BJP’s Charge Sheets

প্রত্যেক বিধানসভায় তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বকে নিশানা করতে অভিনব ‘চার্জশিট’ পেশ পদ্মের, ‘পাল্টা’ দিতে বললেন অভিষেক

বিজেপির অভিনব কৌশলকে হালকা ভাবে নিচ্ছে না তৃণমূল। তাই দলের শীর্ষ স্তর থেকে প্রতিক্রিয়া এসেছে। সোমবার মিলনমেলা চত্বরে তৃণমূলের ‘ডিজিটাল যোদ্ধা’ সম্মেলনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে মুখ খুলেছেন।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:৪৮
Share:

রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভা আসনের জন্য আলাদা আলাদা ‘চার্জশিট’ তৈরি করছে বিজেপি। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

তৃণমূল বিরোধী প্রচারের ভাষ্য বদলে নিচ্ছে বিজেপি। নিশানায় এ বার আর শুধু তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব নন। প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের স্থানীয় নেতৃত্বকেও নিশানা করার কৌশল নিচ্ছে রাজ্যের প্রধান বিরোধীদল। মাধ্যম ‘চার্জশিট’। রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভা আসনের জন্য আলাদা আলাদা ‘চার্জশিট’ তৈরি করছে বিজেপি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতি, অপশাসন, নারী নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, সংখ্যালঘু তোষণ, অনুপ্রবেশ’-সহ যে সব ‘অস্ত্র’ বিজেপি সাজিয়ে রেখেছে, তার পাশাপাশি গড়ে তোলা হচ্ছে এই ‘স্থানীয় অস্ত্রভান্ডার’।

Advertisement

বিজেপির ওই স্থানীয় অস্ত্রের বিরুদ্ধে স্থানীয় স্তরেই ‘প্রতি আক্রমণের’ প্রস্তুতি নিতে তৃণমূলকে নির্দেশ দিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

২০২১ সালে রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছিল ৭৭টি আসনে। পরে পদত্যাগ, দলবদল, বিধায়কের মৃত্যু এবং উপনির্বাচনে পরাজয়ের জেরে বিজেপির বিধায়কসংখ্যা এখন ৬৫। সেই ৬৫টি আসনেও বিজেপি একই কৌশল প্রয়োগ করতে চলেছে। তবে বলাই বাহুল্য, ওই সব আসনে নিশানায় স্থানীয় বিধায়কেরা থাকবেন না। তৃণমূলের বাধায় স্থানীয় বিধায়ক কোন কোন কাজ করতে পারেননি, বিজেপি ক্ষমতায় এলে ওই এলাকার জন্য কী করা হবে, থাকবে সে সব বিষয়। বাকি ২২৯টি আসনে তৃণমূলের বিধায়কেরা নিশানায় তো থাকবেনই, পুরপ্রধান, কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত প্রধান, পঞ্চায়েত সদস্য-সহ তৃণমূলের স্থানীয় নেতারাও নিশানায় থাকবেন।

Advertisement

ইতিমধ্যেই হাওড়ার শিবপুর, উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি, খড়দহ, বীজপুর, উত্তর দমদম, নদিয়ার কৃষ্ণনগর উত্তর-সহ ১০টি বিধানসভা কেন্দ্রে ‘চার্জশিট’ প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী ১০-১৫ দিনে বাকিগুলিও প্রকাশিত হবে বলে বিজেপি সূত্রের দাবি।

যে সব ঘটনা স্থানীয় কারণে বা স্থানীয় প্রশাসনের ব্যর্থতায় ঘটলেও গোটা রাজ্য জুড়ে আলোড়ন ফেলেছিল, সেগুলিকেই এই ‘চার্জশিট’ কর্মসূচির মাধ্যমে আবার মনে করিয়ে দিতে চাইছে বিজেপি। যেমন হাওড়ার শিবপুরের জন্য যে ‘চার্জশিট’ প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে বেলগাছিয়ার ভাগাড় বিপর্যয় এবং তার জেরে গৃহহারা পরিবারগুলির ‘এখনও ঘর না-পাওয়া’ সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। খড়দহের ‘চার্জশিটে’ হাসপাতাল জলমগ্ন হয়ে পড়ার ছবি মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। উত্তর দমদমের ‘চার্জশিটে’ মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘বেহাল নিকাশি ব্যবস্থা’র কারণে জলমগ্ন হয়ে পড়া ঘরে পাঁচ মাসের শিশুর ডুবে মৃত্যুর ঘটনা। এ ছাড়া কোন তৃণমূল নেতা ‘জমি মাফিয়া’ হয়ে উঠেছেন, কে ‘তোলাবাজি ও সিন্ডিকেটরাজ’ চালাচ্ছেন, কে পুকুর ভরাট করছেন বা অবৈধ নির্মাণ চালাচ্ছেন, কোথায় কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিক মহল্লা কর্মহীন, কোন তৃণমূল নেতার ‘ঘনিষ্ঠ’ ব্যক্তির কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, কোথায় ‘মদ্যপ’ জিম প্রশিক্ষক তরুণীকে ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ করেছেন, কোথায় বছরের পর বছর রাস্তাঘাট খানাখন্দে ভরা, কোথায় আবর্জনার স্তূপ সরানো হয় না— এমন নানা বিষয় তুলে ধরে ‘চার্জশিট’ সাজিয়েছে বিজেপি, যা নিয়ে পাড়ার পাড়ায় দৈনন্দিন আলোচনা চলতে থাকে। এই সব ‘চার্জশিটে’র ডিজিটাল প্রতিলিপি হোয়াট্‌সঅ্যাপের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার লিফলেটের আকারে ছাপিয়ে হাতে হাতে বিলিও করা হচ্ছে।

তৃণমূল নির্বাচনী প্রচারে বার বারই মনে করিয়ে দেয়, প্রার্থীর নাম যা-ই হোক, সব আসনে প্রার্থী আসলে মমতাই। সে ক্ষেত্রে শুধু মমতাকে আক্রমণ করে বা মমতার নানা ‘ব্যর্থতা’ তুলে ধরে অভিন্ন চার্জশিট তৈরি করলেই তো চলত। ২৯৪টি আসনের জন্য আলাদা আলাদা ‘চার্জশিট’ তৈরির দরকার পড়ল কেন?

রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকারের ব্যাখ্যা, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ এই দেশে একমাত্র রাজ্য, যার বিস্তৃতি আসমুদ্রহিমাচল। তাই পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্তে সমস্যা বা অপ্রাপ্তির ধরনও ভিন্ন ভিন্ন।’’ দেবজিতের কথায়, ‘‘বামফ্রন্ট জমানায় হোক বা এখন, আমাদের রাজ্যে একটা শ্রেণি মনে করে, কলকাতা আর তার ২০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা পশ্চিমবঙ্গটাই আসল আর সেখানকার সমস্যাই আসল সমস্যা। কিন্তু রাজ্যের অধিকাংশ মানুষই যে এই এলাকার বাইরে থাকেন, তাঁদের জীবনেও যে গুরুতর সমস্যা থাকতে পারে এবং সেগুলোও যে রাজ্য রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, এটা ওই শ্রেণি মনে করে না। বিজেপি কলকাতা এবং জেলাকে সমগুরুত্ব দেয়, এই চার্জশিটগুলোই তার প্রমাণ।’’

বিজেপির রাজ্য নেতারা জেলায় প্রচারে যাওয়ার সময় ওই চার্জশিট হাতে নিয়ে স্থানীয় সমস্যাগুলির কথাও বলবেন। তাতে তৃণমূল স্তরে বিজেপির ভাষ্য ‘তীক্ষ্ণতা’ পাবে বলে নেতৃত্ব মনে করছেন।

বিজেপির এই অভিনব কৌশলকে হালকা ভাবে নিচ্ছে না তৃণমূল। তাই দলের শীর্ষ স্তর থেকে প্রতিক্রিয়া এসেছে। সোমবারই মিলনমেলা চত্বরে তৃণমূলের ‘ডিজিটাল যোদ্ধা’ সম্মেলনে অভিষেক এ প্রসঙ্গে মুখ খুলেছেন। তিনি বলেন, ‘‘আমি শুনছি বিজেপি নাকি তৃণমূলের বিধায়কদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেবে। যেখানে দেবে, সেখানেই স্থানীয় স্তরের উন্নয়নের পরিসংখ্যান তুলে ধরতে হবে।’’ অভিষেকের নির্দেশ, ‘‘বুথভিত্তিক কাজের পরিসংখ্যান তুলে ধরুন। এক দিকে কেন্দ্র টাকা দেয়নি, অন্য দিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার কী করেছে, তা নিয়ে প্রতি আক্রমণ করতে হবে।’’

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement