গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
সকাল পৌনে ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে চার তৃণমূল সাংসদ, দুই মন্ত্রী এবং আরও কয়েক জন প্রথম সারির নেতাদের গলা দিয়ে যেন আওয়াজই বেরোচ্ছিল না! উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা খেলে যাচ্ছিল তাঁদের কথায়। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ১২টা পেরোতেই সেই নিস্তেজ কণ্ঠগুলিতেই ‘দম’ ফিরে এল। ফিরিয়ে আনলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কারণ, তিনি স্বমহিমায় চেনা মাঠে নেমে পড়েছেন।
তৃণমূল তথা রাজ্য সরকারের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়ি এবং সংস্থার সল্টলেকের দফতরে ইডির অভিযানের পাল্টা অভিযান চালালেন ‘দিদি’। মুখ্যমন্ত্রী মমতা আরও একবার বিরোধী নেত্রীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। যা তাঁর আজীবনের মাঠ। যা তাঁর রাজনৈতিক উত্থানেরও ‘পুঁজি’। শুধু নিজে নামলেন না, নামিয়ে দিলেন গোটা তৃণমূলকেই। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা কলকাতা থেকে সল্টলেক ইডির সঙ্গে সম্মুখ সমরের পরে ঘোষণা করে দিলেন, শুক্রবার ফের তিনি রাস্তায় নামবেন। মিছিল করবেন যাদবপুর থেকে হাজরা মোড় পর্যন্ত।
ঘটনাচক্রে, বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন যাদবপুর কেন্দ্র থেকেই ১৯৮৪ সালে প্রথম সাংসদ হয়েছিলেন মমতা। মিছিল যেখানে শেষ হবে, সেই হাজরা মোড়ের একটি দিক ভবানীপুর বিধানসভার অন্তর্গত। যা মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিধানসভা কেন্দ্র।
বৃহস্পতিবার সল্টলেকের আইপ্যাক দফতর থেকে বেরিয়েই মমতা ঘোষণা করে দেন, বৃহস্পতিবার বিকালেই রাজ্যের সব ব্লকে, সব পাড়ায় প্রতিবাদ মিছিল করতে হবে। মমতা সেই ঘোষণা করার আগেই অবশ্য হাজরা মোড়ে লোকলস্কর জুটিয়ে, হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে দেন কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়। মমতার ঘোষণার পরে দেখা যায় জেলায় জেলায় মিছিল করছে তৃণমূল। নেত্রী নিজে মাঠে নেমে পড়ায় নেতারাও নেমে পড়েন। মানিকতলায় দীনেন্দ্র স্ট্রিটে তৃণমূলের মিছিলে দেখা যায় হুইলচেয়ারে বসেই যোগ দিয়েছেন দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। হাতে ধরা প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘ইডি-সিবিআইয়ের কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও।’
তৃণমূলের অনেকের বক্তব্য, এসআইআর পর্ব থেকেই বিজেপি তথা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরোধিতায় ক্রমাগত সুর চড়াচ্ছিলেন মমতা। নেমেছিলেন রাস্তাতেও। প্রতীকের বাড়ি এবং আইপ্যাকের দফতরে ইডির হানার পরে সেই বিরোধিতার সুর আরও উঁচু স্বরে বাঁধলেন তৃণমূলের নেত্রী। বিরোধী নেত্রী মমতার আন্দোলনের ‘ঝাঁজ’ সম্পর্কে রাজ্য এবং জাতীয় রাজনীতি ওয়াকিবহাল। মুখ্যমন্ত্রী হয়েও গত দেড় দশকে নানা ঘটনায় সেই অনুশীলন জারি রেখেছেন তিনি। বিধানসভা ভোটের প্রাক্কালে যা আরও এক বার দেখা গেল বৃহস্পতিবার। মমতার ঘনিষ্ঠদের মতে, রাস্তাই তাঁর আন্দোলনের স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গা। তাঁর দলের প্রতীক না বদলেও নতুন ‘প্রতীকে’ সেই রাস্তাতেই নামলেন তিনি। নামালেন গোটা দলকেও। দলের সংগঠন এবং কার্যকলাপে আইপ্যাকের ‘নিয়ন্ত্রণ’ নিয়ে জেলাস্তরের অনেক তৃণমূল নেতাই একান্ত আলোচনায় ক্ষোভ গোপন করেন না। প্রতীকের বাড়িতে ইডি হানায় সেই সমস্ত নেতাদের অনেকেই ঘনিষ্ঠমহলে উচ্ছ্বাস দেখিয়েছিলেন বৃহস্পতিবার সকালে। কিন্তু নেত্রী রাস্তায় নেমে পড়ায় তাঁদেরও কিছুটা বাধ্য হয়েই নামতে হয়েছে।
অনেকেই বলেন, মমতা বরাবরই ‘বিশুদ্ধ’ বিরোধী নেত্রী। লড়াইয়ের জন্য তাঁর সামনে একটি প্রতিপক্ষ থাকা খুব জরুরি। এসআইআরের জন্য আন্দোলনে নেমে কেন্দ্রীয় সরকার তথা বিজেপিকে সেই প্রতিপক্ষ ধরে নিয়ে মমতা বিধানসভা নির্বাচনের জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। বৃহস্পতিবারের ঘটনা সেই বিরোধিতাকে আরও ‘ধারাল’ করবে বলেই অনেকের অভিমত। পাশাপাশি অনেকের বক্তব্য, মমতা বলতে পারবেন, তিনি কেন্দ্রীয় সরকার তথা বিজেপির ‘স্বৈরাচারের শিকার’।
মমতা যেমন নিজে রাস্তায় নেমে গোটা তৃণমূলকে রস্তায় নামিয়ে দিয়েছেন ঠিক তেমনই আই প্যাক কর্তার বাড়িতে ইডি হানা নিয়ে সরব হয়েছেন অন্য বিরোধী দলের নেতারাও। সার্বিক ভাবে সর্বভারতীয়স্তরে বিজেপি বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র সব দলের নেতারা মুখ না খুললেও দু’জন সরব হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব। নিজের এক্স হ্যান্ডলে অখিলেশ লিখেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে যে বিজেপি যে হারতে চলেছে এটা (প্রতীক জৈনের বাড়িতে ইডির হানা) তার প্রথম নমুনা।’ সরব হয়েছেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা অভিষেক মনু সিংভীও।
লাউডন স্ট্রিটে প্রতীকের বাড়িতে ইডি তল্লাশির মধ্যেই বেলা ১২টা নাগাদ সেখানে পৌঁছোন মমতা। মিনিট দশেকের মধ্যেই একটি সবুজ রঙের ফাইল, হার্ড ডিস্ক এবং একটি মোবাইল ফোন নিয়ে বেরিয়ে এসে মমতা দাবি করেন, বিধানসভা ভোটের প্রার্থীতালিকা বাজেয়াপ্ত করতে এসেছে ইডি। তিনি তা উদ্ধার করেছেন। কড়াভাষায় মমতা আক্রমণ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে। লাউডন স্ট্রিট থেকে মমতা সোজা চলে যান সল্টলেকের আইপ্যাক দফতরে। পৌঁছে দেখেন প্রবেশ এবং প্রস্থানের দু’টি দরজাই ‘সিল’ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। সময় নষ্ট না-করে বিরোধী নেত্রীর মেজাজ নিয়েই বেসমেন্টে গাড়ি থামিয়ে লিফ্ট বেয়ে চলে যান ১২ তলায় আইপ্যাকের অফিসে।
পরে দেখা যায়, মমতার নিরাপত্তারক্ষীরা ফাইলের গোছা এনে তাঁর গাড়ির পিছনের আসনে ডাঁই করে রাখেন। সে গাড়ি ঘিরে থাকে বিধাননগর কমিশনারেটের বাহিনী। প্রায় এক ঘণ্টা পরে মমতা বেসমেন্টে ফিরে এসে বলেন, ‘‘ভোটের স্ট্র্যাটেজি ছিনতাই করেছে! আমাদের কাগজ, তথ্য সব লুট করেছে! লড়াই করার সাহস হচ্ছে না। তাই এখন লুট করতে নেমেছে। হার্ড ডিস্ক, অর্থনৈতিক কাগজ, পার্টির কাগজ নিয়ে নিয়েছে। টেবিলগুলো সব ফাঁকা পড়ে রয়েছে। বিজেপির মতো এত বড় ডাকাত দেখিনি।’’
পৌনে ২টো নাগাদ আবার উপরে আইপ্যাকের দফতরে যান মমতা। বিকাল সাড়ে ৪টে নাগাদ বেরিয়ে যান সেখান থেকে। তার আগেই প্রতীকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় ইডির দল। মমতা বেরিয়ে যাওয়ার পরে আইপ্যাকের দফতরে তল্লাশিরত কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দলটিও বেরিয়ে যায়। তবে সকালে নিরুপদ্রবে আইপ্যাকের অফিসে ঢুকলেও বেরোনোর সময়ে স্থানীয় তৃণমূলকর্মীদের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় ইডি আধিকারিকদের। শুনতে হয়, ‘বিজেপির দালাল’, ‘গো ব্যাক’ স্লোগান।
তৃণমূলের এক প্রবীণ নেতার কথায়, ‘‘সংখ্যার পরে অনেক শূন্য দেখতে ভাল লাগে। কিন্ত শূন্যের আগে একটা সংখ্যা থাকতে হয়। তবেই তার মূল্য থাকে। আজ নেত্রী হিসাবে নিজেকে সেই সংখ্যার মতো করে তুলে ধরলেন মমতা। যার ফলে শূন্যগুলোও দেখতে ভাল লাগছে।’’ ইতিমধ্যেই তদন্তের মাঝে মমতার অভিযান এবং ফাইলপত্র নিয়ে বেরিয়ে আসা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইডি হাই কোর্টে মামলা করেছে। কিন্তু তৃণমলের অনেকেরই বক্তব্য, মমতা যা করেছেন জেনেশুনেই করেছেন। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজেকে ‘এক এবং অদ্বিতীয়’ হিসাবে তুলে ধরেছেন তিনি।
একটা সময়ে মমতার রাজনীতির ‘মতাদর্শ’ ছিল সিপিএম বিরোধিতা। এখন সিপিএম একেবারেই প্রান্তিক শক্তি। কিন্তু তিনি নতুন রাম এবং নতুন অযোধ্যা পেয়ে গিয়েছেন। তাঁর ‘ট্রেডমার্ক’ বিরোধী আন্দোলনের আধার হয়ে উঠেছে বিজেপি। শিবির বদলে গেলেও মমতা আছেন মমতাতেই। যে মমতার কাছে রাস্তাই রাস্তা। সেই রাস্তায় দৌড় তিনি শুরু করে দিয়েছেন।