রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।
শুটিং করতে গিয়ে সমুদ্রে তলিয়ে মৃত্যু হয়েছে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। কিন্তু মৃত্যুর ৪৮ ঘণ্টা পরেও তদন্ত এগোনোয় পুলিশের ভূমিকা কেন সদর্থক নয়, সেই প্রশ্ন উঠেছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার গাফিলতিতে প্রাণহানির পরেও শুটিং ইউনিটের লোকজন, প্রত্যক্ষদর্শীদের জিজ্ঞাসাবাদের পদক্ষেপে পুলিশ তৎপর নয়, এমন ক্ষোভে সরব হয়েছেন টালিগঞ্জের একাংশ। রাজ্য মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রযোজনা সংস্থা জড়িত বলেই তদন্তে গড়িমসি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। লীনা অবশ্য বলছেন, “পুলিশ আমার সংস্থার যাঁকে যা জিজ্ঞাসাবাদ করার ইতিমধ্যেই করেছে। তাঁরা সব রকম সহযোগিতা করেছেন। আগামী দিনেও করবেন।”
ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছেন সুদীপ্তা চক্রবর্তী, শ্রীলেখা মিত্র, কৌশিক সেনের মতো শিল্পীরা। প্রযোজক রানা সরকারের মতে, “শিল্পীরা ওঁর (লীনা) বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস করবেন না। পাছে কাজ হারান।” কাজ হারানোর ভয়েই কেউ প্রতিবাদ করছে না, বলছেন রূপাঞ্জনা মিত্রও। কমিশনের পদ থেকে লীনার পদত্যাগ দাবি করেছে বিজেপি। মুম্বইয়ের ‘অল ইন্ডিয়া সিনে ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন’ প্রযোজক, প্রয়োজনা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট চ্যানেলের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ দায়ের, বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠনের দাবি তুলেছে। এ দিন বর্ধমানের গুসকরায় তৃণমূল সাংসদ সায়নী ঘোষ বলেন, “সুরক্ষা, নিরাপত্তা সবার দরকার। সব ক্ষেত্রে দরকার। এটা নিয়ে আরও কাজ করতে হবে।”
দিঘার অদূরে তালসারিতে যেখানে রাহুল সমুদ্রের জলে পড়ে যান, সেই এলাকাটি ওড়িশার অন্তর্গত। তবে ঘটনার তদন্ত করছে দিঘা মোহনা থানার পুলিশ। তাদের দাবি, ইতিমধ্যে শুটিংয়ের দলের কয়েক জন সদস্য এবং স্থানীয় ব্যবস্থাপককে (লোকাল কো-অর্ডিনেটর) জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ওই ব্যবস্থাপক তথা হোটেল মালিক সৌরভ সিংহের দাবি, “স্থানীয় নুলিয়া থেকে নৌকা জোগাড় করে দিয়েছি।” কিন্তু প্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়েছিলেন কি? জবাব দেননি তিনি। পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার অংশুমান সাহা বলেন, “অভিনেতার পরিবারের তরফে লিখিত অভিযোগ জানানো হয়নি। অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা করে যেটুকু তদন্ত করার, আমরাই করছি।”
পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিরুদ্ধে কর্তব্যে গাফিলতির মামলাও করতে পারত? পুলিশ সুপারের জবাব, “ময়না তদন্তের রিপোর্ট পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে। যদি ওড়িশা পুলিশের সহযোগিতা লাগে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তা-ও চাওয়া হবে।” তাতে কি তদন্তে দেরি হবে না? ওড়িশার বালেশ্বরের পুলিশ সুপার প্রত্যুষ দিবাকর বলেন, “দিঘা মোহনা থানার পুলিশ পুরো ঘটনার তদন্ত করছে। আমরা তাদের সহযোগিতা করছি। দু’পক্ষে সমন্বয় আছে।” ওড়িশা পুলিশের তরফে প্রযোজন সংস্থাকে নোটিস পাঠানো হয়েছে বলে খবর।
অনুমতি ছাড়াই ওই শুটিং চলছিল বলে জানা গিয়েছে। সমুদ্রে শুটিংয়ের উপযুক্ত কোনও নিরাপত্তার বন্দোবস্তও করা হয়নি। বালেশ্বর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গায়ত্রী প্রধান বলেছেন, “সমুদ্রের জলে নাচের দৃশ্যের শুটিংয়ের সময়ে অভিনেতা (রাহুল) এবং অভিনেত্রী (শ্বেতা মিশ্র) দু’জনেই গর্তে আটকে যান।” যদিও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় কালুচরণ পাত্রের দাবি, “গর্তে আটকে যাওয়ার খবর ঠিক নয়। শুটিং চলাকালীন অভিনেত্রী জলে ভেসে যাচ্ছিলেন। তাকে বাঁচাতে গিয়ে রাহুলও ভেসে যান।”
শুটিংয়ের দলের তরফে দাবি, তাঁদের লোকজনই স্থানীয়দের সাহায্যে প্রথমে শ্বেতাকে ও পরে রাহুলকে জল থেকে তোলেন। যদিও স্থানীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির কোষাধ্যক্ষ বাদল গঙ্গাই বলেন, “যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেখানে এত স্রোত ছিল, যে বাইরের কারও সেখানে পৌঁছনোর উপায় ছিল না। এলাকারই কয়েক জন গিয়ে প্রথমে অভিনেত্রী এবং পরে রাহুলকে তুলেছেন।”
তা হলে কি রাহুলকে তুলতে দেরি হয়েছিল? কারণ, স্থানীয়দের দাবি, বিকেল সাড়ে ৪টে নাগাদ দুর্ঘটনাটি ঘটে। অথচ, দিঘা হাসপাতালে সুপার সন্দীপ বাগ জানান, রাহুলকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা নাগাদ হাসপাতালে আনা হয়। গাড়িতে তালসারি থেকে দিঘা পৌঁছতে মিনিট কুড়ি লাগার কথা। পুলিশি তদন্তে ধন্দ কাটেনি। ময়না তদন্তের রিপোর্টও তাদের হাতে আসেনি বলে দাবি পুলিশের। বালেশ্বরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের দাবি, “ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তেমন কাউকে আমরা পাইনি। ওই সংস্থা আগাম অনুমতি নেয়নি। তাই আমরাও জানতাম না।”
টালিগঞ্জে রাহুলের সহকর্মীদের একাংশের দাবি, গোটা ঘটনা ঘটেছে বাংলা ধারাবাহিকের শুটিং চলাকালীন। ক্যামেরা চালু ছিল। তার ফুটেজও বাজেয়াপ্ত করেছে পুলিশ। তার পরেও তদন্ত যেখানে দাঁড়িয়ে, তার থেকে বেশি অগ্রগতি হল না কেন, কোনও প্রভাব তদন্তের গতি নিয়ন্ত্রণ করছে কি না, এমন বহু প্রশ্নের জবাবই স্পষ্ট নয়।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে