ফসলের দামের জন্য লক্ষ্মীপুজোয় প্রার্থনা

মাসখানেক আগের বন্যায় ভেসে গিয়েছিল গ্রাম দু’টির বিস্তীর্ণ এলাকার খেত। দাম মেলেনি ফসলেরও। এই পরিস্থিতিতে সংশয় ছিল ক্ষতি সামলে এ বার লক্ষ্মী আরাধনার জাঁক কতখানি বজায় রাখা যাবে।

Advertisement

কেদারনাথ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০১৫ ০০:৫৮
Share:

প্রকৃতির মাঝে পুজো।—নিজস্ব চিত্র।

মাসখানেক আগের বন্যায় ভেসে গিয়েছিল গ্রাম দু’টির বিস্তীর্ণ এলাকার খেত। দাম মেলেনি ফসলেরও। এই পরিস্থিতিতে সংশয় ছিল ক্ষতি সামলে এ বার লক্ষ্মী আরাধনার জাঁক কতখানি বজায় রাখা যাবে। তবে শেষমেশ গত বছরগুলির মতো এ বারেও লক্ষ্মীপুজোর জাঁকজমকে নজর কাড়ল কালনার হিজুলি ও ধর্মডাঙা গ্রাম। মণ্ডপের কারুকার্য আর আলোকসজ্জা দেখতে ভিড় জমালেন দর্শনার্থীরাও।

Advertisement

কালনার বিভিন্ন এলাকায় লক্ষ্মীপুজো হয় প্রধানত বাড়িতে। কিন্তু এই দু’টি গ্রামের পুজো সর্বজনীন। পুজো উপলক্ষে দিন চারেক ধরে চলে উৎসব। কল্যাণপুরের হিজুলি গ্রামে গিয়ে দেখা গেল উত্তরপাড়ায় তৈরি করা হয়েছে মণ্ডপ। গোটা মণ্ডপ চত্বর জুড়েই রয়েছে আলোকসজ্জা। এখান থেকে কয়েক পা আগালেই হিজুলি প্রাথমিক স্কুলের মাঠ। পুজো উপলক্ষে প্রতিবারই বিভিন্ন থিম সাজিয়ে রাখা হয় মাঠে। এ বার পৌরাণিক প্রেক্ষাপটে তৈরি প্রচলিত বাংলা ধারাবাহিকের আদলে সাজানো হয়েছে থিম। পুজোর মাস তিনেক আগে থেকে গ্রামের যুবকেরাই ধারাবাহিকের বিভিন্ন চরিত্রের মডেল তৈরি করেছেন। গ্রামের প্রতিমা শিল্পী দীপক বাগ বলেন, ‘‘প্রধানত মাটি দিয়েই তৈরি করা হয়েছে মডেলগুলি।’’ লক্ষ্মীপুজো উপলক্ষে মণ্ডপ থেকে খানিক দূরে বসেছে মেলা। সেখানেও দর্শকদের ঢুঁ মারতে দেখা গিয়েছে। গ্রামের দক্ষিণ পাড়াতে নিউ তরুণ সঙ্ঘের পুজোয় নজর কেড়েছে আলোকসজ্জা। ১৯ বছরে পা দেওয়া এই পুজোটি ভাল করে ঠাহর করলেই দেখা যাবে, আলোকসজ্জায় ফুটে উঠছে তারা খসার দৃশ্য। এখানেও মণ্ডপ সাজিয়েছেন পাড়ার যুবকেরাই। কাল্পনিক মন্দিরের আদলে তৈরি হয়েছে মণ্ডপ। উদ্যোক্তারা জানালেন, প্রায় হাজার পাঁচেক জলের পাউচ দিয়ে সাজানো হয়েছে গোটা মণ্ডপটি। শিল্পী সুশান্ত মালিক বলেন, ‘‘এই ভাবে মণ্ডপ সাজিয়ে জলের অপচয় বন্ধ করার জন্য দর্শকদের আবেদন জানানো হয়েছে।’’ প্রতিমা শিল্পী তাপস পাল জানান, এ বার প্রতিমার সজ্জায় ব্যবহার করা হয়েছে চুমকি ও পুঁতির কাজ। পুজোর পাশাপাশি মণ্ডপ চত্বরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও দর্শকদের নজর কেড়েছে।

হাটকালনার ধর্মডাঙা গ্রামের স্কুলপাড়ার পল্লিশ্রী ক্লাবের পুজো এ বার ত্রিশ বছরে পা দিয়েছে। উদ্যোক্তাদের দাবি এ বারের মূল আকর্ষণ ছিল ত্রিশ ফুটের লক্ষ্মী প্রতিমা। প্রতিমা তৈরি করেছেন মৃৎশিল্পী কালিপদ মণ্ডল ও সাজের কাজ করেছেন কালনা শহরের শিল্পী সুনীল শিকদার। বড় প্রতিমা দেখতে এই মণ্ডপেও দর্শকদের ভিড় ছিল নজরে পড়ার মতো। পুজোর পাশাপাশি দর্শকদের জন্য ছিল বাউল গানের আসর। পুরনো প্রথা মেনে পুজোর চতুর্থ দিনে দেবীর বাহন পেঁচাকে বাসিন্দাদের বাড়ি-বাড়ি ঘোরান হয়। উদ্যোক্তারা জানান, এই প্রথার মাধ্যমে এলাকার সকলের মঙ্গলকামনার প্রার্থনা। এখান থেকে খানিক এগিয়েই আদিবাসী পাড়া। সেখানে পুকুর পাড়ে পাটকাঠি দিয়ে মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে। প্রতিমা বিসর্জনে থাকে আদিবাসী নাচ। এই গ্রামেরই অভিযাত্রী বাহিনী ক্লাবের পুজো মণ্ডপটিও বেশ ছিমছাম বলে জানান দর্শনার্থীরা। শিল্পী রামদাস ভক্তের আঁকা ছবিগুলি মণ্ডপের শোভা বাড়িয়েছে।

Advertisement

তবে এ বার লক্ষ্মীপুজোয় এতটা ভাল ভাবে করা যাবে বলে আগে ভাবতে পারেননি সুশান্ত মালিক, জগবন্ধু মণ্ডল, ভাস্কর মালিকদের মতো পুজো উদ্যোক্তারা। তাঁদের বক্তব্য, মাস দুয়েক আগের বৃষ্টি ও বেহুলা নদীর উপচে পড়া জলে চাষে ব্যাপক ক্ষতি হয়। গ্রামের চাষিরাও দাম পাননি ফসলের। কী ভাবে বাজেটে কাটছাঁট করে লক্ষ্মীপুজোর ঐতিহ্যকে বজায় রাখা যায় তা ভেবে পাচ্ছিলেন না তাঁরা। মাস দু’য়েক আগের বন্যার স্মৃতি এখনও টাটকা দর্শকদের মনেও। আর তাই বোধহয় মণ্ডপে প্রণাম সেরে বেরিয়ে আসার মুখে স্থানীয় চাষি রবি বাগ বলেন, ‘‘দেবীর কাছে একটাই প্রার্থনা, এই মরসুমে যেন ভাল ফলন হয়। ভাল দাম মেলে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement