দেদার ভাড়া বাড়িয়ে বোনাস উসুল অটোর

মা দুগ্গার আসতে এখনও বাকি দিন কুড়ি। তাতে কী! অটোর পুজো শুরু হয়ে গিয়েছে। কারণ, তাদের দাদাগিরির তো দিনক্ষণ লাগে না। সেটা সারা বছরের। ইচ্ছে হলেই ভাড়া বাড়ানো যায়। পুজোর মতো উৎসব এলে তো আরওই যায়। তাই অটোর দুগ্গা আগেই হাজির। তাই বাড়ছে ভাড়া। নাম তার ‘পুজো-বোনাস’।

Advertisement

অত্রি মিত্র

শেষ আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৩:৫১
Share:

ভাড়া নিয়ে বচসা। পার্ক সার্কাসে। — নিজস্ব চিত্র

মা দুগ্গার আসতে এখনও বাকি দিন কুড়ি। তাতে কী! অটোর পুজো শুরু হয়ে গিয়েছে। কারণ, তাদের দাদাগিরির তো দিনক্ষণ লাগে না। সেটা সারা বছরের। ইচ্ছে হলেই ভাড়া বাড়ানো যায়। পুজোর মতো উৎসব এলে তো আরওই যায়। তাই অটোর দুগ্গা আগেই হাজির। তাই বাড়ছে ভাড়া। নাম তার ‘পুজো-বোনাস’।

Advertisement

বোনাসের পরিমাণটা কত?

বোনাস তো এককালীন নয়। প্রতি ট্রিপেই। কোথাও পাঁচ টাকার বেশি ভাড়া হলেই তা এক লাফে হয়ে যাচ্ছে আট থেকে দশ টাকা পর্যন্ত। আর তার বেশি ভাড়া হলে ১৫ টাকা। তার উপরে বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। ১০-১৫ টাকার দূরত্বে যেতে ২০ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের। বোনাসের মহিমা!

Advertisement

সরকারি ক্ষেত্রে সরকার এবং বেসরকারি ক্ষেত্রে সংস্থার মালিক উৎসবে বোনাস বা অগ্রিম দিয়ে থাকেন। বিধিবদ্ধ নিয়ম আছে তার। অটোদাদারা স্বয়ম্ভু। নিয়মবিধির ধার ধারেন না তাঁরা। কিন্তু বোনাস চান বিলক্ষণ। তাই ইচ্ছেমতো বৃদ্ধি।

উত্তর কলকাতা হোক বা দক্ষিণ— এ ব্যাপারে পিছিয়ে নেই কেউই। অটোচালকদের একাংশই জানাচ্ছেন, উল্টোডাঙা থেকে আহিরীটোলা লঞ্চঘাট, শোভাবাজার বা জোড়াবাগান পাওয়ার হাউস, অথবা বি কে পাল অ্যাভিনিউ থেকে মহাত্মী গাঁধী রোড কিংবা গণেশ টকিজ থেকে ফুলবাগান— সর্বত্র অটোর দাবি একই রকম। দক্ষিণে রাসবিহারী থেকে তারাতলা বা বেহালার অটোতেও সন্ধে হলেই যাত্রীদের উপরে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বাড়তি ভাড়ার ভার। জিজ্ঞেস করলে অটোচালকের এক গাল হাসি। বাঁকা কথার তির ছুড়ে বলছেন, ‘‘খুচরোর সমস্যা তো! তাই দশ, পনেরো বা কুড়ি টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে!!’’

হুটহাট ভাড়া বৃদ্ধি, রুট ভেঙে একাধিক ধাপে বেশি ভাড়া আদায়— সবই অটোদাদাদের সামগ্রিক দাদাগিরির অঙ্গ বলে জানাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। গত শুক্র ও শনিবার পরপর কয়েকটি অটোচালকের দাদাগিরি সামনে এসেছে। শুক্রবার গৌরীবাড়ি মোড়ে সিগন্যাল ভেঙে দৌড়তে গিয়ে একটি বাসের সঙ্গে অটোর সংঘর্ষে মৃত্যু হয় কলেজছাত্রী পূজা পালের। ওই দিন দুপুরেই খাদ্য ভবনের গেট আটকে দাঁড়িয়ে থাকা অটোচালকেরা তর্ক জুড়ে দেন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের সঙ্গে। মন্ত্রীর এক রক্ষীকে ধাক্কাও মারেন অটোচালক। শনিবার ওই একই জায়গায় এক হোমগার্ডকে রাস্তায় ফেলে মারধরের অভিযোগ উঠেছে অটোচালকদের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ দাদাগিরি পুজোর বোনাস আদায়।

এ বঙ্গে অটোরিকশার আগমনের সময় থেকেই তার ভাড়ার উপরে সরকারের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। বিগত বাম জমানা হোক বা বর্তমানের তৃণমূল আমল, রুট অনুযায়ী ভাড়া ঠিক করে দেন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের কর্তাব্যক্তিরা। ইচ্ছে হলে তাঁরা কোনও একটি দূরত্বের ভাড়া কমিয়ে দেন। পরের বার ভাড়া সংশোধনের সময়ে ইচ্ছে হলে দেন বাড়িয়েও। তাঁরা ইচ্ছেধারী শ্রমিকদেবতা! পুরোটাই তাঁদের ইচ্ছের উপরে নির্ভরশীল। প্রশাসনের কিছু বলার নেই।

অটো চালু হওয়ার পরে বছর কুড়ির বাম আমল হোক বা ছ’বছরের তৃণমূল— এটাই দস্তুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে ঘোষণা করেছিলেন, সরকারের অনুমতি না-নিয়ে কোনও অটো ইউনিয়নই যাতে ভাড়া না-বাড়ায়, সেটা তাঁরা দেখবেন। কিন্তু সেই ঘোষণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভাড়া বাড়ানোর ‘সংস্কৃতি’ দিব্য চলছে। এই যেমন মাসখানেক আগেই যাদবপুর থেকে সন্তোষপুর, মুকুন্দপুর এবং গড়িয়া স্টেশনগামী সমস্ত অটো রুটেই এক টাকা করে ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে রাতারাতি। বাড়ানো হয়েছে বালিগঞ্জ থেকে আলিপুর-গোপালনগর রুটের ভাড়াও। কলকাতার পরিবহণ দফতরের তাবড় কর্তাদের নাকি তা জানাই নেই! যথেচ্ছ পুজোর বোনাসও যে চলছে, তা-ও জানেন না অধিকাংশ কর্তা।

অটো ইউনিয়নের নেতাদের এই ইচ্ছে-ভাড়ার দাপট কেন?

‘‘আমাদের বোনাস হলে তার ভাগ তো নেতারাও পান। তাই অভিযোগ যতই উঠুক, তাঁরা চুপচাপ,’’ দাপটের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন অটোচালকেরা।

এই নিয়ে দায় চাপানোর তরজায় মেতেছেন দুই জমানার শ্রমিক-নেতারা। সিটু নেতাদের বক্তব্য, বাম আমলে মহালয়া থেকে পুজো পর্যন্ত ভাড়া বেশি নেওয়া হতো। কিন্তু সেটা এক টাকার বেশি কখনওই নয়। ‘‘এখন তো অটোর উপরে কারও কোনও নিয়ন্ত্রণই নেই। লাগামছাড়া ভাড়া নেওয়া হচ্ছে,’’ পরিমাণের কমবেশির খতিয়ান দিয়ে শাসক শিবিরের দিকে আঙুল তুলছেন সিটু নেতা অজিত চৌধুরী। ব্যাধিটা যে তাঁরা আগের জমানা থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন, সেই ব্যাখ্যা দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন শাসক শিবিরের অনেক শ্রমিক-নেতা। আইএনটিটিইউসি-র নেতা মেঘনাথ পোদ্দার বলেন, ‘‘বাম আমলের এই রোগ এখনও চলছে। এটা অনভিপ্রেত। আমরা একেবারেই এর পক্ষপাতী নই। ২৫ সেপ্টেম্বর যে-সভা ডাকা হযেছে, সেখানে স্পষ্ট ভাবেই এই বার্তা দেওয়া হবে।’’

কী বলছে শাসক শিবির?

অটো ইচ্ছেমতো ভাড়া নিক, এটা সরকার মোটেই চায় না বলে জানিয়ে দিয়েছেন পরিবহণমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, ‘‘সরকার কোথাও কোনও রকম ভাড়া বৃদ্ধি অনুমোদন করে না। এ-সব বরদাস্ত করব না। তবে যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে। তাঁরা পরিবহণ দফতরের অফিস, পুলিশ বা আমাদের ই-মেল, হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগ জানালে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যবস্থা নেব। কথা দিচ্ছি।’’ মন্ত্রী জানান, তিনি এখন উত্তরবঙ্গে রয়েছেন। মঙ্গলবার ফিরেই আলিপুর, বারাসত, বিধাননগর, বেলতলা ও কসবার পরিবহণ দফতরের কর্তাদের নিয়ে কলকাতা, বিধাননগর, ব্যারাকপুর এবং দুই ২৪ পরগনার জেলা পুলিশকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে অটোকে শৃঙ্খলায় বাঁধার ‘রোডম্যাপ’ তৈরি করবেন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement