BJP’s candidate survey

ভোটে সম্ভাব্য প্রার্থীর পাশাপাশি ‘না-প্রার্থী’ কারা? সমান্তরাল এক সমীক্ষায় জেনে নিচ্ছে বিজেপি! তিন নয়, বিধানসভা পিছু ছয় নাম

প্রত্যেক বিধানসভা কেন্দ্র পিছু নেতৃত্বের কাছে তিনটি করে নাম পৌঁছোচ্ছে বলে বিজেপি নেতারা দাবি করছেন। কিন্তু আসলে যাচ্ছে ছ’টি করে নাম। তিনটি পছন্দের। আরও তিনটি, যা অপছন্দের।

Advertisement

ঈশানদেব চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৯
Share:

রাজ্য বিজেপির অনেক নেতাই জানতেন না এই সমান্তরাল সমীক্ষার কথা। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

গতবারের মতো টলিউড বা টেলিউড থেকে যোগদানের ঘটা এ বার নেই। ‘যোগদান মেলা’ করে অন্য দলের ‘ওজনদার’দের দলে টানার হুল্লোড়ও নেই। তাই প্রার্থিতালিকায় কারও উড়ে এসে জুড়ে বসার আশঙ্কাও কম। তবু ‘ঘরপোড়া গরু’ এ বার অতিরিক্ত সতর্ক। ‘সিঁদুরে মেঘ’ বাইরে থেকে হানা না-দিলেও ঘরের মধ্যেই তৈরির হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন বিজেপি নেতৃত্ব। অতএব প্রার্থী বাছাই সংক্রান্ত সমীক্ষার পাশাপাশিই সেরে ফেলা হচ্ছে সমান্তরাল আর একটি কাজ। ‘না-প্রার্থী’ বেছে রাখার সমীক্ষা।

Advertisement

প্রত্যেক বিধানসভা কেন্দ্র পিছু নেতৃত্বের কাছে তিনটি করে নাম পৌঁছোচ্ছে বলে বিজেপি নেতারা দাবি করছেন। কিন্তু আসলে যাচ্ছে ছ’টি করে নাম। তিনটি পছন্দের। আরও তিনটি, যা অপছন্দের।

পেশাদার সমীক্ষক সংস্থাকে দিয়ে আসনভিত্তিক সমীক্ষা চালিয়ে সম্ভাব‍্য প্রার্থীদের নাম তুলে আনা বিজেপিতে অনেক দিন ধরেই চলছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন বা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সেই সমীক্ষা বিজেপির প্রার্থী বাছাইয়ের অন‍্যতম প্রধান মাপকাঠি ছিল। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের জন‍্য সেই সমীক্ষা কোনও বিধানসভা কেন্দ্রে দু’দফা চালানো হয়েছে, কোথাও তিন দফা। সাধারণ জনতার মতামত জানা হয়েছে দু’ভাবে। ১. সংশ্লিষ্ট বিধানসভা কেন্দ্রের নানা এলাকায় ঘুরে ঘুরে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে পছন্দ বুঝতে চেয়েছেন সমীক্ষক সংস্থার প্রতিনিধিরা। ২. ভোটারদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে পছন্দ জেনে নিয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে ১,০০০-১,২০০ জনের মতামত নেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ সমর্থন পেয়েছে যে তিনটি নাম, সেই তিনটি সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে।

Advertisement

কিন্তু এই নামগুলির বাইরে আরএ তিনটি করে নাম সমীক্ষকদের তালিকায় রয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসাবে নয়। বরং ‘না-প্রার্থী’ হিসাবে। অর্থাৎ, প্রার্থী হিসাবে কাদের কথা কিছুতেই ভাবা চলবে না। এমন তিনটি করে নামের একটি তালিকা প্রতিটি বিধানসভার জন‍্য তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে। কোথাও কোথাও সংখ‍্যাটি তিনের বদলে দুই হয়েছে বলেও বিজেপি সূত্রের খবর।

এমন ‘না-প্রার্থী’দের নামের তালিকা কী ভাবে তৈরি করল সমীক্ষক সংস্থা? বিজেপি সূত্রের বক্তব্য, সমীক্ষায় নাম উঠে না-আসা সত্ত্বেও কারা সংশ্লিষ্ট আসনে প্রার্থী হওয়ার চেষ্টায় রয়েছেন, কারা কোনও প্রথম সারির নেতাকে ধরে টিকিট জোগাড় করতে সচেষ্ট, তাঁদের ভাবমূর্তি কেমন, তাঁরা টিকিট পেলে সংশ্লিষ্ট আসনে ফলাফল কেমন হতে পারে, সে সব খোঁজখবর করেছে সমীক্ষক সংস্থা। এ ভাবেই প্রথম পছন্দের তিনটি নাম খুঁজে আনার ফাঁকে ‘না-পছন্দ’ তালিকাও বুঝে নেওয়া হয়েছে।

এ ধরনের একটি ‘সমান্তরাল’ সমীক্ষাও যে চলছে, রাজ‍্য নেতাদের অনেকেই তা জানতেন না। সরাসরি দিল্লির নির্দেশেই সমীক্ষক সংস্থা এই কাজটি করেছে। এখন বিভিন্ন বিধানসভা আসনে মণ্ডল স্তরের পদাধিকারীদের সামনে পছন্দের তালিকায় থাকা তিন নামের পাশাপাশি ওই নামগুলিও তুলে ধরা শুরু হয়েছে। প্রথমে পছন্দের নামগুলির বিষয়ে মতামত নেওয়া হচ্ছে। তার পরে ‘অপছন্দ তালিকা’ বার করে সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ রয়েছে বা ওই নামগুলির ক্ষেত্রে এলাকায় আপত্তির আবহ কেন? ‘না-প্রার্থী’দের নামের পাশে সে সব তথ‍্য তথা কারণ উল্লেখ করে বিজেপি নেতৃত্বের কাছে জমা দেওয়া হচ্ছে।

বিজেপি সূত্রের খবর, এই ‘না-প্রার্থী’ সংক্রান্ত সমস‍্যা উত্তরবঙ্গে কম। দক্ষিণবঙ্গের আসনগুলিতেই এঁদের সংখ্যা বেশি। যাঁদের নাম এই ‘অপছন্দ তালিকা’য় উঠে এসেছে, তাঁদের অনেকে রাজ‍্য স্তরে পরিচিত মুখ। কেউ মুখপাত্র হওয়ার দৌলতে, কেউ প্রথম সারির কোনও নেতার ‘ঘনিষ্ঠ’ হওয়ার সুবাদে।

‘না-প্রার্থী’দের যে তালিকা ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে বলে বিজেপি সূত্রের দাবি, তাতে অধিকাংশ নামই প্রাক্তন তৃণমূলীদের। কেউ তৃণমূলের এককালের ‘সেকেন্ড-ইন-কম‍্যান্ড’-এর পিছু নিয়ে বিজেপিতে শামিল হয়েছিলেন। কেউ তৃণমূলের তৎকালীন ‘প্রধান যুব আইকন’-এর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এবং ‘দাদা’র পদাঙ্ক অনুসরণ করেই বিজেপিতে ঢুকেছেন। বিজেপি সূত্রে জানা যাচ্ছে, এমন একটি সুপরিচিত নাম একসঙ্গে দু’টি বিধানসভা কেন্দ্রে ‘অপছন্দ তালিকা’য় রয়েছে— রাজারহাট নিউটাউন এবং বিধাননগর। আরও এক পরিচিত মুখের নাম ‘অপছন্দ তালিকা’য় রয়েছে চণ্ডীপুরে। রাজ‍্য স্তরের এক পদাধিকারীর নাম ওই তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে পাঁশকুড়ার দুটি আসনের মধ্যে একটিতে।

তিনটি পছন্দের নামের পাশাপাশি তিনটি অপছন্দের নামও খুঁজে রাখার কথা বিজেপি নেতৃত্বের মাথায় এল কেন? রাজ‍্য নেতারা কেউই এ বিষয়ে প্রকাশ‍্যে মন্তব্য করতে রাজি নন। বিজেপি সূত্রের ব্যাখ্যা, ২০২১ সালের ভুলের পুনরাবৃত্তি কিছুতেই হতে দিকে চায় না দল। রাজ‍্য নেতৃত্বের চেয়েও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সে বিষয়ে বেশি সতর্ক। কারণ, ২০২১ সালে বিজেপির ভরাডুবির পরে প্রার্থী বাছাই সংক্রান্ত নানা সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন বিজেপির রাজ‍্য নেতারা। সে সমালোচনায় মূলত নিশানা করা হয়েছিল কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের একজনকেই। এ বার তাই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বেশি সতর্ক। ব‍্যক্তিগত আলাপ-পরিচিতি বা ঘনিষ্ঠতা বা অন‍্য কোনও প্রভাব কাজে লাগিয়ে কোনও অনাকাঙ্ক্ষিত মুখ যাতে কোনও আসনে টিকিট জোগাড় করতে না-পারে, তা নিশ্চিত করতে চাইছেন নেতৃত্ব। তাই তৈরি রাখা হচ্ছে এমন তালিকা, যেখানে নাম ঢুকলে কোনও প্রভাবই টিকিটের ব্যবস্থা করে দিতে পারবে না।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement