দর পড়ে গিয়েছে ফুলকপির, অপমৃত্যু চাষির

ধান, আলুর পরে এ বার ফুলকপি। বর্ধমানের পূর্বস্থলীতে এক চাষির অপমৃত্যুর পরে ফুলকপির অতিফলন এবং দাম পড়ে যাওয়াকেই দায়ী করলেন পরিবারের লোকজন। পুলিশ জানায়, মৃত চাষির নাম জনার্দন বণিক (৩৮)। বাড়ি পূর্বস্থলী ১ ব্লকের সুলুন্টু গ্রামে। সোমবার রাত থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। মঙ্গলবার বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে ফুলকপি খেতের পাশে একটি পিটুলি গাছের ডালে তাঁর ঝুলন্ত দেহ মেলে।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৮ নভেম্বর ২০১৫ ০২:৩৯
Share:

ধান, আলুর পরে এ বার ফুলকপি।

Advertisement

বর্ধমানের পূর্বস্থলীতে এক চাষির অপমৃত্যুর পরে ফুলকপির অতিফলন এবং দাম পড়ে যাওয়াকেই দায়ী করলেন পরিবারের লোকজন।

পুলিশ জানায়, মৃত চাষির নাম জনার্দন বণিক (৩৮)। বাড়ি পূর্বস্থলী ১ ব্লকের সুলুন্টু গ্রামে। সোমবার রাত থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। মঙ্গলবার বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে ফুলকপি খেতের পাশে একটি পিটুলি গাছের ডালে তাঁর ঝুলন্ত দেহ মেলে। মৃতের পরিবারের দাবি, বাজারে তাঁর লক্ষাধিক টাকার ঋণ ছিল। ফুলকপি চাষ করে ভাল দামও মিলছিল না। মানসিক অবসাদেই আত্মঘাতী হয়েছেন জনার্দনবাবু।

Advertisement

মৃত চাষির পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, গত বছর দেড়েক ধরে ধান-সহ একের পর এক চাষে তিনি লাভ পাননি। দেনা হয়ে যায় বাজারে। লাভের আশায় এ বার প্রায় দশ বিঘা জমিতে ফুলকপি চাষ করেছিলেন। যার বেশির ভাগই বাৎসরিক চুক্তিতে নেওয়া অন্যের জমিতে। এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি মিটে যাওয়ার পরেই ফুলকপি চাষ শুরু করেছিলেন তিনি। সম্প্রতি জমি থেকে প্রচুর ফুলকপি উঠতে শুরু করে।

মৃতের ভাই নেপু বণিকের দাবি, জনার্দনবাবুর বেশির ভাগ জমি চুক্তিতে অন্যের কাছ থেকে নিয়ে ফুলকপি চাষ করেছিলেন। তাঁকে অন্যের সাবমার্সিবল পাম্প থেকে জল কিনতেও হয়েছিল ঘণ্টা প্রতি দেড়শো টাকায়। এক বিঘা জমিতে এক বার জল দিতে ঘণ্টা তিনেক সময় লাগে। চাষের অন্য খরচও বেড়ে গিয়েছে। অথচ পাইকারি বাজারে দু’-আড়াই টাকায় ফুলকপি বিক্রি করতে হচ্ছিল তাঁকে। দেনা শোধ না করতে পেরে মানসিক অবসাদেই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এলাকার বাসিন্দা দীনেশ দে-ও একই কথা জানান। মৃতের স্ত্রী অনুদেবীও জানান, ঋণের চাপে তাঁর স্বামী মনমরা থাকতেন।

Advertisement

জেলার সব্জি ভাণ্ডার হিসাবে পরিচিত পূর্বস্থলীতে কয়েক হাজার চাষি রবি মরসুমে কপি চাষ করেন। উৎপাদিত ফসল গাড়ি করে পাইকারি বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আড়তদারদের মাধ্যমে চাষিদের পণ্য কেনেন ফড়েরা। বাজারে চাহিদা থাকলে ভিন্ জেলার ফড়েদেরও দেখা যায়। জেলার কপি চাষিরা জানান, বিঘা প্রতি জমিতে হাজার তিনেক করে চারা পোঁতা হয়। পোকা ও নানা কারণে ১০ শতাংশ নষ্ট হয়। যে সমস্ত এলাকায় বিকল্প সেচ ভাল, সেখানে বিঘা প্রতি জমিতে খরচ হয় ১৬ হাজার টাকা। আর যে সমস্ত এলাকায় চাষিদের ব্যক্তি মালিকানাধীন সাব-মার্সিবল পাম্প থেকে জল কিনতে হয়, অন্যের জমি চুক্তিতে নিয়ে চাষ করতে হয় সেখানে খরচ হয় ২০ হাজার টাকারও বেশি।

চাষিদের দাবি, অগস্টে অতিবৃষ্টির মধ্যে চারা বাঁচিয়ে উঁচু জায়গায় চাষ করতে পারেছিলেন যাঁরা, শুরুতেই তাঁরা ভাল দামের মুখ দেখেছিলেন। কিন্তু বৃষ্টির পরে যাঁরা চাষ করেছেন, তাঁদের কপি সম্প্রতি জমি থেকে উঠতে শুরু করেছে। সে সব ফুলকপি ভাল দর দিয়ে কেনার ফড়ে মিলছে না। কালনা মহকুমার নিয়ন্ত্রিত বাজার সমিতি, চকবাজার, পারুলিয়া, নিভুজিবাজার, কালেখাঁতলার মতো পাইকারি বাজারগুলিতেও দেখা যায়, সকাল থেকে রাশি রাশি ফুলকপি নিয়ে আসছেন চাষিরা। সোমবার কার্তিক ও ছটপুজোর বাজারেও লাভ তেমন হয়নি বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।

কালনার নিয়ন্ত্রিত বাজারের আড়তদার সাইফুল শেখ জানান, খুব বড় ফুলকপি ওজনে প্রায় ২ কেজি, প্রতিটির পাইকারি বাজারদর ৫ টাকা। ছোট থেকে মাঝারি মাপের ফুলকপির দর দেড় থেকে তিন টাকা। সাউফুল শেখের দাবি, স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ফুলকপি নিয়ে তেমন উৎসাহী নন। বাইরের ফড়েরাও ফুলকপি কিনতে আসছেন না। সপ্তাহখানেক ধরে এমন চলছে। আর এক আড়তদার তারক বৈরাগ্যের কথায়, ‘‘বেশির ভাগ কপি বিক্রি করেছি প্রতিটি আড়াই টাকায়। এই টাকায় বিক্রি করে লাভ নেই। আমাদের কমিশনও কম।’’

এ দিন খোলাবাজারে অবশ্য কপি বিক্রি হয়েছে ৫ থেকে ১২ টাকা দরে। কালনা ২ ব্লকের কুলেদা এলাকার ফুলকপি চাষি মধু ঘোষ বলেন, ‘‘চাষিরা জমি থেকে কয়েক দিনে প্রচুর ফুলকপি তুলেছেন। তার বড় কারণ মেঘ। কারণ মেঘলা আকাশে ফুলকপি ফুটে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর ফোটা কপি ক্রেতারা নিতে চান না।’’

কালনার মহকুমাশাসক সব্যসাচী ঘোষ বলেন, ‘‘পূর্বস্থলী ১-এর বিডিও-র কাছ থেকে জানতে পেরেছি জনার্দনবাবু ৩-৪ বিঘে ভাগে চাষ করেছিলেন। ফলন ভাল হয়েছিল। তাঁর বাজারে কিছু ঋণ ছিল বলেও জানা গিয়েছে।’’ তবে সেই ঋণ চাষ সম্পর্কিত নয় বলে মহকুমাশাসক দাবি করেছেন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement