ফল ঘোষণার পরে মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ। নিজস্ব চিত্র।
বাবা হাড্ডাহাড্ডি লড়ে জিতেছিলেন। ছ’মাসের মধ্যে তাঁরই ছেলে জিতলেন বিরোধীদের একেবারে ধুয়েমুছে দিয়ে।
সঙ্গে জুটে গেল রাজ্যের সর্বকনিষ্ঠ বিধায়ক এবং রাজ্যে বিধায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবধানে জয়ীর তকমাও। সৈকত পাঁজার সঙ্গে রেকর্ড বুকে নাম তুলে ফেলল মন্তেশ্বরও! নিছক জয় নয়, এ বার শাসকদলের মূল লক্ষ্য ছিল ‘মার্জিন’ বা ব্যবধান বাড়ানো। সেই লক্ষ্যে তারা ষোলো আনার উপরে আঠারো আনা সফল।
ছোট থেকে অবশ্য মন্তেশ্বরের সঙ্গে তেমন কোনও যোগ ছিল না সৈকতের। তাঁর বাবা, প্রয়াত বিধায়ক সজল পাঁজা রাজনীতির সুবাদেই গত সাত বছর ধরে মন্তেশ্বরের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছিলেন। তার আগে মামুদপুর ২ পঞ্চায়েতের রাউতগ্রামে পৈতৃক ভিটা থাকলেও চাকরিসূত্রে হাওড়ার বালিতেই থাকতেন তিনি। দুই ছেলেকে নিয়ে স্ত্রী মালাদেবীও থাকতেন ওখানেই। তবে, এ বার বিধানসভা ভোটে জিতে বিধায়ক হওয়ার পর থেকে মন্তেশ্বরেই থাকতেন সজলবাবু।
সজলবাবুর অকাল মৃত্যুর পরে তৃণমূল টিকিট দেয় বড় ছেলে সৈকতকে। বাবার পরে ছেলে বিধায়ক হওয়ায় খুশির হাওয়া এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল শেখ বলেন, ‘‘বামেদের ঘাঁটিতে বিরোধীদের জয়ের খরা প্রথম কাটিয়েছিলেন সজলদা। বিধায়ক হয়েই অগ্নিনির্বাপক কেন্দ্র, কলেজ-সহ এলাকায় নানা উন্নয়নমূলক কাজ করা শুরু করেছিলেন। এ বার বাবার মতো ছেলেও মন্তেশ্বরের উন্নয়নে ঝাঁপিয়ে প়ড়বেন বলে আমাদের আশা।’’ আর এক বাসিন্দা গিয়াসউদ্দিন মল্লিকের কথায়, ‘‘সজলবাবুর জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছিল। রাজনীতিতে তেমন পোক্ত না হলেও সৈকত লক্ষাধিক ভোটে জিতেছেন।’’
মঙ্গলবার সাত সকালে কালনা কলেজের ভোটগণনা কেন্দ্রে পৌঁছন সৈকত। পরনে ছিল নীল জিনস ও সাদা জামা। জীবনের প্রথম বড় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তৃণমূল প্রার্থীকে বারবারই গণনা কেন্দ্রের বাইরে পায়চারি করতে দেখা যায়। সকাল থেকে গণনাকেন্দ্রের সামনে হাজির হয়েছিলেন প্রচুর তৃণমূল কর্মী-সমর্থক। পঞ্চম রাউন্ড শেষে ঘোষণা হল, বিপক্ষের সঙ্গে ব্যবধান ব্যবধান ৬০ হাজারেরও বেশি হয়ে গিয়েছে। তখন বেরিয়ে এসে কর্মীদের সঙ্গে আঙুলে ‘ভি’ দেখালেন। ষষ্ঠ রাউন্ড শেষে ব্যবধান ৬৫ হাজার ছাড়িয়ে যাবার পরেই দলীয় কর্মীরা সবুজ আবির মাখা শুরু করেন। বেলা একটা নাগাদ প্রশাসনের তরফে জয়ের শংসাপত্র দেওয়া হয় এই তরুণ বিধায়কের হাতে। এর পরে দলীয় নেতারা তাঁকে মালা পরিয়ে নিয়ে বাইরে আসতেই শুরু হয় জয়ের উল্লাস।
রেকর্ড ব্যবধানে জয় কি আশা করেছিলেন?
