—প্রতীকী চিত্র।
সিন্ডিকেট আছে আগের মতোই। তাদের নিজেদের মধ্যে লড়াইও আছে। কিন্তু সে লড়াই প্রকাশ্যে দেখা যায় না সব সময়ে। কারণ, লড়াই সব সময়ে বোমা-গুলির হয় না। সিন্ডিকেট যেমন আছে, তেমনই আছেন তাদের প্রশ্রয়দাতা বা বলা ভাল, সুবিধাভোগী নেতা-দাদারা। সকলেই প্রায় শাসকদলের। বিরোধীদের অভিযোগ তেমনই। যদিও শাসকদলের দাবি, এ সব মিথ্যা প্রচার। বিধাননগর, নিউ টাউন ও রাজারহাট জুড়ে থাকা তিনটি বিধানসভা কেন্দ্র এলাকায় বিরোধী ও শাসকদলের কাজিয়া নতুন নয়। হাওড়ার পিলখানায় প্রকাশ্যে এক প্রোমোটারকে গুলি করে খুনের ঘটনার সূত্রে বিধাননগরে সিন্ডিকেটের পুরনো বিতর্কই ফের মাথাচাড়া দিয়েছে।
এক সময়ে নিউ টাউন ‘সিন্ডিকেট পাড়া’ নামেই পরিচিত ছিল। বাম আমলে শুরু হওয়া সিন্ডিকেট ব্যবস্থার বাড়বাড়ন্ত দেখা যায় তৃণমূলের জমানায়। সিন্ডিকেটের দাপটে তটস্থ থাকতেন নির্মাণ ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে দাপট না কমলেও তাদের কাজের ধরন বদলেছে বলে শোনা যায়। তবে, রাজনৈতিক বিবাদ থামেনি। রাজারহাট-নিউ টাউনে এখনও কান পাতলে শোনা যায়, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সঙ্গে থাকলে তবেই কাজ মিলবে, নয়তো মিলবে না।
রাজারহাট ও বিধাননগর এলাকার তিন প্রভাবশালী নেতা, সুজিত বসু, সব্যসাচী দত্ত এবং তাপস চট্টোপাধ্যায়। তাঁদের নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক সুবিদিত। সেই সমীকরণ এলাকার সিন্ডিকেট ব্যবসার উপরেও সরাসরি প্রভাব ফেলে বলেই অভিমত অনেকের।বিরোধী দল থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নিত্যদিন এখন আর গোলমাল হয় না। তবে, ওই ‘দাদাদের’ ক্ষমতার ভারসাম্যে বদল ঘটলে সমস্যা তৈরি হয়। অতীতে বার বারই তা ঘটেছে। যদিও রাজারহাট-নিউ টাউনের বিধায়ক তাপসের দাবি, কোনও গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নেই। তৃণমূল ঐক্যবদ্ধ ভাবেই লড়াই করছে। বিরোধীদের অভিযোগ, বেআইনি নির্মাণ, জলাশয় ভরাট, দোকান বসানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাতে বিপুল ‘প্রণামী’ আদায় চলছে নানা স্তর থেকে।
বেআইনি নির্মাণ নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন খোদ তৃণমূলের বারাসত সাংগঠনিক জেলার চেয়ারপার্সন সব্যসাচী দত্ত। যা এখনও আদালতের বিচারাধীন। জলাশয় ভরাট নিয়েও মামলা হয়েছে একাধিক। এই তথ্যই প্রমাণ করে যে, সমস্যা রয়েই গিয়েছে। বিজেপি নেতা দেবাশিস জানার অভিযোগ, এলাকার বিভাজন করে আপাত ভাবে দ্বন্দ্ব থামানো হলেও সিন্ডিকেট একই ভাবে বর্তমান। তাই কোথাও ভরাট করা হচ্ছে জলাশয়, কোথাও উঠছে বেআইনি বহুতল। বাসিন্দাদের অভিযোগ, এত বহুতল তৈরি হচ্ছে, পাল্লা দিয়ে জনসংখ্যাও বাড়ছে। অথচ, পরিকাঠামো সেই তিমিরেই। কোনও এলাকায় আবার কান পাতলে শোনা যায়, যত তল (বহুতলের ফ্লোর) তোলা হবে, তত টাকা দিতে হবে। বিজেপি নেতা অনুপম ঘোষ বা মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্যের অভিযোগ, নিয়মের কোনও তোয়াক্কাই কেউ করে না। অল্প জায়গায় কী ভাবে ২০-৩০ তলা বাড়ি উঠছে, তা সকলেরই জানা। এর ফলে জনবিন্যাসের পরিবর্তন ঘটছে। পরিকাঠামোর উপরে চাপ বাড়ছে বহু গুণ।
অভিযোগ উড়িয়ে তাপসের দাবি, ‘‘নিয়ম মেনেই যাবতীয় নির্মাণ হচ্ছে। কোথাও বিক্ষিপ্ত ভাবে বিধি ভাঙা হলে প্রশাসন পদক্ষেপ করছে। কর্মহীন কেউ ইমারতি দ্রব্য সরবরাহ থেকে প্রোমোটিং, যা খুশি করতেই পারেন। কিন্তু নিয়ম ভাঙলে বা দলকে ব্যবহারের চেষ্টা করলে রেয়াত করা হবে না। বিরোধীদের সেই বস্তাপচা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ চলছে।’’ কার্যত একই সুরে সব্যসাচী বলেন, ‘‘বেআইনি নির্মাণ ও জলা ভরাট নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী কঠোর মনোভাব প্রকাশ করে জানিয়েছিলেন, কাউকে রেয়াত করা হবে না। তা সত্ত্বেও কেউ বিধি ভেঙে থাকলে তিনি বুঝবেন ও প্রশাসন বুঝবে। এর মধ্যে দল নেই।’’
বামেদের অভিযোগ, এক দিকে বেআইনি নির্মাণ ও জলাশয় ভরাটের ঘটনা, অন্য দিকে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে রাজারহাট-গোপালপুর বা রাজারহাট-নিউ টাউন এলাকা ভুগছে। বিশেষত, রাজারহাট-গোপালপুরকে বিধাননগর পুরসভার সঙ্গে মেশানো হলেও পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়েছে বলে অভিযোগ। বিধাননগর পুরসভার কর্তাদের একাংশ জানান, অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে ওঠা রাজারহাট-গোপালপুরে নিকাশি, রাস্তা, পরিস্রুত পানীয় জল সরবরাহের পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে।
বিধাননগরের লেক টাউন, বাঙুর, সুকান্তনগর, কুলিপাড়া, মহিষবাথান ও নয়াপট্টির মতো একাধিক জায়গাতেও একই অভিযোগ শোনা যায়। যদিও তা পুরোপুরি খারিজ করে বিধায়ক তথা দমকলমন্ত্রী সুজিত বসুর দাবি, ‘‘বিধাননগর বিধানসভায় মস্তান-রাজ নেই, শান্তি রয়েছে। প্রতি বারই বিরোধীরা একই অভিযোগ তোলেন এবং নির্বাচনে কুপোকাত হন। মানুষ উন্নয়নের কথা ভাবে। উত্তর দেবে মানুষই। আমার বিরুদ্ধে বিরোধীরা কত কিছু করেও লাভ হয়নি। বিজেপির রাজ্যে কী হচ্ছে, দেখুন। এসআইআর প্রশ্নে মানুষ ওদের উচিত শিক্ষা দেবে।’’
ভোটের মুখে স্থানীয় বাসিন্দাদের আপাতত একটাই চাহিদা— এ বার যেন শান্তিতে, নির্বিঘ্নে তাঁরা ভোটটা দিতে পারেন। তা হলে সকলেই নিজেদের উত্তর পেয়ে যাবেন।
(শেষ)
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে