খাবারের দোকানে কাজে ব্যস্ত কিশোর। আসানসোলে।—নিজস্ব চিত্র।
ধরা পড়লে কঠোর শাস্তির বিধান দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। মোটা টাকা জরিমানা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। শিশুশ্রম তবু রোখা যাচ্ছে না। এ নিয়ে নজরদারি চালানো ও প্রচারের দায়িত্বে রয়েছে শ্রম দফতর। কিন্তু রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটকের এলাকা আসানসোলেই নর্দমা পরিষ্কার থেকে খাবারের দোকানে বাসন ধোয়া— শিশু শ্রমিক চোখে প়ড়ে সর্বত্রই।
আসানসোল ও আশপাশের বিভিন্ন মোটরবাইকের গ্যারাজে গেলেই চোখে পড়ে, কালিঝুলি মেখে কাজ করছে জনা কয়েক নাবালক। নানা চায়ের দোকান, কাঠগোলা বা মাংসের দোকানেও দেখা মেলে এই বয়সের ছেলেদের। কোদাল হাতে নর্দমা পরিষ্কার, ঠেলা রিকশায় আবর্জনা চাপিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে লাগানো হয় শিশু শ্রমিকদের। পান থেকে চুন খসলেই জোটে ধমক। শ্রম দফতরের দাবি, শিশুদের দিয়ে কাজ করানো বন্ধ করতে অভিযান চালানো হচ্ছে। নিরন্তর প্রচারও করা হয়। তবে শিশুশ্রম যে বন্ধ করা যায়নি, এই শিল্পাঞ্চলের রাস্তায় বেরোলেই তা বোঝা যায়।
শ্রম দফতরের এক কর্তা জানান, আসানসোল ও আশপাশের এলাকার বেশির ভাগ শিশু শ্রমিক আসে মূলত বিহার ও ঝাড়খণ্ড থেকে। ঝাড়খণ্ডের মিহিজাম, জামতাড়ার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে গরিব পরিবারের শিশু-কিশোরদের এনে কম মজুরির বিনিময়ে কাজে লাগানো হয়। সম্প্রতি কুলটির একটি বেকারি থেকে চার জন শিশুশ্রমিক উদ্ধার করা হয়। তারা সকলেই ওই এলাকার। এ রাজ্যের হাওড়া, মুর্শিদাবাদ থেকেও অনেকে কাজ করতে আসে। আসানসোলে বহুতল নির্মাণে যুক্ত ঠিকাদার সংস্থাগুলি মূলত মিস্ত্রির সহায়কের কাজে লাগায় শিশুশ্রমিকদের। এমনই একটি বহুতল নির্মাণ সংস্থার কর্ণধারের এ বিষয়ে বক্তব্য, ‘‘ঠিকাদার কাকে কাজে লাগাবে সেটা তাঁর ব্যাপার। আমরা এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করি না।’’ মুর্শিদাবাদ থেকে আসা এমনই এক ঠিকাদার মহম্মদ এবাদুলের দাবি, ‘‘রোজগার ও কাজ শেখার আশায় বাড়ির লোকেরাই আমাদের কাছে ছোটদের পাঠিয়ে দেয়। তবে আমরা ওদের দিয়ে অনেক হাল্কা কাজ করাই।’’ আসানসোল বাজারের নানা খাবারের দোকানেও শিশুশ্রমিক দেখা যায়। বছর বারোর একটি ছেলে বলে, ‘‘অভাবের সংসারে সাহায্য করার জন্যই কাজে এসেছি।’’
আসানসোল-দুর্গাপুরের উপ-শ্রম কমিশনার পার্থপ্রতিম চক্রবর্তী জানান, গত ছ’মাসে শিল্পাঞ্চলের নানা এলাকা থেকে অন্তত ২০ জন শিশু শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের দিয়ে কাজ করানোর জন্য সাত জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। পার্থপ্রতিমবাবু দাবি করেন, ‘‘সম্পূর্ণ রোধ করা না গেলেও আগের তুলনায় শিশু শ্রমিক অনেক কমেছে। আমরা ধারাবাহিক অভিযান চালাচ্ছি।’’
শ্রমমন্ত্রী মলয়বাবু অবশ্য শিল্পাঞ্চলে শিশুশ্রমিকের বাড়বাড়ন্তের কথা মানতে চাননি। এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রথমে তিনি বলেন, ‘‘কোথায় শিশু শ্রমিক আছে জানি না তো। কেউ দেখেছে না কি?’’ তাঁর দফতরই অভিযান চালিয়ে গত কয়েক মাসে শিশুশ্রমিক উদ্ধার করেছে, এই তথ্যা জানার পরে মন্ত্রীর আশ্বাস, ‘‘শিশুশ্রম বন্ধে সরকার বিশেষ ব্যবস্থা নেবে। আসানসোল শিল্পাঞ্চলে একটি সচেতনতা শিবির করা হবে। এক জন বিচারককে এনে একটি আলোচনাচক্রেরও আয়োজন করা হবে।’’