ভরা এজলাসে দাঁড়িয়ে নির্যাতিত মহিলাকেই তিনি ‘ডেঞ্জারাস’ বলে দেগেছেন। বিভিন্ন হত্যা-কাণ্ডে শাসকদল তৃণমূলের জড়িত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা তুলতে চেয়ে বিচারকের সামনে একাধিক সওয়ালও করেছেন। এমনকী, ক্ষমতার ‘অপব্যবহার’ করছেন— সম্প্রতি এমন গুরুতর অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
বীরভূম জেলা আদালতের মুখ্য পাবলিক প্রসিকিউটর রণজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়েরই বদলি চেয়ে এ বার আবেদন জমা পড়ল জেলাশাসকের কাছে। আর তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে সেই আবেদন করলেন নিহত দুবরাজপুরের এসআই অমিত চক্রবর্তীর স্ত্রী পুতুল সরকার চক্রবর্তী, যিনি নিজেও পুলিশকর্মী। প্রসঙ্গত, সরকারি আইনজীবী হিসাবে রণজিৎবাবুর ভূমিকা নিয়ে অতীতে বহুবার প্রশ্ন উঠলেও সম্প্রতি অমিত হত্যা কাণ্ডে অভিযুক্তদের একটা বড় অংশের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের আর্জি জানানোয় তা ভিন্ন মাত্রা পায়। পরিবার ও পুলিশের একাংশের প্রবল ক্ষোভের মুখে পড়ে রণজিৎবাবু পরে সেই আবেদন প্রত্যাহারও করে নেন।
ঘটনা হল, আগামী সোমবার থেকেই সিউড়ি আদালতে শুরু হতে চলছে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণপর্ব। ঠিক তার আগেই নিহতের স্ত্রীর ওই আবেদন যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন আইনজীবীরা। পুতুলদেবী বুধবার সরাসরিই বলেন, ‘‘উনি (রণজিৎবাবু) পিপি থাকলে বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। এমন মনে হওয়ায় কারণেই ৫ ফেব্রুয়ারি ডাকযোগে জেলাশাসককে ওই আবেদন জানিয়েছি। অবশ্য আমার এই আবেদনের ভিত্তিতে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবেন কিনা জানি না।’’ বীরভূমের জেলাশাসক পি মোহন গাঁধী জানান, এ ব্যাপারে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।
২০১৪ সালের ৩ জুন দুবরাজপুরের আউলিয়া গোপালপুর গ্রামে তৃণমূল-সিপিএম ওই সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে দুষ্কৃতীদের ছোড়া বোমার আঘাতে মারাত্মক জখম হয়ে মৃত্যু হয় দুবরাজপুর থানার টাউনবাবু অমিত চক্রবর্তীর। ৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। অভিযুক্ত ছিলেন শাসকদলের যশপুরের অঞ্চল সভাপতি তথা দুবরাজপুর পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ আলিম শেখ-সহ এলাকার প্রায় ৩০ জন শাসকদলের কর্মী-সমর্থকের।
গত জানুয়ারিতে আলিম-সহ চার্জশিটে থাকা ৩৬ জনকে ‘নিরপরাধ’ বলে দাবি করে তাঁদের নাম ওই মামলা থেকে বাদ দেওয়ার আর্জি আদালতে জানান রণজিৎবাবু। তাঁর দাবি ছিল, তিনি নিজে তদন্ত করে দেখে তাঁদের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত না থাকার প্রমাণ পেয়েছেন। ওই আর্জির কথা জানাজানি হতেই প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েন রণজিৎবাবু। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, শাসকদলের লোকেদের মদত করতেই পুলিশ হত্যার মতো ঘটনায় জড়িতদের ‘ছাড়’ দেওয়ানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। ঘরে-বাইরে প্রবল সমালোচনার মুখে গত ১৯ জানুয়ারি মামলার শুনানির দিন নিজের অবস্থান থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে আগের আবেদনটি তুলে নেন।
আইনজীবীদের একাংশের মত, যে ভাবে এক পুলিশ অফিসার খুনে একপ্রকার অভিযুক্তদের পক্ষ নিয়ে নাম বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন পিপি, সেটাই যেন কোথাও টলিয়ে দিয়েছে নিহতের পরিবারের ভরসা। রণজিৎবাবুর প্রতি তাঁরা আর আস্থা দেখাতে পারছেন না। সেই কারণেই গত ১৯ জানুয়ারি শুনানির সময় পিপির ওই নাম প্রত্যাহারের আর্জির বিরোধিতা করতে প্রথম বার আদালতে জনসমক্ষে এসেছিলেন পুতুলদেবী। তিনি এ দিন বলেন, ‘‘তখনকার মতো খারাপ কিছু না হলেও সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব চলাকালীন পিপি ঠিকঠাক ভূমিকা নেবেন কি না, তা নিয়ে আমার সংশয় রয়েছে। সে ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়া বিঘ্নিতও হতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই পিপি বদলের আবেদন করেছি।’’ রণজিৎবাবুর প্রতি একপ্রকার অনাস্থাই প্রকাশ করেছেন অমিতবাবুর বোন অমিতাদেবীও। তাঁর এ দিনের বক্তব্য, ‘‘যিনি এই বিষয়ে আবেদন করেছেন, তিনিই বিষয়টি ভাল বলতে পারবেন। তবে আমার অভিমত, পিপি বদল হলে দাদার খুনের মামলার দিক থেকে হয়তো ভালই হবে।’’
ঘটনাচক্রে রণজিৎবাবু বরাবরই এলাকায় তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। নানুরের সুচপুর গণহত্যা মামলায় তিনি-ই ছিলেন তৃণমূলের তরফের আইনজীবী। সরকারি আইনজীবী হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পরে সেই রণজিৎবাবুর ভূমিকা নিয়ে যে এই প্রথম প্রশ্ন উঠেছে, তা নয়। পাড়ুইয়ের সাগর ঘোষ হত্যা মামলায় গত বছর নিহতের স্ত্রী সরস্বতীদেবীও তাঁকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিযোগ করে জেলাশাসকের কাছে পিপির বদল চেয়ে ওই একই আবেদন জানিয়েছিলেন। ২০১৩ সালে মুরারই থানায় রুজু হওয়া চারটি মামলা থেকে অভিযুক্তদের নাম প্রত্যাহার করে নেওয়ার আর্জি জানান। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জড়িতেরা শাসকদলের লোক বলে এলাকায় পরিচিত। ওই চারটির অন্যতম ফরওয়ার্ড ব্লক কর্মী মিয়াঁ শেখ খুনের মামলার আর্জিটি গত অক্টোবরেই খারিজ করে দেয় রামপুরহাট আদালত। গত জুলাইয়ে আবার পুলিশের উপরে বোমা নিয়ে আক্রমণের একটি মামলায় ধৃত সাত্তোরের নির্যাতিতাকে অত্যন্ত ‘বিপজ্জনক’ ও ‘প্রভাবশালী’ বলে প্রমাণ করার মরিয়া চেষ্টা করেছিলেন। এমনকী, তাঁর সঙ্গে তিনি তুলনা টেনেছিলেন খাগড়াগড় বিস্ফোরণ-কাণ্ডে ধৃত মহিলাদেরও। বিচারক অবশ্য কেস ডায়েরিতে কিছু না পেয়ে নির্যাতিতাকে জামিন দেন।
ওই আইনজীবীর উপরে দলের প্রভাব খাটানোর অভিযোগ অবশ্য কোনও দিনই মানতে চায়নি জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব। তৃণমূলের জেলা সহ-সভাপতি তথা আইনজীবী মলয় মুখোপাধ্যায়ও এ দিন একই দাবি করে জানান, নিহতের পরিবারের লোকজন পিপি বদলের আবেদন জানাতেই পারেন। সে সিদ্ধান্ত প্রশাসনের। এ নিয়ে দলের তরফে কিছু বলার নেই বলেই তিনি জানিয়ে দিয়েছেন। এ দিকে, সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রামচন্দ্র ডোমের প্রতিক্রিয়া, ‘‘খবর পেয়েছি, এই পরিস্থিতিতে মামলা থেকে সরে দাঁড়াতে চাইছেন ওই আইনজীবী। আসলে নাম প্রত্যাহারের ওই পদক্ষেপ যে শাসকদলের সর্বোচ্চ স্তর থেকে নির্দেশ আসার পরেই নেওয়া হচ্ছিল, তা জানাজানি হতে এমনিতেই প্রবল সমালোচনা হয়েছিল। মুখ পুড়েছিল সরকারের। এ দিন নিহতের স্ত্রীর ওই আবেদনের পরে তাঁকে সরে যেতে বলার নির্দেশ দিয়ে হয়তো মুখরক্ষার একটা চেষ্টা করা হবে।’’
বিরোধীদের সেই আশঙ্কা সত্যি করেই রণজিৎবাবুও এ দিন জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি ওই মামলা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে চান। তাঁর বক্তব্য, ‘‘শেষ শুনানিতেই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও দোষীদের শাস্তির জন্য চার্জ গঠন করিয়েছিলাম। যিনি আমার প্রতি অনাস্থা দেখিয়ে জেলাশাসকের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, তিনি কিন্তু সে দিন এই অনাস্থা দেখাননি।’’