কলেজ পড়ুয়া। প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
শিক্ষক পদপ্রার্থী গবেষক মহলে চর্চা হচ্ছে, এটা কি পিএইচ ডি করার 'শাস্তি'? আপাত ভাবে কলেজ শিক্ষক পদে চাকরির সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু চাকরির যোগ্যতার যা শর্ত, তাতে বহু পিএইচ ডি বা উচ্চতর গবেষণার ডিগ্রিধারীদের জন্য রাজ্যে কলেজের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসরের পদ কার্যত অধরা হয়ে উঠছে বলেই সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত।
জাতীয় শিক্ষানীতির শর্ত অনুযায়ী, কলেজ শিক্ষকদের পদোন্নতি এবং স্নাতক স্তরের চতুর্থ বর্ষে পড়াতে পিএইচ ডি বা উচ্চ স্তরের গবেষণা ক্রমশ জরুরি হয়ে উঠছে। কিন্তু রাজ্যে কলেজ শিক্ষক নিয়োগের সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তিতে সেই গুরুত্বের চিহ্নমাত্র নেই।
২০১২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কলেজ শিক্ষক (অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর) নিয়োগ সংক্রান্ত নির্দেশিকায় বয়সসীমা সাধারণ শ্রেণির জন্য ৩৭ বছর, তফসিলি জাতি, জনজাতির (এসসি, এসটি) ৪২ বছর এবং ওবিসি-র ৪০ বছর রাখা হয়। সেই সঙ্গে পিএইচ ডি থাকলে সবার জন্যই আরও পাঁচ বছরের বাড়তি সময়সীমার ছাড় দেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালের নির্দেশিকাতেও যোগ্যতার এই শর্তই নির্দিষ্ট থাকে। কিন্তু ২০২০ সালের কলেজ সার্ভিস কমিশনের (সিএসসি) বিজ্ঞপ্তি থেকে ছবিটা পাল্টে গিয়েছে। চাকরি পদপ্রার্থী তিনটি শ্রেণির বয়সসীমা বাড়িয়ে যথাক্রমে ৪০ (সাধারণ), ৪৫ (এসসি-এসটি) এবং ৪৩ (ওবিসি) করা হয়েছে। কিন্তু পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের জন্য ছাড় দূরে থাক, বিষয়টির নামগন্ধও নেই। গত মাসে প্রকাশিত সিএসসি-র বিজ্ঞপ্তি নিয়েও একই প্রশ্ন উঠছে। এখানেও সাধারণ শ্রেণির ৪০, ওবিসি-র ৪৩ এবং এসসি, এসটি-র জন্য ৪৫ বছরের বয়সসীমা রাখা থাকলেও পিএইচ ডি বা গবেষণার যোগ্যতা নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই।
রাজ্যের বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অধ্যাপকেরা অনেকেই মানছেন, যোগ্যতার এই মাপকাঠিতে বহু পরিশ্রমে পিএইচ ডি বা পোস্ট ডক করা অনেক মেধাবীই শিক্ষকতার সুযোগ হারাবেন। লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের অধ্যক্ষ শিউলি সরকার বলেন, “ইউজিসির নিয়ম অনুযায়ী কলেজ শিক্ষকদের পদোন্নতি পেয়ে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হতে গেলেও পিএইচ ডি করতেই হবে। তা ছাড়া, নতুন শিক্ষানীতির চার বছরের স্নাতক পাঠ্যক্রমে চতুর্থ বর্ষে (সপ্তম ও অষ্টম সিমেস্টারে) শিক্ষার্থীদের গবেষণা করানো আবশ্যক। সার্থক শিক্ষক হয়ে উঠতে কলেজ-শিক্ষকদের বিষয়-ভিত্তিক গবেষণার অগ্রগতি নিয়ে সজাগ-সচেতন না-হয়েওউপায় নেই।”
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও সম্প্রতি কলেজ শিক্ষকদের পিএইচ ডি গাইড হওয়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানাচ্ছেন। নতুন শিক্ষানীতিরচাহিদা মেনে কলেজে কলেজে গবেষণা পরিকাঠামো গড়ার দায়ও উঠে এসেছে।
বয়সের গেরোয় মেধাবী পিএইচ ডি বা পোস্ট-ডক গবেষকদের শিক্ষা জগতে কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনাটি উড়িয়ে দিচ্ছেন না সিএসসি-র সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকেরা। তবে সিএসসি-র চেয়ারম্যান সৌরেন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “কোনও আবেদনকারীর পোস্ট-ডক বা গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার অভিজ্ঞতা থাকলে বয়সের ছাড়ের জন্য উচ্চ শিক্ষা দফতরে আবেদনজানাতে পারবেন।”
সাম্প্রতিক অতীতে মর্যাদার ফেলোশিপপ্রাপ্ত আইআইটি-র বিজ্ঞানী থেকে বিদেশে গবেষণারত মেধাবী শিক্ষক পদপ্রার্থীও বয়সের গেরোয় সিএসসি-র নিয়োগে ধাক্কা খেয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির (ওয়েবকুটা) সহ-সভাপতি প্রবোধ মিশ্র সরব, তা হলে দেখা যাচ্ছে সবটাই সরকার বা শাসক দল ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালীদের বিবেচনার উপরে নির্ভরশীল। তাঁর কথায়, ‘‘এ রাজ্যের কলেজে শিক্ষকতা করতে চাইলে মেধাবী গবেষক শিক্ষক পদপ্রার্থীরাও এখন শাসক দলের শিক্ষক-নেতাদের ধরে বিকাশ ভবনে ধর্না দিতে বাধ্য হবেন। এর ফলেও একটা অস্বচ্ছ নিয়োগ পদ্ধতি গড়ে ওঠা বিচিত্র নয়।”
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে