রক্ত চাই। বাসের গায়ে সেই পোস্টার।—নিজস্ব চিত্র।
রাজারহাটের বাসে-বাসে ঘুরছে সেই পোস্টার। একটা বাচ্চার প্রাণ বাঁচাতে প্রচুর রক্ত দরকার। যে কোনও গ্রুপের দাতারা এগিয়ে এলে ছোট্ট জীবনটা রক্ষা পেতে পারে।
শিশুটির রক্ত কিন্তু বিরল গ্রুপের নয়। শহরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা যে কোনও ব্লাড ব্যাঙ্কে গেলেই মিলতে পারে। তা হলে মরিয়া হয়ে বাসে পোস্টার মারতে হচ্ছে কেন?
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত বাচ্চাটির চিকিৎসা চলছে রাজারহাটের যে ক্যানসার হাসপাতালে, সেখানে বাইরের ব্লাড ব্যাঙ্কের রক্ত নেওয়া হয় না। যত ইউনিট দরকার, রোগীর বাড়ির তরফে তত জন দাতা আনতে হয়। ওঁদের রক্ত নির্দিষ্ট পরীক্ষা-মান উত্তীর্ণ হলে হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কে তা রাখা হয়, বিনিময়ে রোগীকে তার প্রয়োজনীয় রক্ত দেওয়া হয়। রোগীর গ্রুপ পজিটিভ হলে যে কোনও গ্রুপের দাতা আনলেই চলে। কিন্তু নেগেটিভ হলে ঠিক সেই গ্রুপেরই দাতা আনতে হবে। তা সে যে ভাবেই হোক না কেন।
পোস্টারের শিশুটি পজিটিভ গ্রুপের। তবু তার পরিবার অত দাতা জোগাড় করতে পারেননি। হাসপাতালে পৌঁছে দেখা গেল, এমন বহু রোগীর পরিজনেরা একই সমস্যায় পড়ে দিশেহারা। স্বামীর চিকিৎসা করাতে বাংলাদেশ থেকে এসেছেন এক বৃদ্ধা। এ দেশে কোনও আত্মীয়-বন্ধু নেই। এ দিকে বৃদ্ধের কুড়ি ইউনিট রক্ত চাই। কুড়ি জন দাতা কোথায় পাবেন? বীরভূমের এক লিউকেমিয়াগ্রস্ত শিশুর ৭০ ইউনিট দরকার। বাস ভাড়া করে গ্রাম থেকে ৭৬ জনকে আনা হয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকের স্বাস্থ্য বা রক্তের গুণমান পরীক্ষায় উতরোবে, সে গ্যারান্টি নেই।
তাই বাড়ির লোকের চিন্তারও শেষ নেই। এমন নিয়ম কেন?
কর্তৃপক্ষের দাবি, রোগীদের স্বার্থেই রক্ত নিয়ে এত সতর্কতা। ‘‘বাইরের রক্ত দিয়ে রোগীর অবস্থা খারাপ হলে দায় তো আমাদের উপরেই বর্তাবে।’’— বলছেন হাসপাতালের শীর্ষ কর্তা, চিকিৎসক মামেন চণ্ডী। আচমকা কারও রক্ত লাগলে হাসপাতাল দিয়ে দেয়। তবে যত দ্রুত সম্ভব বাড়ির লোককে সেই ‘ঋণ’ মেটাতে হয়। যাঁরা অন্য রাজ্য বা দেশ থেকে আসছেন, তাঁরা কী করবেন?
মামেন চণ্ডীর জবাব, ‘‘কলকাতা খুবই সহৃদয় শহর। এখানে অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রক্তের বন্দোবস্ত করে।’’ ওঁদের হাসপাতাল অবশ্য সেই সব সংগঠনের ঠিকানা বা ফোন নম্বর রোগীর পরিবারকে জোগায় না।
অতএব অশেষ ভোগান্তি। বস্তুত কলকাতার বিভিন্ন বড় হাসপাতালেও বাইরের ব্লাড ব্যাঙ্কের রক্ত নেওয়া হয় না। আবার তাদের নিজস্ব ভাঁড়ারেও সব সময় পর্যাপ্ত রক্ত থাকে না। সেখানেও সব দায় গিয়ে পড়ে রোগীর পরিজনের ঘাড়ে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, ক্যানসার রোগীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এমনিতেই খুব কম। তাই বাইরের রক্ত অনেকে নিতে চান না। কিন্তু পরিবারের অবস্থা বিবেচনা করে কিছু ক্ষেত্রে নিয়ম শিথিল করা জরুরি। ‘‘যাঁর লোকবল নেই, কিংবা ভিন রাজ্য বা বিদেশ থেকে এসেছেন, তিনি কী করবেন? রক্ত জোগাড় না-হলে চিকিৎসা হবে না?’’— প্রশ্ন ক্যানসার-চিকিৎসক সুবীর গঙ্গোপাধ্যায়ের। আর এক ক্যানসার-চিকিৎসক গৌতম মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘যেখানে জীবন-মরণের প্রশ্ন, সেখানে নিয়মে জোর না-দিয়ে আগে রক্তের ব্যবস্থা করা উচিত।’’ রক্ত সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য অপূর্ব ঘোষ কিংবা রক্তদান আন্দোলনের কর্মী দীপঙ্কর মিত্রেরাও বলছেন, ‘‘মুমূর্ষু রোগীর পরিবার চিকিৎসার টাকা জোগাড় করবেন, একই সঙ্গে রক্তদাতাও খুঁজে বেড়াবেন? এ হয় নাকি!’’ রক্ত-সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেলে এই দুর্দশা হতো না বলে ওঁদের আক্ষেপ।
সমস্যার অন্য দিকও আছে। যেমন অপূর্ববাবুর অভিযোগ, ‘অনেক সময়ে নিজেদের ব্লাড ব্যাঙ্কে রক্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও বহু হাসপাতাল দাতা জোগাড় করতে চাপ দেয়। কারণ, তারাও ব্যবসা করে।’’ কী রকম?
অপূর্ববাবুর ব্যাখ্যা, ‘‘এখন হোল ব্লাড দেওয়া হয় না। এক ইউনিট হোল ব্লাড থেকে আরবিসি, প্লেটলেটস, ক্রায়ো, ফ্রোজেন প্লাজমা ইত্যাদি পাওয়া যায়। বাড়ির লোক হন্যে হয়ে দাতা জোগাড় করে আনল। তার রক্ত নিয়ে উপাদান বার করে অন্যদের বেচে হাসপাতাল পকেট ভরাল!’’
বেসরকারি হাসপাতালের কর্তারা যদিও অভিযোগ উড়িয়ে দিচ্ছেন। ওঁদের যুক্তি— নিজস্ব ব্যাঙ্কে রক্ত থাকলে রোগীকে দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁদের রক্তদান শিবির আয়োজনের অনুমতি নেই। ফলে রোগীর বাড়ির লোক দাতা না-আনলে রক্ত জোগাড় হবে কী ভাবে? কলকাতার এক হাসপাতালের সিওও রূপক বড়ুয়া বলেন, ‘‘এখানে তিন মাস অন্তর কর্মীদের থেকে রক্ত নিয়ে স্টক বানানো হয়। দাতা না-মিললেও হাত গুটিয়ে বসে থাকি না। ক’দিন আগে রাতের বেলা একটা বাচ্চার হঠাৎ রক্ত দরকার পড়েছিল। বাড়ির লোক জোগাড় করতে পারেননি। শেষে আমাদের এক সিকিওরিটি গার্ড রক্ত দিলেন।’’ আর এক হাসপাতাল-কর্তা কুণাল সরকার জোর দিচ্ছেন সঠিক সমন্বয় ও পরিকল্পনায়। ‘‘হয়তো কারও দু’ইউনিট বি পজিটিভ রক্ত চাই। এ দিকে হয়তো একই দিনে কোনও ব্লাড ব্যাঙ্ক দু’ইউনিট বি পজিটিভ ফেলে দিচ্ছে। খবরটা জানা থাকলে তা কাজে লেগে যেত!’’— মন্তব্য কুণালবাবুর। তাঁর পর্যবেক্ষণ, ‘‘সেন্ট্রাল রেজিস্ট্রি থাকলে সেখানে সব তথ্য থাকবে। বর্তমান প্রযুক্তিতে এটা করা কিছুই নয়। দরকার শুধু সদিচ্ছা।’’
স্বাস্থ্যকর্তাদের কী বক্তব্য?
রাজ্য রক্ত সঞ্চালন পর্ষদের শীর্ষ কর্তা ওঙ্কার সিংহ মিনা বলেন, ‘‘ড্রাগ কন্ট্রোল আইন মোতাবেক সরকারি মেডিক্যাল কলেজ, ব্লাড ব্যাঙ্ক বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি রক্তদান শিবির করতে পারে। এর পরিধি বাড়াতে কেন্দ্রীয় স্তরে ভাবনা-চিন্তা চলছে।’’