুষ। তৃণমূলের ওই সভায় কেউ তাঁকে দেখার জন্য বা রাজনৈতিক বক্তব্য শুনতে হাজির হননি। আসলে সকলে সিদ্ধান্ত নিয়ে গিয়েছেন যে এ বার তৃণমূলের পাশেই থাকবেন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো নদিয়ার সভাতেও ‘ভুতুড়ে ভোটার’ হাজির করান অভিষেক। তিন ব্যক্তিকে তিনি মঞ্চে ডাকেন, যাঁদের এসআইআর প্রক্রিয়ায় মৃত বলে দেখানো হয়েছে। অভিষেক জানান, এমন ১০০টি ঘটনা আছে। তিনি কয়েকটি মাত্র উদাহরণ দিচ্ছেন। এসআইআর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফের দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করেন তৃণমূল নেতা। তিনি বলেন, ‘‘এত দিন ধরে এতগুলো মানুষ এই মাটিতে বাস করেন। এখানে তাঁদের বাড়ি, পরিবার আছে। বন্ধুবান্ধব রয়েছে। কাজ করছেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী বা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর মতো তাঁদেরও নাগরিক হিসাবে সমান অধিকার রয়েছে। আপনারা সকলে এই তিন জনকে দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু জ্ঞানেশ কুমারের ইলেকশন কমিশনের চোখে এঁরা মৃত!’’ ফের নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ, ভারতীয় জাতীয় দলের ক্রিকেটার এবং টলিউড অভিনেতাকে এসআইআরের নোটিস পাঠানো নিয়েও কমিশনকে একহাত নেন অভিষেক। তিনি জানান, এই পরিস্থিতির সমাধান একটাই— আগামী বিধানসভা ভোটে তৃণমূলকে চতুর্থ বার সরকার গড়তে সাহায্য করা। নদিয়াবাসীর উদ্দেশে অভিষেক বলেন, আগামী বিধানসভা নির্বাচনে জেলার ১৭টি আসনের ১৭টিতেই তৃণমূলকে জেতাতে হবে।