প্রতীকী ছবি।
ছেলে, ছেলের বৌ আর পোষ্যের সঙ্গে মস্ত ফ্ল্যাটে থাকার জায়গা কম পড়ায় মায়ের ঠিকানা হয় বৃদ্ধাশ্রম। এই হৃদয়হীন বাস্তবতা ধরা আছে জনপ্রিয় গানে। প্রশ্ন উঠছে, এই রাজ্যের বৃদ্ধাশ্রমগুলিতে প্রবীণেরা নির্ঝঞ্ঝাটে থাকতে পারছেন কি?
স্ত্রী ক্যানসারের রোগী। স্বামীর বাইপাস সার্জারি হয়েছে। এমন এক বৃদ্ধ দম্পতি চন্দননগরের একটি বৃদ্ধাবাসে ঠাঁই নিয়েছিলেন দু’লক্ষ টাকা জমা দিয়ে। সেই সঙ্গে মাসে তাঁদের দিতে হতো ৯৫০০ টাকা।
কিছু দিন পরে বৃদ্ধাবাসের মালিক জানান, একসঙ্গে আরও ১০ লক্ষ টাকা দিতে হবে। এক দফায় অত টাকা দিতে না-পারলেও ওই দম্পতি প্রায় ছ’লক্ষ টাকা দেন এবং প্রতি মাসে মাসে ১৩ হাজার ৫০০ টাকা দিতে শুরু করেন। অভিযোগ, নতুন চুক্তি মানেননি বৃদ্ধাশ্রমের মালিক। উল্টে নানা রকম চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। পরে হুমকি দিতে শুরু করেন। ওই দম্পতি শেষ পর্যন্ত সেই বৃদ্ধাবাস ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন গত বছরের অগস্টে। মাসের খরচের বাইরে বৃদ্ধাবাসের মালিককে দেওয়া মোট আট লক্ষ ৯০ হাজার টাকা ফেরত পাননি তাঁরা।
নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ দফতরের এক আধিকারিক জানান, রাজ্যে বৃদ্ধাবাসগুলি কী ভাবে চলবে, সেই ব্যাপারে বিধিবদ্ধ নির্দেশিকা বা নিয়ামক সংস্থা নেই। সেই সুযোগেই বহু বৃদ্ধাবাসের কর্তৃপক্ষ প্রবীণদের উপরে কার্যত নিপীড়ন চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ তুলে কলকাতা হাইকোর্টে ৬ মার্চ একটি জনস্বার্থ মামলা রুজু হয়েছে। ‘প্রবীণ নাগরিক অধিকার রক্ষা মঞ্চ’-এর তরফে মামলাটি করেছেন বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায়। বিভিন্ন বৃদ্ধাশ্রমে প্রবীণদের দুর্দশা রুখতে রাজ্য সরকার যাতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়, সেই নির্দেশ দেওয়ার জনেয আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
সমাজকল্যাণ দফতরের হিসেবে, রাজ্যে সরকারি বৃদ্ধাবাস মাত্র একটি। ২৯টি বৃদ্ধাবাস সরকারি অনুদান পায়। তবে সেগুলি সরকারি ভাবে নথিভুক্ত নয়, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার নামে নথিভুক্ত। কিন্তু এর বাইরেও চলছে বহু বেসরকারি বৃদ্ধাবাস, যার হিসেব কার্যত সরকারের কাছে নেই।
মামলার আবেদনে জানানো হয়েছে, বৃদ্ধাবাসগুলি অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণদের দুর্দশার কারণ হয়ে উঠেছে। প্রবীণদের সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন, চিকিৎসার মতো পরিষেবা দেওয়ার কথা বলে তারা টাকা নেয়। কিন্তু পরে কথার খেলাপ করে। অসুস্থ হলে চিকিৎসার বন্দোবস্ত করে না। ঘরে একটা টেলিভিশন সেট পর্যন্ত রাখে না। চুক্তি অনুযায়ী টাকা নেওয়ার পরেও নানা ছুতোয় বাড়তি টাকা দাবি করে। কেউ প্রতিবাদ করলে ন্যূনতম পরিষেবাটুকুও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বিশ্বজিৎবাবুর আইনজীবী সুমন্ত বিশ্বাস বলেন, ‘‘আমার মক্কেল মামলার আবেদনে বলেছেন, বৃদ্ধাবাসগুলি কী ভাবে তৈরি হবে ও চলবে, কী ধরনের পরিষেবা দেবে, সরকার তার মান ঠিক করে দিয়ে নির্দেশিকা জারি করুক।’’ সেই সঙ্গে বিশ্বজিৎবাবুর দাবি, সরকারকেও আরও বেশি সংখ্যায় বৃদ্ধাবাস তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। প্রথমে জেলা-পিছু একটি বৃদ্ধাবাস গড়া হোক, যার প্রতিটিতে অন্তত দেড়শো প্রবীণ মানুষ থাকতে পারবেন।