OBC

মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত, কোপে ওবিসি শংসাপত্র

তৃণমূলের জমানায় ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত যত তফসিলি জাতি, জনজাতি, ওবিসি শংসাপত্র দেওয়া হয়েছিল, বিশেষত ‘দুয়ারে সরকার’-এর মাধ্যমে, সেগুলি পুনর্যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ ০৯:০৮
Share:

—প্রতীকী চিত্র।

ধর্মের ভিত্তিতে মুসলিমদের ওবিসি তালিকাভুক্ত করে সংরক্ষণের সুবিধা দেওয়া হয়েছে— এই যুক্তিতে কলকাতা হাই কোর্ট পশ্চিমবঙ্গে বাম জমানার শেষ পর্ব থেকে তৃণমূল জমানার গোড়া পর্যন্ত ৭৭টি সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত খারিজ করে দিয়েছিল। গত দু’বছর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সেই রায়ে স্থগিতাদেশ চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা লড়ছিল। এ বার নতুন বিজেপি সরকার সুপ্রিম কোর্টে সেই মামলা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিল। যার অর্থ, ২০১০-এর মার্চ থেকে ২০১২-র মে মাসের মধ্যে রাজ্যে ৭৭টি সম্প্রদায়কে ওবিসি-র তালিকাভুক্ত করার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিচ্ছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। এগুলির মধ্যে দু’টি হিন্দু সম্প্রদায় বাদে বাকি ৭৫টি-ই মুসলিম সম্প্রদায়। যার ফলে ২০১০ থেকে বিলি হওয়া প্রায় ৫ লক্ষ ওবিসি শংসাপত্র বাতিলের আশঙ্কা রয়েছে।

একই সঙ্গে তৃণমূলের জমানায় ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত যত তফসিলি জাতি, জনজাতি, ওবিসি শংসাপত্র দেওয়া হয়েছিল, বিশেষত ‘দুয়ারে সরকার’-এর মাধ্যমে, সেগুলি পুনর্যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। এই সময়কালে প্রায় ১.৬৯ কোটি জাতি শংসাপত্র দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ১ কোটি তফসিলি জাতি, ২১ লক্ষ তফসিলি জনজাতি এবং ৪৮ লক্ষ অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি বা ওবিসি শংসাপত্র।

অতীতে একাধিক বার এই সব জাতি শংসাপত্র বিতর্কের মুখে পড়েছে। মামলা গড়িয়েছিল আদালত পর্যন্ত। রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত, এসডিও-রা তা পুনর্যাচাই করবেন। দ্বিতীয় প্রজন্মের যাঁরা সেই শংসাপত্র পেয়েছেন, তাঁদের বিষয়টিও যাচাইয়ের আওতায় আসবে। কোনও অযোগ্য শংসাপত্র দেখলে আইনানুগ পদক্ষেপ করতে হবে। সরকারি আদেশনামায় বলা হয়েছে, এমন শংসাপত্র থাকা কোনও ব্যক্তির নাম এসআইআরের ফলে ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেলে তা যথাযথ ভাবে খতিয়ে দেখতে হবে এবং প্রয়োজনে সেই শংসাপত্র বাদ দিতে হবে। বিধির বিচ্যুতিতে কড়া পদক্ষেপ করবে প্রশাসন।

ওবিসি-সংরক্ষণ মামলা নিয়ে রাজ্য সরকারের আইনজীবী কুণাল মিমানি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারকে বৃহস্পতিবার চিঠি পাঠিয়ে রাজ্যের মামলা প্রত্যাহার করার কথা জানিয়েছেন। রাজ্যের অনুরোধ, দু’বছর আগের দায়ের করার মামলা দ্রুত শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করা হোক, যাতে রাজ্যের অনুরোধ মেনে সুপ্রিম কোর্ট সেই মামলা প্রত্যাহারের অনুমতি দিতে পারে। সুপ্রিম কোর্টে এত দিন তৃণমূল সরকার যে সব মামলা লড়ছিল, পালাবদলের পরে নতুন বিজেপি সরকার তার মধ্যে বেশ কিছু মামলা প্রত্যাহার করবে বা ভিন্ন অবস্থান নেবে, তার প্রথম প্রমাণ মিলেছে এই ভাবেই। রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি তাপস রায় বলেন, ‘‘তৃণমূল যথেচ্ছাচার করেছে। কোনও আইন, সংবিধান, নিয়ম কিছুই মানেনি। ওবিসি সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। নতুন সরকার ঠিক পদক্ষেপ করেছে।’’ তৃণমূলের মুখপাত্র, বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, ‘‘আগের সরকার মানুষের স্বার্থরক্ষায় পদক্ষেপ করেছিল। নতুন সরকারের এই সিদ্ধান্ত আইনি স্তরে খতিয়ে দেখবেন দলীয় নেতৃত্ব।’’

কোথা থেকে ওবিসি মামলার শুরু? বাম জমানার শেষ পর্বে এবং তৃণমূল সরকারের প্রথম পর্বে ২০১০-এর মার্চ থেকে ২০১২-র মে মাসের মধ্যে রাজ্যে ৭৭টি সম্প্রদায়কে ওবিসি-র তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। বাম জমানায় ৪২টি মুসলিম সম্প্রদায় ওবিসি তালিকাভুক্ত হয়েছিল। এদের ধর্মের ভিত্তিতে সংরক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলে প্রথম মামলা হয়। তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় এসে আরও ৩৫টি সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকাভুক্ত করে। ২০২৩ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ওবিসি সংরক্ষণ আইন জারি করে এই ৭৭টি সম্প্রদায়কে তার আওতায় নিয়ে আসে। এর ফলে মোট ওবিসি সম্প্রদায়ের সংখ্যা ১৭৯-তে পৌঁছয়। ২০২৪ সালের ২২ মে কলকাতা হাই কোর্ট রাজ্যের ওবিসি তালিকায় ৬৬টি সম্প্রদায়কে রেখে ১১৩টি সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত খারিজ করে দেয়। যুক্তি ছিল, ধর্মের ভিত্তিতে এই সব সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ফলে ২০১০ থেকে বিলি হওয়া প্রায় ৫ লক্ষ ওবিসি শংসাপত্র বাতিল হয়ে যায়। রাজ্য হাই কোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে এসেছিল।

২০২৫-এর মার্চে তৃণমূল সরকার নিজেই জানায়, রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন নতুন করে সমীক্ষা চালিয়ে একটি ওবিসি তালিকা তৈরি করবে। জুন মাসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার নতুন ৭৬টি সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকায় যোগ করে মোট ১৪০টি শ্রেণির ওবিসি তালিকা প্রকাশ করে। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, রাজ্য সরকার পুরনো সমস্ত সম্প্রদায়কে ফের ওবিসি তালিকায় ঢুকিয়েছে। কলকাতা হাই কোর্ট গত ১৭ জুন তাতে স্থগিতাদেশ দিয়েছিল। তার বিরুদ্ধে ফের সুপ্রিম কোর্টে যায় রাজ্য সরকার।

গত জুলাই মাসে সুপ্রিম কোর্টে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি বি আর গাভাইয়ের বেঞ্চ হাই কোর্টের সেই স্থগিতাদেশের উপরে স্থগিতাদেশ দিয়েছিল। হাই কোর্টের ওই রায়কে ‘আপাত ভাবে ভ্রান্ত’ ও ‘আশ্চর্যজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছিল শীর্ষ আদালত। এর পরে রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে আর্জি জানায়, ২০২৪-এর মে মাসে কলকাতা হাই কোর্ট পশ্চিমবঙ্গে ২০১০ থেকে বিলি করা যাবতীয় ওবিসি শংসাপত্র বাতিল করে রায় দিয়েছিল, তাতেও স্থগিতাদেশ দেওয়া হোক। শীর্ষ আদালত গত নভেম্বরে রায় দিয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত কলকাতা হাই কোর্টে এ নিয়ে কোনও শুনানি হবে না। প্রধান বিচারপতির পদ থেকে বি আর গাভাই অবসর নেওয়ার ফলে মামলাটি এখন বর্তমান প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এজলাসে রয়েছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন