Anti-Corruption Drive

দুর্নীতিমুক্তির প্রতিশ্রুতি রক্ষাতেই কি ঝোড়ো ইনিংস? ‘ডবল ইঞ্জিন’ অভিযানে নেতা-পুলিশকর্তা-সহ ডজনের বেশি গ্রেফতার ১০দিনে!

গত ৯ মে শপথ নিয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। দু’দিনের মাথায় অর্থাৎ ১১ মে রাতে গ্রেফতার হয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু। পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলায় তদন্তে দক্ষিণ দমদম পুরসভায় বেআইনি ভাবে চাকরিপ্রাপকদের নাম সুপারিশ করার ঘটনায় তাঁকে ইডি তলব করেছিল।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৮ মে ২০২৬ ২৩:১০
Share:

(বাঁ দিক থেকে) সুজিত বসু, শান্তনু সিংহ বিশ্বাস এবং শুভেন্দু অধিকারী। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

কথা ছিল দুর্নীতিমুক্ত রাজ্য উপহার দেওয়ার। শুধু ভাষণে নয়। গানে, স্লোগানে, সঙ্কল্পপত্রে— সর্বত্র দুর্নীতি, তোলাবাজি এবং সিন্ডিকেট রাজ-এর বিরুদ্ধে বিজেপির প্রচার ছিল সবচেয়ে উচ্চকিত। সরকার গঠনের পরে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের বার্তাই কি সবচেয়ে তৎপর ভাবে দিতে চাইছে বিজেপি? একা রাজ্য সরকার অবশ্য নয়, সঙ্গে জুড়েছে একাধিক কেন্দ্রীয় এজেন্সি। রাজ্য জুড়ে দুর্নীতি-তোলাবাজির নানা অভিযোগের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে ‘ডবল ইঞ্জিন’ অভিযান। নতুন সরকারের প্রথম ১০ দিনে দুর্নীতির অভিযোগে পুলিশ, সিবিআই, ইডি-র হাতে গ্রেফতার এক ডজনেরও বেশি। ধৃতদের মধ্যে রাজ্যের সদ্যপ্রাক্তন মন্ত্রী বা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ‘বিশেষ আস্থাভাজন’ পুলিশকর্তাও রয়েছেন।

Advertisement

গত ৯ মে শপথ নিয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। দু’দিনের মাথায় অর্থাৎ ১১ মে রাতে গ্রেফতার হয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু। পুরনিয়োগ দুর্নীতি মামলায় তদন্তে দক্ষিণ দমদম পুরসভায় বেআইনি ভাবে চাকরিপ্রাপকদের নাম সুপারিশ করার ঘটনায় তাঁকে ইডি তলব করেছিল। ওই তালিকায় কম বেশি ১৫০ জন চাকরিপ্রার্থীর নাম রয়েছে বলে ইডি সূত্রের খবর। সেই মামলাতেই গত সোমবার রাত সওয়া ৯টা নাগাদ বিধাননগর বিধানসভা কেন্দ্রের সদ্য-পরাজিত তৃণমূল প্রার্থীকে ইডি গ্রেফতার করে।

১৩ মে মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে গ্রেফতার হয়েছেন তৃণমূল কাউন্সিলর শান্তনু মজুমদার ওরফে মেজো। বহরমপুর পুরসভার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে তোলাবাজির অভিযোগ উঠেছিল। গ্রেফতার করে পুলিশ। পরের দিন অর্থাৎ গত ১৪ মে মুর্শিদাবাদ জেলাতেই আরও দু’জনকে গ্রেফতার করা হয় শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে। সে গ্রেফতারি সিবিআই কর্তৃক।

Advertisement

তবে ১৪ মে তারিখের সবচেয়ে ‘ওজনদার’ গ্রেফতারি জেলায় নয়, কলকাতাতেই। কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) শান্তনু সিংহ বিশ্বাসকে ১৪ তারিখ রাতে গ্রেফতার করে ইডি। সাড়ে ১০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। সোনা পাপ্পুর মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কালীঘাটের প্রাক্তন ওসি তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিশেষ আস্থাভাজন’ হিসাবে পরিচিত আধিকারিক শান্তনুকে একাধিক বার তলব করেছিল ইডি। কিন্তু তিনি বার বার হাজিরা এড়াচ্ছিলেন। ইডি সূত্রে খবর, শুধু সোনা পাপ্পু মামলা নয়, কলকাতা এবং দিল্লির দফতরে একাধিক মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শান্তনুকে তলব করা হয়েছিল। একটি মামলায় সমন পেয়ে তিনি কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থও হয়েছিলেন। অবশেষে গত বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা নাগাদ শান্তনু সিজিও কমপ্লেক্সে যান। রাত সাড়ে ৯টার পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পর পর হাজিরা এড়ানোয় শান্তনুর বিরুদ্ধে লুক আউট নোটিস জারি করেছিল ইডি। তিনি যাতে দেশ ছেড়ে চলে যেতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন তদন্তকারী আধিকারিকেরা। সূত্রের খবর, সোনা পাপ্পু এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে শান্তনুর কিছু আর্থিক লেনদেনের যোগ পাওয়া গিয়েছে। আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে ধৃত ব্যবসায়ী জয় কামদারের কাছ থেকে পাওয়া নথিতেও শান্তনুর যোগ ছিল। প্রসঙ্গত, গত মাসেই সোনা পাপ্পুর মামলার সূত্রে ফার্ন রোডে শান্তনুর বাড়িতে হানা দিয়েছিল ইডি। ভোর থেকে শুরু হয়েছিল অভিযান। শেষে রাত ২টো নাগাদ ডিসিপির বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন তদন্তকারী আধিকারিকেরা। ওই অভিযান চলাকালীনও শান্তনুকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।

গত ১৭ মে পুলিশ দুই জেলায় পাঁচ জনকে গ্রেফতার করে দুর্নীতির অভিযোগে। তোলাবাজির অভিযোগে নদিয়ার কৃষ্ণনগর-১ পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ স্মরজিৎ বিশ্বাস গ্রেফতার হন। কোচবিহার জেলার দিনহাটায় প্রাক্তন পুরপ্রধান গৌরীশঙ্কর মাহেশ্বরী গ্রেফতার হন ঘুষ নিয়ে নকল বিল্ডিং প্ল্যান পাশ করানোর অভিযোগে। সে মামলায় গৌরীশঙ্কর ছাড়াও গ্রেফতার করা হয় মৌমিতা ভট্টাচার্য নামে এক পুরকর্মীকে, যিনি আবার তৃণমূলের স্থানীয় যুবনেত্রী। কোচবিহারেরই ঘুঘুমারিতে পুলিশ গ্রেফতার করে তৃণমূলের আরও দু’জনকে। একজন বুথ সভাপতি প্রতাপচন্দ্র চন্দ, আর এক জন পঞ্চায়েত সদস্যা সেলিনা খাতুন। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল আবাস যোজনায় কাটমানি নেওয়ার।

১৮ মে অর্থাৎ সোমবারও সে পরম্পরা অব্যাহত। আসানসোলের তৃণমূল নেতা তথা আইএনটিটিইউসির ব্লক সভাপতি রাজু অহলুওয়ালিয়াকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে তোলোবাজির অভিযোগে। এর আগেই রাজুর তিন শাগরেদকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

ভোটের আগে থেকে নিখোঁজ থাকা সোনা প্পাপুও শেষ পর্যন্ত সোমবার হাজির হয়েছেন ইডি দফতরে। বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ বিধাননগর সিজিও কমপ্লেক্সে ইডি দফতরে তিনি হাজির হন। দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা জেরার পর রাতে তাঁকে গ্রেফতার করে ইডি।

অর্থাৎ কলকাতা থেকে জেলা, রাজ্য জুড়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে মাঠে নেমে পড়েছে প্রশাসন। রাজ্যের পুলিশ থেকে কেন্দ্রের ইডি, সিবিআই, একযোগে সক্রিয় বিভিন্ন সংস্থা। তোলাবাজির অভিযোগ থেকে নিয়োগ দুর্নীতি, নকল বিল্ডিং প্ল্যান পাস করানো থেকে আবাস যোজনায় কাটমানি নেওয়ার অভিযোগ, ছাড় পাচ্ছে না কোনও কিছুই। সরকার গঠনের প্রথম ১০ দিনেই রাজ্য সরকার আসলে দু’টি বার্তা দিতে চেয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। প্রথমত, দুর্নীতিমুক্ত পশ্চিমবঙ্গের প্রতিশ্রুতি রূপায়ণে নতুন সরকার বদ্ধপরিকর। দ্বিতীয়ত, শুধু পুলিশ নয়, নতুন জমানায় কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলিও বিনা বাধায় কাজ করবে পশ্চিমবঙ্গে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement