উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়া ১ বিডিও অফিসে বৃহস্পতিবার এসআইআরের শুনানিতে এলেন ৮৪ বছরের অসুস্থ গীতা চন্দ্র। ছবি: সুজিত দুয়ারি।
নামের বানান ভুল। সে জন্য এক বার শুনানির লাইনে দাঁড়িয়ে নথি দিয়েছেন। রাজ্যের এসআইআর শুনানির লাইনে বৃহস্পতিবারেও ছিলেন নবাব আলি। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়-২ ব্লকের বছর পঁয়ষট্টির এই বৃদ্ধের ক্ষোভ, “এক বার শুনানিতে প্রয়োজনীয় সমস্ত নথি জমা দিয়েছি। ফের শুনানিতে ডাকা হয়েছে। কী করব!”
খসড়া ভোটার তালিকায় নাম ওঠেনি। নিজের নামে থাকা জমিজমা সংক্রান্ত কাগজপত্র শুনানিতে জমা দিয়েছেন, দাবি বাঁকুড়ার রাজগ্রামের বৃদ্ধা বুলারানি দত্তের। তাঁর দুশ্চিন্তা, “আমার যে শুনানি হয়েছে এবং সেখানে কী নথি জমা দিয়েছি, অফিসারেরা লিখে দেননি। যদি চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম না থাকে, তখন কী করব!”
যত দিন গড়াচ্ছে, এমন চিন্তা বাড়ছে। কারণ, শুনানিতে নথি জমা দিলেও, তার প্রমাণ তো মিলছে না।
হুগলির মহকুমাশাসকের (আরামবাগ) কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার শুনানিতে ডাক পেয়েছিলেন শহরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সুজলপুরের শেখ ইয়াসিন আলি। বলেন, “যে নথি জমা দিয়েছি, তার প্রমাণপত্রও চাইলাম। বলা হল, ‘নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ নেই’। নথি জমা দেওয়ার প্রমাণ কিছু রইল না।”
পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের বাসিন্দা সুরেন টুডুর দাবি, “কোন নথিতে কাজ হবে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ সংশয়ে। কমিশনকে বিশ্বাস করাই কঠিন। তাই মানুষের জন্য ‘রিসিভ্ড কপি’ জরুরি।”
রাজ্যের কিছু জেলায় বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা, শুনানির নোটিসে লিখে দেওয়া হচ্ছে, ‘উপস্থিত’ (অ্যাটেন্ডেড)। কিছু জেলায় সে পাট নেই। কমিশন সূত্রের দাবি, কোন কোন নথি মান্যতা পাবে, তার বিশদ তালিকা জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো রয়েছে। কেউ শুনানিতে উপস্থিত থাকলে, তাঁর ছবি এবং নথি কমিশনের পোর্টালে নথিবদ্ধ এবং ‘আপলোড’ হচ্ছে।
কিন্তু সে আশ্বাসে ভরসা রাখতে পারছেন না অনেকে। মুর্শিদাবাদের ডোমকলের সরিফুল ইসলামরা চার ভাই। সরিফুলকে শুনানির নোটিস পাঠিয়ে বলা হয়েছে— “আপনার বাবাকে অন্য ছ’জনও বাবা হিসেবে দাবি করেছেন।” এ দিন ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় বাবার নাম থাকার প্রামাণ্য নথি এবং নিজের আধার, ভোটার, প্যান কার্ড নিয়ে শুনানিতে যান সরিফুল। সব জমা দেন। সরিফুলের ক্ষোভ, “আমাকে নথি জমা দেওয়ার প্রমাণ দেওয়া হল না। শুনানি কেন্দ্রেও কোনও খাতায় সই করিনি। কাল যদি বলে, শুনানিতে যাইনি, নথি দিইনি, কী করব!”
এ প্রসঙ্গে মুর্শিদাবাদের জেলাশাসক নীতিন সিংহানিয়ার বক্তব্য, “শুনানিতে আসা ভোটারদের নথিপত্রের রিসিভ্ড কপি দেওয়ার নির্দেশ নির্বাচন কমিশনের নেই। হাজিরাতে সই করানোর নির্দেশও নেই। আমাদের কিছু করার নেই।”
মানুষের ক্ষোভ তাতে কমছে না। পশ্চিম বর্ধমানের কুলডিহা গ্রামের বছর বাষট্টির কল্লোল চট্টোপাধ্যায় জানান, নামের ভুলের জন্য শুনানিতে ডাক পড়েছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার পরে ভিতরে নথি নিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, “নথি জমা দেওয়ার প্রমাণ হাতে নেই। ভবিষ্যতে ফের ডাকলে কী করব, জানি না!” কোচবিহারের অভয়জ্যোতি দত্ত, মালদহের গৌরী রায়, বীরভূমের চম্পা মণ্ডলদের ভাবনা, “শুনেছি, অনেককে আবার শুনানিতে ডাকছে। ফের ডাকলে নথি জমা দেওয়ার কী প্রমাণ দেখাব?” অনেকেই বলছেন, সরকারি যে কোনও কাজে ‘রিসিভ্ড কপি’ মেলে। এ ক্ষেত্রে অন্যথা হচ্ছে কেন? কমিশন সূত্রের বক্তব্য, বিষয়টি তাদের কানে এসেছে। দেখা হচ্ছে।
সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, নথি জমা দিলে তার প্রমাণ চান। এ দিন একই প্রশ্ন তুললেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। নথির প্রাপ্তিস্বীকার এবং ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’র নামে ভোটারের হেনস্থা বন্ধের দাবি লিখিত ভাবে সিইও-কে জানিয়েছে তৃণমূল। একই দাবিতে চিঠি দিয়েছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম।
বীরভূমের এক বিএলও বলছেন, “শুনানিতে ডাক পাওয়া ভোটারের এনুমারেশন ফর্মও আমাদের থেকে নিয়ে নেওয়া হচ্ছে। যা কিছু থাকছে, একতরফা ভাবে প্রশাসনের কাছেই। সমস্যা হলে কী হবে, জানা নেই।”
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে