WB Elections 2026

কাঁটা বেঁধে কিনা, চিন্তা দুই মন্ত্রীর কেন্দ্রে

সমুদ্রগড়ের নিমতলা মাঠে কয়েক জন কর্মীকে নিয়ে বসেছিলেন আর এক প্রবীণ নেতা। খানিক আগেই সেখানে সভা সেরে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হেলিকপ্টারে উড়ে গিয়েছেন।

কেদারনাথ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৪
Share:

(বাঁ দিকে) স্বপন দেবনাথ এবং সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী (ডান দিকে)। নিজস্ব চিত্র ।

পরনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি। মাথা নিচু করে হাঁটার ফাঁকেই রাস্তার পাশে দাঁড়ানো সমর্থকদের দিকে হাত নাড়ছিলেন নেতা। ফল কী হবে? হেসে জবাব দিলেন, ‘‘পঞ্চাশ হাজার ভোটে জিতব।’’ এক বছর ধরে যে গোষ্ঠী-দ্বন্দ্ব চলছে, তা কাঁটা হবে না? থমকালেন পূর্ব বর্ধমানের মন্তেশ্বরের তৃণমূল প্রার্থী তথা রাজ্যের মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী। হাসি মুছে গেল। বললেন, ‘‘কিছু লোক সিঁধ কাটার চেষ্টা করছেন। দল তাঁদের ছাড়বে না। ভোটের পরে শাস্তি হবে।’’

সমুদ্রগড়ের নিমতলা মাঠে কয়েক জন কর্মীকে নিয়ে বসেছিলেন আর এক প্রবীণ নেতা। খানিক আগেই সেখানে সভা সেরে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হেলিকপ্টারে উড়ে গিয়েছেন। সেখানে বসেই কর্মীদের বোঝাচ্ছিলেন, প্রচারে যেন কোনও বাড়ি বাদ না যায়। জয় নিয়ে কি সংশয় রয়েছে? পূর্বস্থলী দক্ষিণের চার বারের বিধায়ক তথা রাজ্যের আর এক মন্ত্রী স্বপন দেবনাথের জবাব, ‘‘অনায়াসে জিতব।’’ তবে মন্ত্রীর আড়ালে অনুগামীদের একাংশ যদিও মানছেন, ‘‘অনায়াস হবে না।’’

পূর্ব বর্ধমানের কালনা মহকুমার চার বিধানসভার মধ্যে দু’টিতে এ বারও তৃণমূলের প্রার্থী রাজ্যের দুই মন্ত্রী। মন্তেশ্বরে গত বার সিদ্দিকুল্লা জেতেন প্রায় ৩২ হাজার ভোটে। কে টিকিট পাবেন, তা নিয়ে সম্প্রতি মন্তেশ্বর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি আহমেদ হোসেনের সঙ্গে সিদ্দিকুল্লার অনুগামীদের দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছয়। মন্ত্রীর গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। সিদ্দিকুল্লা টিকিট পাওয়ায়, দলের একাংশ এখনও ‘নিষ্ক্রিয়’। তার উপরে, এসআইআরে ‘বিবেচনাধীন’ থাকা প্রায় ২৩ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। সিদ্দিকুল্লা যদিও বলছেন, ‘‘দলের কিছু লোকের জন্য মানুষের দমবন্ধ হচ্ছিল। তাঁরা এ বার না থাকায়, মানুষ আমার সঙ্গে বেরোচ্ছেন। গত বারের ব্যবধান ছাপিয়ে যাবে।’’

এই কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী সৈকত পাঁজার বাবা সজল পাঁজা ছিলেন মন্তেশ্বরের প্রথম তৃণমূল বিধায়ক। তাঁর মৃত্যুর পরে তৃণমূলের বিধায়ক হন সৈকতও। পরে বিজেপিতে যোগ দেন। তৃণমূলকে তাঁর কটাক্ষ, ‘‘ওদের কোন্দলে কষ্টে আছেন সাধারণ মানুষ। এ বার পদ্ম ফুটবে।’’স্বপনের কেন্দ্রে এ বার বামেরা সমর্থন করছে সিপিআইএমএল প্রার্থীকে। বিজেপি অনেক দেরিতে তাদের প্রার্থী প্রাণকৃষ্ণ তফাদারের নাম ঘোষণা করেছে। এলাকার এক পুরনো তৃণমূল নেতা বলছিলেন, ‘‘গত বার জয়ের ব্যবধান ছিল প্রায় ১৭ হাজার। এসআইআরে ‘বিবেচনাধীন’ থাকা প্রায় বারো হাজার নাম বাদ পড়েছে। তাই আপাতদৃষ্টিতে সহজ লড়াই মনে হলেও, তা নয়।’’ স্বপনের যদিও দাবি, ‘‘নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির চক্রান্তে এত মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই ক্ষোভেই মানুষ আমাদের জেতাবেন।’’ স্বপনের এলাকার বড় অংশে বাস তাঁতশিল্পীদের। সেখানকার তাঁতের সুনাম ছিল দেশ জোড়া। এখন সেই শিল্প ধুঁকছে। অনেক শিল্পী পরিযায়ী শ্রমিকের কাজে গিয়েছেন ভিন্‌ রাজ্যে। সমুদ্রগড়ের তাঁতশিল্পী সুমন্ত বসাকের কথায়, ‘‘তাঁত বুনে আর পেট চলে না। ট্রেনে হকারি করি। সরকার আমাদের কথা ভাবল কোথায়?’’ স্বপন অবশ্য বলছেন, ‘‘এলাকায় তাঁতের হাট করা হয়েছে। পুজোর আগে তাঁতিদের তৈরি শাড়ি তন্তুজকে বিক্রির ব্যবস্থাও করা হয়।’’

তৃণমূলকে ভাবতে হচ্ছে স্বপনের পাশের কেন্দ্র পূর্বস্থলী উত্তর নিয়েও। সেখানে বিদায়ী বিধায়ক তপন চট্টোপাধ্যায়কে সরিয়ে তারা প্রার্থী করেছে বাম জমানার মন্ত্রী ক্ষিতি গোস্বামীর কন্যা বসুন্ধরা গোস্বামীকে। তার পরেই দলকে তোপ দেগে ‘নিষ্ক্রিয়’ রয়েছেন তপন। প্রচারে নেমে বসুন্ধরা কখনও হেঁটে, কখনও স্কুটারে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরছেন। কিন্তু গত বার মাত্র সাড়ে ছ’হাজার ভোটের ব্যবধানে জেতা আসন ধরে রাখা যাবে কিনা, চিন্তায় তৃণমূল।

এই কেন্দ্রের ঝাউডাঙা, তামাঘাটা, পাটুলি-সহ বেশ কিছু এলাকা ভাগীরথীর ভাঙনে বিপর্যস্ত। অনেক চাষের জমি চলে গিয়েছে নদীগর্ভে। ঝাউডাঙায় নদীর অদূরে পাকা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পূর্ণিমা ঘোষ বলছিলেন, ‘‘ভাঙনের সমস্যা নতুন নয়। নদী ক্রমশ এগিয়ে আসছে। বাড়িটা থাকবে কিনা, জানি না। মাঝেমধ্যে ভাঙন রোধে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা বেশি দিন টেকে না। স্থায়ী বন্দোবস্ত কবে হবে?’’ বিজেপির প্রার্থী তথা দলের প্রাক্তন জেলা সভাপতি গোপাল চট্টোপাধ্যায়ের দাবি, ‘‘আমাদের সরকার এলে, স্থায়ী ব্যবস্থা হবে।’’ সিপিএমের প্রার্থী প্রদীপ সাহা স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক। তিনি আবার বলছেন, ‘‘তৃণমূল-বিজেপি, দু’দলের উপরেই মানুষ ক্ষুব্ধ। প্রচারে ভাল সাড়া পাচ্ছি।’’

কালনায় ২০২১-এ তৃণমূল প্রার্থী দেবপ্রসাদ বাগ জিতেছিলেন মাত্র সাড়ে সাত হাজার ভোটে। এ বারও প্রার্থী তিনি। গত লোকসভা ভোটে কালনা শহরের ১৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১২টিতে বিজেপির এগিয়ে থাকা চিন্তায় রাখছে তৃণমূলকে। তবে বিজেপি প্রার্থী সিদ্ধার্থ মজুমদারকে ‘বহিরাগত’ দাবি করে তাঁর দলের একাংশও ক্ষুব্ধ। দুই প্রার্থীর যদিও দাবি, তিনি-ই এগিয়ে।

কালনার বিস্তীর্ণ এলাকায় আলু ও সুখসাগর পেঁয়াজ চাষ হয়। দুই ফসলেই এ বার ভরাডুবি। মাঠ থেকে বস্তা প্রতি (৫০ কেজি) আলু বিক্রি হচ্ছে শ’দেড়েক টাকায়। সুখসাগর পেঁয়াজে যেখানে অন্য বছর চাষিরা কেজি প্রতি ১৫ টাকার আশপাশে দর পান, এ বার তা দাঁড়িয়েছে ৭ টাকায়। বাড়ির উঠোনে ডাঁই করে রাখা পেঁয়াজের বস্তা দেখিয়ে চাষি ফরজ শেখ বলেন, ‘‘কবে ভাল দাম পাব, সে অপেক্ষায় আছি। আমরা মোটেও সুখে নেই।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন