ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় বুদ্ধ। ছবি: অমিত করমহাপাত্র
প্রায় দেড় হাজার বছর আগের কথা। তাম্রলিপ্ত বন্দরকে কেন্দ্র করে বিশাল একটি এলাকা জুড়ে প্রভাব বাড়ছে বৌদ্ধ সংস্কৃতির। দাঁতনে তৈরি হয়েছে বিরাট প্রতিষ্ঠানও। হঠাৎই অন্য একটি সংস্কৃতির প্রতাপের আঁচ এসে পড়ল। অথবা ডাকাতের ভয়, বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কাও ছিল। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, শিক্ষকেরা ভাবলেন, বিহার আক্রান্ত হতে পারে। বিহারের মধ্যে একটি ঘরের মেঝে খুঁড়ে গর্ত করে তার মধ্যে রেখে দিলেন বৌদ্ধ দেবদেবীদের ধাতুর তৈরি প্রায় পঞ্চাশটি মূর্তি। মাটি দিয়ে বুজিয়ে দিলেন গর্ত।
সেই মাটি খুঁড়ে রবিবার পশ্চিম মেদিনীপুরের মোগলমারির বৌদ্ধ বিহার থেকে ওই মূর্তিগুলি পুরাতত্ত্ববিদ প্রকাশচন্দ্র মাইতির নেতৃত্বে উদ্ধার করল রাজ্য পুরাতত্ত্ব দফতর। অনুমান করা হয়, খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতক থেকেই এই বিহারটির অস্তিত্ব ছিল। কয়েক’শো বছর ধরে আস্তে আস্তে তার প্রভাব বাড়ে। তখন প্রাথমিক কাঠামোর উপরে তৈরি হতে থাকে নতুন নতুন ঘর, চৈত্য, স্তূপ, প্রার্থনাগৃহ। তৈরি হয় মঠের ভিতরের বাঁধানো পথ, অলঙ্কৃত প্রাচীর। পুরাতত্ত্ববিদেরা স্থাপত্যের ইট, গড়ন, শৈলী ও মাটির কতটা নীচে থেকে সে সব পাওয়া যাচ্ছে, তা দেখে বুঝতে পারেন একই প্রত্নস্থলের কোন অংশ কখন নির্মিত। প্রকাশবাবুর মতে, যে ঘরের মেঝে থেকে এই গর্তটি পাওয়া গিয়েছে, তা পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকে তৈরি। গর্তটি প্রায় দেড় মিটার চওড়া। ৩০ সেন্টিমিটার গভীর। তবে দেড় হাজার বছর ধরে তার উপরেও নতুন করে নির্মাণ হয়েছে। পরে এই বিহারটি পরিত্যক্তও হয়ে পড়ে। তখন তার উপরেও মাটি জমতে থাকে। তাই এখন মাটির উপরের স্তর থেকে এই গর্তটি ১৬০ সেন্টিমিটার নীচে।
বৌদ্ধ স্থাপত্যটির প্রায় কেন্দ্রস্থলেই রয়েছে ঘরটি। বেশ কয়েকদিন ধরেই এখানে উৎখনন চলছিল। এ দিন খনন শুরু হওয়ার পরেই বোঝা যায়, ধাতুর তৈরি মূর্তি রয়েছে মাটির নীচে। পুরাতত্ত্ববিদেরা উৎসাহী হয়ে পড়েন। পাতলা ছুরি দিয়ে খুব যত্নের সঙ্গে অল্প অল্প করে মাটি কেটে আস্তে আস্তে তাঁরা বার করে আনতে থাকেন মূর্তিগুলো। মূর্তিগুলি অটুট থাকলেও মরচে পড়ে গিয়েছে। প্রকাশবাবু জানান, সবুজাভ আস্তরণ পড়েছে মূর্তিগুলির উপরে, তা থেকে বোঝা যাচ্ছে এগুলি ব্রোঞ্জের তৈরি। এ বার এগুলির মাটি সরিয়ে লবণমুক্ত জলে ধুয়ে পরিষ্কার করতে হবে। তখনই মূর্তিগুলির রূপ পুরোপুরি বোঝা যাবে।
এখানে ৪৩ সেন্টিমিটার লম্বা একটি অবলোকিতেশ্বরের মূর্তি পাওয়া গিয়েছে। যা চওড়া ১৪ সেন্টিমিটার। অন্যগুলি ৭ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা। তার কোনওটি হারীতী, কোনওটি তারা, কোনওটি সরস্বতী বলে পুরাতত্ত্ববিদদের অনুমান। প্রকাশবাবুর বক্তব্য, ‘‘এই মূর্তিগুলি সামনে রেখে ধ্যান করা হত।’’ পাওয়া গিয়েছে পবিত্র জল ছিটানোর কমণ্ডলুও।
মূর্তিগুলি থেকে বোঝা যাচ্ছে, মোগলমারির প্রত্নস্থলটি মহাযান বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠান ছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের স্বাতী রায় জানান, মহাযান মতে সময়কে বিভিন্ন কল্পে ভাগ করা হয়েছে। শাক্যসিংহ গৌতম বুদ্ধ চলে যাওয়ার পরে ভবিষ্যৎ বুদ্ধ মৈত্রেয়র আবির্ভাবের মধ্যের চার হাজার বছর সময়কালকে ভদ্রকল্প বলা হয়। এখন সেই ভদ্রকল্প চলছে। তাঁর কথায়, ‘‘ভদ্রকল্পের প্রধান দেবতা হলেন অবলোকিতেশ্বর। তাঁকে সংঘরত্ন বলা হয়। ফলে তাঁর মূর্তি মহাযান বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানে অনিবার্য।’’ পাওয়া গিয়েছে ভূমি স্পর্শ করা বুদ্ধের মূর্তিও।
গান্ধার শিল্পে অবলোকিতেশ্বরকে যেমন পাওয়া যায়, তেমনই পাওয়া যায় শিশুদের রক্ষাকারী দেবী হারীতীকেও। হারীতী যক্ষীণী। কুবেরের স্ত্রী তাই
তিনি সম্পদেরও দেবী। এ ছাড়া, তারা-ও বজ্রযানের বিশিষ্ট দেবী। স্বাতীদেবী বলেন, ‘‘তারাকে বোধিসত্ত্বের নারী রূপ হিসেবে ধরা হয়। তিনি বিপদ থেকে রক্ষা করেন।’’ সরস্বতীও বিভিন্ন বৌদ্ধ প্রত্নস্থলে পাওয়া গিয়েছে। স্বাতীদেবী বলেন, ‘‘জ্ঞানের দেবী হিসেবেই বৌদ্ধরা সরস্বতীর অর্চনা করতেন।’’
ব্রোঞ্জের এমন মূর্তি সম্ভার আগেও পাওয়া গিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব ভারতের নানা বৌদ্ধ প্রত্নস্থল থেকে। পুরুলিয়ার গজপুরেও এমনই এক সঙ্গে জৈন দেবদেবীদের অনেকগুলি মূর্তি পাওয়া গিয়েছিল। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের রূপেন্দ্রকুমার চট্টোপাধ্যায় জানান, তেলকুপিতে যখন শৈব ধর্মের প্রসার হচ্ছে, তখন জৈনরা তাঁদের মূর্তিগুলি এই ভাবেই সরিয়ে ফেলেছিলেন বলে অনুমান করা যেতে পারে।
কিন্তু মোগলমারিতে মূর্তিগুলি কেন লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল? রূপেন্দ্রকুমারবাবু বলেন, ‘‘ষষ্ঠ শতকে দণ্ডভুক্তি অঞ্চলে শশাঙ্কের প্রভাব ছিল। তারপরে তিনি ওড়িশা অভিযান করেন। তাঁর প্রচণ্ড দাপট ছিল। তাঁর ভয়েই এই বৌদ্ধ বিহারের মঠাধ্যক্ষেরা মূর্তিগুলি লুকিয়ে ফেলতে পারেন, এমন অনুমান অসঙ্গত নয়।’’ এই এলাকায় শৈবদের দাপটও সে সময় কিছু কম ছিল না। তিনি জানান, ডাকাতি বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আতঙ্কও কম ছিল না। কিন্তু বিপদ কেটে গেলে মূর্তিগুলি যে লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তা হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন মঠবাসীরা। সাধারণত খুব গোপনে এই সব কাজ করা হত। তাই কম লোক জানতেন। তাঁরা মারা গেলে বা অন্যত্র চলে গেলে লুকিয়ে রাখা জিনিসের খোঁজ মেলা শক্ত ছিল।
রূপেন্দ্রকুমারবাবু বক্তব্য, ‘‘তবে এই মূর্তিগুলো পাওয়া যাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, দক্ষিণ-পূর্ব ভারতে ওই সময়ে বৌদ্ধ সংস্কৃতির যে জোয়ার এসেছিল, দাঁতনের মোগলমারির এই প্রতিষ্ঠানটি তারই অঙ্গ।’’