‘এ বার ভোটারদের হাতে মার খাব’! রাজ্যের তিন জেলায় গণইস্তফা দিতে চাইলেন বিএলও-রা, নিশানায় কমিশন

নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে দায়িত্ব ছাড়তে চাইলেন বিএলও-রা! হাওড়া, মুর্শিদাবাদ এবং পূর্ব বর্ধমানে বিক্ষোভ দেখালেন আধিকারিকেরা। চাইলেন ইস্তফা দিতে।

Advertisement
শেষ আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ২১:০৪
Share:

হাওড়ার ডোমজুড়ে বিএলও-দের বিক্ষোভ। —নিজস্ব ছবি।

এসআইআরের শুনানি এখনও চলছে। তার মধ্যেই রাজ্যের নানা জায়গায় শুরু হল বিএলও-দের ক্ষোভ। তৃণমূলের দাবি, যে কাজের বোঝা ওঁদের উপর চাপানো হয়েছে, তাতে এটা হওয়ারই ছিল। বিজেপির দাবি, বিক্ষোভকারী বিএলও-রা ‘তৃণমূলের লোক।’

Advertisement

বুধবার শুনানিপর্বে হাওড়ায় একসঙ্গে ১৭ জন বিএলও ইস্তফাপত্র জমা দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেন। বাঁকড়া এক নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার ১৪০ থেকে ১৫৭ পার্ট পর্যন্ত ওই ১৭ জন বিএলও বিডিও মারফত ইআরও-র কাছে ইস্তফাপত্র জমা দেওয়ার জন্য হাজির হন ডোমজুর বিডিও অফিসে। তাঁদের অভিযোগ, গত দু’ মাসের বেশি সময় ধরে এসআইআরের কাজ করছেন তাঁরা। কিন্তু নির্বাচন কমিশন হোয়াট্‌সঅ্যাপের মাধ্যমে একের পর এক নতুন নির্দেশিকা জারি করছে। ফলে নতুন নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে। প্রভাব পড়ছে এসআইআর প্রক্রিয়ায়। ভোটারেরা এক বার নথি জমা দিয়েছেন। ফের নথির জন্য তাঁদের তলব করতে হচ্ছে। এতে অনেকে বিরক্ত হচ্ছেন। আর তাঁদের ক্ষোভের মুখোমুখি হতে হচ্ছে কেবল বিএলও-দের। এমনই এক বিএলও বলেন, ‘‘আমাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকে খারাপ খারাপ কথা বলছেন। সামাজিক ভাবে হেনস্থা করা হচ্ছে আমাদের। সম্মানহানি হচ্ছে।’’ তাঁর অভিযোগ, কমিশনের ‘খামখেয়ালিপনায়’ এসআইআরের কাজ এখন তাঁদের কাছে মানসিক চাপ হয়ে উঠেছে। ধকল নিতে না পেরে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তাই আর নয়। এ বার এই কাজ থেকে অব্যাহতি চান তাঁরা। শুধু তা-ই নয়, হাওড়ার ওই বুথ স্তরের আধিকারিকদের অভিযোগ, ভোটারদের হেনস্থার দায়ও কমিশনের। এখানে বিএলও-দের করণীয় কিছু নেই। এ নিয়ে হাওড়া জেলার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক পি দীপাপ্রিয়া বলেন, ‘‘বিএলও-রা বিডিও-র সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে কেউ ইস্তফাপত্র দেননি।’’

মুর্শিদাবাদের ফরাক্কায় বিএলও-দের অভিযোগও একই। তাঁদের দাবি, কমিশন বার বার নির্দেশিকা বদল করায় কাজের অসুবিধা হচ্ছে। তার উপর ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকের ক্ষোভের মুখে পড়ছেন বিএলও-রা। বুধবার ফরাক্কা ব্লকের প্রায় ২০০ জন বিএলও ইস্তফাপত্র জমা দেন। যদিও প্রশাসন জানিয়েছে, কারও ইস্তফাপত্র এখনও গৃহীত হয়নি।