সৈকত বললেন, ‘‘বাবার মরদেহ মন্তেশ্বর থেকে নবদ্বীপ নিয়ে যাওয়ার সময় দেখেছিলাম, বাবার প্রতি সাধারণ মানুষের আবেগ। তখনই বুঝে যাই, জয় শুধু সময়ের অপেক্ষা। বাবার অসমাপ্ত কাজ শেষ করাই আমার প্রথম লক্ষ্য।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘এই কেন্দ্রে আমাকে টিকিট দেওয়ার জন্য আমি দলনেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি কৃতজ্ঞ।’’ কী ভাবে এগোবেন নিজের পরিকল্পনায়, জানতে চাওয়ায় সৈকত জানান, প্রচারে ঘোরার সময় বিভিন্ন এলাকার সমস্যার কথা তিনি নিজের নোটবুকে তুলে রেখেছেন। নোটবুক থেকে সমস্যাগুলি দেখে একে একে কাজ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন। তাঁর কথায়, ‘‘প্রথমে গুরুত্ব দেব, বাবার অসমাপ্ত কাজ শেষ করায়। তার পরই প্রাধান্য দেওয়া হবে জল এবং রাস্তার সমস্যা মেটানোর ব্যাপারে।’’ ছেলের বড় ব্যবধানে জয়ে খুশি মা মালা পাঁজা। ছোট ছেলের পরীক্ষার জন্য তিনি মন্তেশ্বরে না আসলেও কোন রাউন্ডে কী ফল হচ্ছে, তা বারবার ফোনে খোঁজ নিচ্ছিলেন। ছেলে রেকর্ড গড়েছেন শুনে মালাদেবীর প্রতিক্রিয়া, ‘‘আমাদের গোটা পরিবার মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ। বাবার মতো সৈকতও মন্তেশ্বরের মানুষের জন্য কাজ করবে।’’
প্রতিটি পঞ্চায়েত থেকে বড় ব্যবধানে লিড আসায় স্বস্তি শাসক-শিবিরে। জয়ের ব্যবধানের কথা জানতে পরে কালনায় চলে আসেন এই ভোটে এক-একটি পঞ্চায়েতের দায়িত্বে থাকা বর্ধমান দক্ষিণের বিধায়ক রবিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়, জেলা সভাধিপতি দেবু টুডু-সহ বেশ কয়েক জন জেলা নেতা। ভোট পরিকল্পনার মাথায় থাকা জেলা (গ্রামীণ) তৃণমূল সভাপতি তথা মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ তো কালনার রাস্তায় নেমে আনন্দে বাজনাও বাজিয়েছেন! ছ’মাস আগের ভোটে তৃণমূল সব থেকে বেশি ভোটে হেরেছিল কুসুমগ্রাম পঞ্চায়তে। ব্যবধান ছিল ১৭০০। এ বার এখানেই সব থেকে বেশি ব্যবধানে জয় এসেছে। সেই কুসুমগ্রামেই এ বার তৃণমূল লিড পেয়েছে ১২,৮৩২ ভোট! এই পঞ্চায়েতে দলের হয়ে ভোট প্রচারের দায়িত্বে ছিলেন জেলা সভাধিপতি। সন্ধ্যায় তিনি বলেন, ‘‘মানুষের বাড়ি বাড়ি গেছি। কিছু অভাব অভিযোগও আছে এলাকার মানুষের। মানুষ দু’হাত ভরে আমাদের ভোট দিয়েছেন। তাঁদের কৃতজ্ঞতা জানাতে ফের ওই এলাকায় যাব। চেষ্টা করব অভাবগুলিও দূর করতে।’’
সৈকতের এই বিপুল জয়ে জামানত জব্দ তিন বিরোধী প্রার্থীরই। সিপিএম অবশ্য এমন ফল প্রত্যাশিত ছিল বলেই জানিয়েছে। দলীয় প্রার্থী ওসমান গনি সরকারের অভিযোগ, ‘‘ভোটের আগের দিন থেকে চরম সন্ত্রাস করা হয়েছিল। ভোটের দিন বেলা দশটার মধ্যে আমাদের ২৪৬টি বুথে এজেন্টদের উঠিয়ে দেয় তৃণমূল। এর পর এ ছাড়া আর কী-ই বা ফল হতে পারে? তবে মন্তেশরের মানুষ এই সন্ত্রাস ভাল ভাবে নেননি। সেখানেই আমাদের নৈতিক জয় হয়েছে।’’ এ দিন গণনাকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে বিজেপি প্রার্থী বিশ্বজিৎ পোদ্দারকেও দৃশ্যতই হতাশ দেখিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ‘‘ফলাফলই বলে দিচ্ছে নির্বাচনে শাসক দল কেমন সন্ত্রাস করেছে। অবাধ নির্বাচন হলে অনেক ভোট পেতাম এ বার।’’
সন্ত্রাসের অভিযোগ উড়িয়েছে শাসকদল। জেলা সভাপতি স্বপনবাবু বলেন, ‘‘ওদের যারা এজেন্ট হত তারা তো এখন আমাদের দলে! হেরে যাবে বলেই আগে থেকে ওরা সন্ত্রাসের নাটক শুরু করে। আসলে এই কেন্দ্রে মানুষ উন্নয়নকে বেছে নিয়েছে।’’ তাঁর দাবি, ভাল ফলের পিছনে ভূমিকা রয়েছে দলীয় পর্যবেক্ষক অরূপ বিশ্বাসের। অরূপবাবুর মন্তব্য, ‘‘কেন্দ্র নোট নিয়ে যে ভুমিকা নিয়েছে তাতে ক্ষুব্ধ হয়েছে মানুষ। ভোট বাক্সে তারই প্রতিফলন হয়েছে।’’