ডুমুরজলায় অমিত শাহ। ছবি: দীপঙ্কর মজুমদার।
এক বছর আগের সেই ঝাঁঝ আর নেই। তবু মন্দের ভাল।
অরুণ জেটলি, রাজনাথ সিংহের সাম্প্রতিক রাজ্য সফরের পরে মুষড়ে পড়া বিজেপি নেতারা খানিকটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন সোমবার। দলের সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহের বক্তৃতা শুনে।
চলতি মাসের গোড়ায় ‘বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট’-এ এসে কার্যত রাজ্য সরকারের প্রশংসাই করেছিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। এমনকী, দলীয় অনুষ্ঠানেও তৃণমূল সরকার নয়, আগের বাম সরকারের সমালোচনাতেই মুখর ছিলেন তিনি। একই অবস্থান ছিল কেন্দ্রীয় পরিবহণমন্ত্রী নিতিন গডকড়ীর। আর দিন কয়েক আগে অশোকনগরে এসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ তৃণমূল সরকারকে কড়া আক্রমণ করলেও নীরব ছিলেন সারদা-কাণ্ড নিয়েই! ফলে অস্বস্তি বাড়ছিল রাজ্য বিজেপির অন্দরে। বিধানসভা ভোটের মুখে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁদের হাতে কোনও অস্ত্র দিচ্ছেন না বলে আক্ষেপও ছিল। শেষ পর্যন্ত এ দিন তাঁদের মুখরক্ষা করলেন অমিত শাহ।
দ্বিতীয় বার দলের সর্বভারতীয় সভাপতি হওয়ার পরের দিন, সোমবার হাওড়ার ডুমুরজলা ময়দানেই ছিল অমিতের প্রথম জনসভা। সেখানে সারদা-কাণ্ড থেকে জঙ্গি কার্যকলাপ, শিল্পের দৈন্যদশা থেকে আইনশৃঙ্খলা— পুরনো অনেক সংলাপই শোনা গেল তাঁর গলায়। অমিত বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে সব উদ্যোগ বন্ধ। একমাত্র গরিব ঠকানো অর্থলগ্নি সংস্থার (চিট ফান্ড) শিল্প চালু আছে! সারা দুনিয়া মমতাদিদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে চেনে। কেবল চিট ফান্ড কেলেঙ্কারিতে যারা দোষী, তারা তাঁকে চেনে চিত্রকর হিসাবে! তারা কোটি কোটি টাকায় তাঁর ছবি কিনেছে।’’
রাজ্য বিজেপি সূত্র বলছে, রাজনাথের নীরবতার পরে অমিতের কাছে আর্জি জানানো হয়েছিল, তিনি যেন অন্তত সারদা নিয়ে মুখ খোলেন! অমিত কথা রেখেছেন। তার উপরে এ দিনই সারদা কেলেঙ্কারির অন্যতম তদন্তকারী, ত্রিপুরা ক্যাডারের আইপিএস অফিসার রাজীব সিংহকে বিশেষ রাষ্ট্রপতি পদক দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে নয়াদিল্লি। (খবর পৃঃ ৫) কেন্দ্রের তরফে এই পুরস্কারের সঙ্গে সারদা-যোগ বা রাজনীতির সম্পর্ক নেই বলে দাবি করা হলেও এহেন সমাপতনে উল্লসিত রাজ্য বিজেপি নেতারা। তাঁদের মতে, ভোট ময়দানে দলীয় কর্মীদের চাঙ্গা করার মতো কিছু অন্তত এ দিন পাওয়া গেল। তবে অমিতের বক্তৃতার ঝাঁঝ আগের থেকে অনেকটা কমে যাওয়ায় দিলীপ ঘোষ, রাহুল সিংহরা কিঞ্চিৎ ম্রিয়মাণও বটে। অমিত এ দিন নানা বিষয়ে মমতাকে আক্রমণ করে বিধানসভা ভোটে শাসক পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন বটে। কিন্তু লোকসভা ভোটের পরে ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর ধর্মতলার সমাবেশে তিনি যতটা আক্রমণাত্মক ছিলেন, এ দিন তার সিকিভাগও ছিলেন না বলে মানছেন রাজ্য বিজেপি নেতারাই। আগের দিন অমিত বলেছিলেন, ‘‘দিদি, ম্যায় হুঁ অমিত শাহ! পশ্চিমবঙ্গ থেকে তৃণমূল সরকারকে উৎখাত করতে দিল্লি থেকে এসেছি।’’ এ দিনও দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ আশা প্রকাশ করেছিলেন, ‘রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের ভূমি গুজরাতি সিংহের আওয়াজ’ শুনতে পাবে! কিন্তু যে আওয়াজ শোনা গিয়েছে, তা নেহাতই মৃদু! সভার ভিড় এবং মেজাজ, কোনওটাই ধর্মতলার সভার ধারে-কাছে যায়নি! রাজ্য নেতাদের অনুরোধে এবং রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় যতটুকু না বললে নয়, ততটাই বলেছেন অমিত।
বিধানসভা ভোটে দলকে লড়াইয়ে রাখতে চেয়ে এ দিনের সভা থেকে বন্ধ চা-বাগান, শিল্পহীনতা, অনুপ্রবেশের প্রশ্নে রাজ্য সরকারকে কটাক্ষ করেন অমিত। খাগড়াগড়-কাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে বলেছেন, ‘‘যেখানেই বোমা ফাটছে, সেখানেই তৃণমূল কর্মীদের যোগ পাওয়া যাচ্ছে! এটা কি সমাপতন মাত্র?’’ তাঁর অভিযোগ, ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির স্বার্থে রাজ্যকে দেশ-বিরোধী গতিবিধির কেন্দ্র বানানো হয়েছে। জাল নোট, বেআইনি অস্ত্র আগে পঞ্জাব, রাজস্থান দিয়ে ঢুকত। এখন প্রবেশদ্বার পশ্চিমবঙ্গ! ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি করতে গিয়ে পুলিশের মনোবল তলানিতে এনে ফেলা হয়েছে। অমিতের প্রশ্ন, ‘‘মমতাদিদি, আপনি কি গোটা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী না কেবল দুষ্কৃতীদের মুখ্যমন্ত্রী?’’ তৃণমূল ‘পরিবর্তনে’র ডাক দিয়ে রাজ্যকে পতনের দিকে নিয়ে গিয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি!
যে আক্রমণের উত্তরে তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘অমিত শাহ তো বাংলার ইতিহাস-ভূগোল কিছুই জানেন না! এখানে ৩৪ বছরের অপশাসনের অবসান ঘটাতে কত আত্মত্যাগ, কত লড়াই হয়েছে, উনি তার কী জানেন? লোকসভা ভোটের পর থেকে ওঁর দলের পতন চলছে! আর উনি এখানে পতন দেখছেন?’’ বেআইনি অস্ত্র ও জঙ্গি অনুপ্রবেশ নিয়ে অমিতের খোঁচার উত্তরে পার্থবাবুর পাল্টা প্রশ্ন, ‘‘সীমান্ত পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব কার? পঠানকোটের ঘটনা কোন সরকারের দুর্বলতা দেখিয়েছে?’’ সিপিএমের পলিটব্যুরো সদস্য মহম্মদ সেলিমের দাবি, বিজেপি-তৃণমূল যা করছে, সবই ‘সেটিং তত্ত্ব’ মেনে! তাঁর মন্তব্য, ‘‘সিবিআই যদি এত দিনে সারদার সুবিধাভোগীদের মাথাদের ধরতে এগোত, অমিতকে এখানে এসে শুধু প্রশ্ন করতে হতো না!’’