Advertisement

বিএলও-রা আঙুল তুলেছেন কমিশনের সার্ভার এবং অ্যাপের দিকে। তাঁদের দাবি, ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে বর্তমান তালিকার তথ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। সার্ভারের ত্রুটির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, কোনও পরিবারের সন্তান সংখ্যা চার হলেও নথিতে ছ’জন দেখিয়ে শুনানিতে তলব করা হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের রোষের মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের। যাঁদেরই নাম বাদ যাবে, তাঁদের আক্রমণের মুখে পড়তে হবে। এই আশঙ্কায় কাজ ছাড়তে চাইছেন তাঁরা। মীর নাজ়ির আলি নামে এক বিএলও-র কথায়, “প্রথমে বলা হয়েছিল, শুধু মৃত এবং স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম বাদ যাবে। কিন্তু এখন রোজ নিয়ম পাল্টাচ্ছে। কোনও প্রশিক্ষণ নেই, শুধু হোয়াটস্‌অ্যাপে নির্দেশ পাঠিয়ে কাজ চাপানো হচ্ছে। সকালের নির্দেশ রাতে বদলে যাচ্ছে। এ ভাবে কাজ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।” সৈয়দ তাজ ইসলাম নামে আর এক বিএলও-র দাবি, ‘‘২০০২ সালের ভোটার তালিকায় প্রচুর ভুল ছিল। ভোটারেরা পরবর্তীকালে নিয়ম মেনে সংশোধনও করেছেন। এখন কমিশন যদি সেই পুরনো নথি-ই যাচাই করতে চায়, তবে অনেক সাধারণ ভোটারের নামই তালিকা থেকে বাদ পড়বে।’’

পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোটে বিএলও-দের ডেপুটেশন ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। ‘নিরাপত্তাহীন পরিবেশে’ কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, এমনই অভিযোগ তুলে গণইস্তফার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বুথ স্তরের আধিকারিকেরা। নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রতিকার চেয়ে মঙ্গলকোট ব্লক অফিসে ডেপুটেশন জমা দেন মঙ্গলকোট বিধানসভার ২৩৬টি বুথের বিএলও-রা। তাঁদের অভিযোগ, ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ (যুক্তিগত গরমিল)-র নামে জোর করে অতিরিক্ত কাজ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে বিএলও এবং ভোটার, উভয়-ই হয়রানির মুখে পড়ছেন। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হল, নিরাপত্তার অভাব। বিএলও-দের আশঙ্কা, আগামিদিনে এই নোটিস দিতে গেলে সাধারণ মানুষ মারমুখী হয়ে উঠতে পারেন। অবিলম্বে উপযুক্ত নিরাপত্তা, নির্দিষ্ট কাজের পরিধি এবং যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে পরিকল্পিত ভাবে কাজ করানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এই ডেপুটেশন নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া দেননি নির্বাচন কমিশনের আধিকারিক। শুধু জানানো হয়েছে, বিএলও-দের দাবিগুলি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। উল্লেখ্য, ইস্তফা দিলেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবেন না বিএলও-রা। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক কমিশনের এক আধিকারিক বলেন, ‘‘আইন অনুযায়ী সমস্ত বিএলও-কে তাঁদের নির্দিষ্ট কাজ চালিয়ে যেতে হবে। গোটা পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে জেলা নির্বাচন দফতর।’’

কিন্তু বিএলও-দের বিদ্রোহ ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও তরজা শুরু হয়েছে। বর্ধমানের এক বিজেপি নেতার বক্তব্য, “দিদির নির্দেশে এঁরা এ সব করছেন। এখন বলছেন, ‘কাজ করব না।’ আবার মুখ্যমন্ত্রী বললেই কাজে যাবেন। এঁরা শাসকদলের লোক।’’ পাল্টা তৃণমূলের দাবি, বিজেপি নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতেই এ সব গল্প ফাঁদছে। এক তৃণমূল নেতা বলেন, ‘‘ভোটের আগে ইডি, সিবিআই, সব ফেল করেছে দেখে নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে কিছু করার চেষ্টা চলছে।”

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement