এত দিন ধর্মনিরপেক্ষ সব শক্তির একজোট হওয়ার আহ্বান ছিল। সেই ছাতার তলায় কংগ্রেসও অচ্ছুৎ নয় বলে জানাচ্ছিলেন সিপিএম নেতারা। এ বার আর এক ধাপ এগিয়ে সরাসরি জোট-সম্ভাবনায় নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য কংগ্রেস হাইকম্যান্ডকে বার্তা দিলেন সিপিএম রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র। তাঁর সাফ কথা, সময় আর বেশি নেই।
বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে বামেদের জোট বা সমঝোতা হবে, সরাসরি এমন কথা এখনও সিপিএম নেতৃত্ব বলেননি। দলের ভিতরে-বাইরে কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়ার দাবি যদিও প্রবল। সূর্যবাবু রবিবারও সরাসরি বলেননি, তাঁরা জোটের পথেই হাঁটবেন। কিন্তু কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের জবাব চেয়ে যে কথা তিনি বলেছেন, তাতে বার্তা স্পষ্ট। যার প্রেক্ষিতে প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব জানাচ্ছেন, তাঁরাও হাইকম্যান্ডের সঙ্কেতের অধীর অপেক্ষায় আছেন!
সিটুর হাওড়া জেলা সম্মেলন উপলক্ষে সমাবেশ থেকে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক এ দিন কৌশলে বল ঠেলে দিয়েছেন কংগ্রেসের কোর্টেই। সাঁকরাইলের ধুলাগড়িতে ওই সমাবেশে সূর্যবাবু বলেছেন, তৃণমূল এবং বিজেপির বিরুদ্ধে বৃহত্তর লড়াই চান তাঁরা। তার জন্য যিনি যে ঝান্ডার লোকই হন, বামেদের সঙ্গে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে যোগ দিন। এই আহ্বানের পাশাপাশিই এক ধাপ এগিয়ে সূর্যবাবু এ দিন বলেন, ‘‘অনেকে আমাদের জিজ্ঞাসা করেন, কংগ্রেসের সঙ্গে কি জোট হবে? প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বকে বলেছি, দু’টি স্লোগান আছে— তৃণমূল হঠাও, রাজ্য বাঁচাও আর বিজেপি হঠাও, দেশ বাঁচাও! কংগ্রেসের অসুবিধা বুঝি। ওদের হাইকম্যান্ড আছে। আমাদের আহ্বান আপনারা শুনেছেন। আপনাদেরও স্লোগান যদি এক হয়, তা হলে হ্যাঁ বলে দিন! যদি না মেলে, তা-ও বলে দিন!’’ বিরোধী দলনেতার আরও বক্তব্য, ‘‘কংগ্রেস বলছে সময় লাগবে। কিন্তু বেশি সময় তো নেই!’’
রাজ্যে কোন পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের সঙ্গেও বোঝাপড়ার কথা তাঁদের বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে, গত কয়েক দিনে বাম শরিক নেতাদের তা আলাদা করে বুঝিয়েছেন সূর্যবাবু। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি থেকে পলিটব্যুরোর সদস্য প্রকাশ কারাট পর্যন্ত এ ব্যাপারে দরজা খুলে রেখে গিয়েছেন কলকাতায় প্লেনামের সময়েই। এর পরে সিপিএমের রাজ্য কমিটির সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে কংগ্রেসের অবস্থান বুঝে নেওয়ার কথা দল ও বামফ্রন্টের বৈঠকে আগেই বলেছিলেন সূর্যবাবুরা। এ বার সে কথাই প্রকাশ্যে বলে দিয়ে কংগ্রেসের উপরে চাপ বাড়িয়ে রাখলেন তাঁরা।
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী অবশ্য জানাচ্ছেন, তাঁদের দলের নিয়ম মেনেই হাইকম্যান্ডের মতের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তবে কংগ্রেস এবং সিপিএমের নিচু তলার মনোভাব যে এখন একই, মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। প্রদেশ সভাপতির বক্তব্য, ‘‘তিনটি জেলা বাদে (উত্তর দিনাজপুর, মালদহ ও মুর্শিদাবাদ) আমাদের দলের কর্মীরা এই নরখাদক তৃণমূলের হাত থেকে রেহাই পেতে সিপিএমের সঙ্গে যৌথ লড়াই চান। অনেকে বলছেন, ৩৪ বছর তো সিপিএমের বিরুদ্ধে লড়েছি। হ্যাঁ, অবশ্যই লড়েছি! কিন্তু তৃণমূল যে অবস্থার সৃষ্টি করেছে, তা থেকে মুক্তি পেতে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।’’ হাইকম্যান্ডকেও অধীরেরা বলেছেন, তৃণমূলকে বাদ দিয়েই যা করার করতে হবে। দরকারে বাম-সঙ্গে যে তাঁদের আপত্তি নেই, গত কয়েক দিনে বারবার বুঝিয়েছেন অধীর। প্রদেশ নেতাদের মধ্যে মানস ভুঁইয়াই এখনও পর্যন্ত জোর গলায় বাম-সঙ্গের বিরোধিতা করেছেন।
সূর্যবাবু যেমন সিটুর সমাবেশ থেকে তৃণমূল ও বিজেপিকে কড়া আক্রমণ করে কংগ্রেসের দিকে প্রস্তাব দিয়েছেন, তেমনই এ দিন বারুইপুরে আইএনটিইউসি-র জেলা সম্মেলন থেকে এক সঙ্গে ‘মানুষের মহাজোটে’র দাবি তুলেছেন সিপিএমের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা সম্পাদক সুজন চক্রবর্তী ও প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ওমপ্রকাশ মিশ্র। তৃণমূলের আমলে সারদা, টেট কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, খুনের প্রতিবাদেই ‘মানুষের মহাজোট’ গড়ে উঠছে, বলেন দু’দলের নেতারাই।
সুজনবাবু বলেন, ‘‘শ্রমিক সংগঠনগুলির ঐক্য ছিলই। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী মানুষের মহাজোট হওয়া প্রয়োজন।’’ ওমপ্রকাশ বলেন, ‘‘মানুষের এই মহাজোটের দাবি আমরা সনিয়া গাঁধীর কাছে পৌঁছে দেব।’’