ক্যান্টিনের খাবার পরিদর্শনে ডিআরএম। আদ্রায় বুধবার। —নিজস্ব চিত্র।
ট্রেনে যাত্রীদের সমস্যা দেখতে গিয়ে বছর পাঁচেকের এক শিশুর কাছে ডিআরএমকে শুনতে হল, কামরায় আলো নেই, পাখাও ঠিক ভাবে চলে না।
সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যা। ঘটনাস্থল আদ্রা স্টেশন। ওই শিশুটির মায়ের কাছে ডিআরএম শুনলেন, স্টেশন থেকে কেনা ইডলি বিস্বাদ। এই সব শুনে সরাসরি দক্ষিণ-পূর্ব রেলের আদ্রা ডিভিশনের এই শীর্ষ কর্তা ছুটলেন স্টেশনের ক্যান্টিনে। ইডলি, সম্বর, চাটনির পাত্র খুলিয়ে যাচাই করলেন অভিযোগের সারবত্তা। নির্দেশ দিলেন খাবারের মান ঠিক করতে। মঙ্গলবার সকালেই ট্রেনে চেপে আদ্রা থেকে পুরুলিয়া গিয়ে যাত্রীদের অভাব অভিযোগ শুনেছিলেন ডিআরএম। আর সন্ধ্যায় এই ভাবেই আদ্রা স্টেশনে ঘুরে, ট্রেনের কামরায় বসে থাকা যাত্রীদের কাছ থেকে সমস্যার কথা শুনলেন ডিআরএম অনশুল গুপ্ত। পরে তিনি বলেন, ‘‘যাত্রীদের কাছ থেকে সমস্যা শুনে সেই বিষয়গুলি শোধরানোর জন্য কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’’
মঙ্গলবার ২৬ মে থেকে ভারতীয় রেলে শুরু হয়েছে ‘রেলযাত্রী গ্রাহক পক্ষ’। চলবে ৯ জুন পর্যন্ত। রেলমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী, এই পনেরো দিন ধরে ট্রেনে ও স্টেশনে যাত্রীদের কাছ থেকে তাদের সমস্যার কথা সরাসরি শুনবেন রেলের আধিকারিকেরা। সেই মতো যে সমস্যার সমাধান আধিকারিকদের পক্ষে করা সম্ভব, সেগুলি দ্রুত করতে হবে তাঁদের। সেই কর্মসূচিরই অঙ্গ হিসাবে আদ্রার ডিআরএম মঙ্গলবার কার্যত দিনভর ঘুরলেন ট্রেনে ও স্টেশনে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ছটা নাগাদ সিনিয়র ডিসিএম মানস রঞ্জন আচারিয়া-সহ কয়েক জন পদস্থ কর্তাকে নিয়ে আদ্রা স্টেশনে আসেন ডিআরএম। তিন নম্বর প্ল্যাটফর্ম ঘুরে ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা কয়েক জন যাত্রীর জটলার সামনে গিয়ে সরাসরি জানতে চান, স্টেশনের সমস্যার বিষয়ে। ওমপ্রকাশ, সত্য যাদব নামের দুই যাত্রী বলেন, ‘‘স্টেশনে শৌচালয়গুলি রয়েছে একেবারে প্রান্তে। কিন্তু যাত্রীরা দাঁড়িয়ে থাকেন স্টেশনের মাঝে। একটি শৌচালয় স্টেশনের মাঝামাঝি জায়গায় থাকলে মহিলা ও শিশুদের সুবিধা হয়।” প্রচণ্ড গরমে স্টেশনে ঠান্ডা জল মেলে না বলেও ডিআরএমের কাছে অভিযোগ জানান ওই যাত্রীরা।
আপ্ত সহায়ককে সমস্যা ও অভিযোগগুলি লিখে নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে ডিআরএম যান চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে। দাঁড়িয়ে থাকা আসানসোল-খড়গপুর প্যাসেঞ্জারের একটি কামরার সামনে দাঁড়িয়ে ভিতরে থাকা যাত্রীদের কাছে সমস্যা শুনতে চান তিনি। সেই সময়েই বছর পাঁচেকের ওই শিশু বলে, ‘‘আঙ্কল কামরায় আলো নেই। সব পাখা ঠিক ভাবে চলছে না।” শিশুটির মায়ের হাতে ইডলির প্লেট দেখে তাঁর কাছে ডিআরএম জানতে চেয়েছিলেন, খাবারের মান কেমন। ওই মহিলা বলেন, ‘‘ইডলিগুলো ঠান্ডা ও শক্ত হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে সকালে তৈরি করা খাবার এখনও বিক্রি করা হচ্ছে।”
বস্তুত, সন্ধ্যার দিকে আদ্রা স্টেশনের খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে যাত্রীদের। আর সেটাই পরিদর্শনে গিয়ে শুনতে হল ডিআরএমকে। তবে, ডিআরএম যেটা দেখলেন না, তা হল, গোমো-চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জারের কামরায় ডাঁই করে রাখা সব্জির বস্তা। কামরার মধ্যেই ছড়িয়ে থাকা কয়লার গুঁড়ো। যা আবার ট্রেন চললেই হাওয়ায় উড়ে এসে পড়ে যাত্রীদের চোখে-মুখে। কিছু যাত্রী আরও বললেন, ‘‘ডিআরএম স্টেশনের জলের কলগুলো পরীক্ষা করলেই বুঝতে পারতেন জলের সমস্যা ঠিক কতটা আদ্রা স্টেশনে!”
রেল সূত্রের খবর, এই ১৫ দিন রেলের তরফে বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে সচেতনতা প্রচার চালানো হবে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ডিআরএমের উপস্থিতিতে তিন ও চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের মাঝে ‘‘বল হরি-হরি বল” নামের পথ নাটিকায় আদ্রার রেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের কর্মীরা কর্মীরা তুলে ধরেন, এক শ্রেণির নিত্য যাত্রীদের উপদ্রবে কী ভাবে হয়রানির মধ্যে পড়তে হয় সাধারণ যাত্রীদের। পরে সাংবাদিকদের ডিআরএম বলেন, ‘‘বেশির ভাগ সময়েই যাত্রীদের মতামত না নিয়ে স্টেশনে শৌচালয় তৈরি করা, জলের কল বসিয়ে দেওয়া, ওভারব্রিজ তৈরি করা দেওয়া হয়। যাত্রীদের স্বার্থে সেগুলি করা হলেও পরে দেখা যায় যাত্রীরাই সমস্যায় পড়ছেন। রেল মন্ত্রক চাইছে যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে মতামত নিয়ে এই ধরনের কাজগুলি রূপায়ণ করতে। তাই সরাসরি যাত্রীদের কাছ থেকে পরিষেবা ও সমস্যা নিয়ে মতামত জানতে চাওয়া হচ্ছে।’’
একই সঙ্গে তাঁর আশ্বাস, ‘‘আমাদের পক্ষে যে সমস্যা সমাধান করা সম্ভব, সেগুলি দ্রুত করা হবে।” এ ছাড়া, আগামী এক বছরের মধ্যে আদ্রা ডিভিশনের বোকারো স্টেশনে যাত্রীদের সুবিধার্থে লিফ্ট এবং চলন্ত সিঁড়ি (এসক্যালেটর) তৈরি করা হবে বলেও জানিয়েছেন ডিআরএম।