—প্রতীকী চিত্র।
রোগী পিছু দৈনিক বরাদ্দ ৫৬ টাকা ৬৪ পয়সা। প্রায় আট বছর ধরে। তাতেই দিনে তিন বারের খাবার। ফলে থালায় কলের জলের মতো গড়িয়ে যায় ডাল। জলের মতো ট্যালটেলে লাগে দুধও। মাছের টুকরো জোটে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র। কোথাও আবার দুধ, কলা, ডিমের বদলে মুড়ি, মিষ্টি দিয়েই চালিয়ে নেওয়া হয়।
দিনের পর দিন এটাই রাজ্যের সরকারি হাসপাতালের রোগীদের খাবারের হাল। শহরে কোনও মতে টানাটানি করে চললেও জেলার অবস্থা কহতব্য নয়। শহরের বেসরকারি হাসপাতালে বরাদ্দ ৪০০-৫০০ টাকার কথা ছেড়ে দিন। রোগী পিছু দিল্লি এমসের বরাদ্দ ২৬৭ টাকা, অন্যান্য রাজ্যে সরকারি হাসপাতালের জন্য ধার্য ১৫০-২০০ টাকা। ভোটের আগে রাজ্য শ্রম দফতর পর্যন্ত ইএসআই হাসপাতালের জন্য ১৬৭ টাকা করে দরপত্র ডেকেছে। পূর্বতন জমানায় দফায় দফায় বেড়েছে পুজোর অনুদান, বিভিন্ন দান-খয়রাতিতে খরচ হয়েছে অফুরন্ত। খোদ চিকিৎসকদের একাংশের অভিযোগ, শুধু সরকারি হাসপাতালের রোগীদের খাবারের পাত নিয়ে বছরের পর বছর একই রকম নির্বিকার রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর।
পালাবদলের পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপরে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ফলে চিকিৎসক থেকে খাবার সরবরাহকারী সংস্থাগুলি অনেকেই মুখ খুলতে শুরু করেছেন। বেশির ভাগই একমত, ‘‘যে খাবার রোগীদের দেওয়া হয়, তা আমরা নিজেরা মুখে তুলতে পারব না।’’ স্বাস্থ্যকর্তাদের একাংশ মানছেন, রোগীদের উন্নততর খাবার দিতে আরও বেশি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন এখনই। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন বলে স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম মন্তব্য করতে চাননি।
সূত্রের খবর, ২০১৮ সালে খাবারের জন্য রোগী পিছু বরাদ্দ ৫৬ টাকা ৬৪ পয়সা আরও দু’বছর চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তার পরে অতিমারিতে নতুন কিছু হয়নি। ২০২৩-এ আবার নতুন দরপত্র ডাকা হয়। কিন্তু ২০২৫ পর্যন্ত পুরনো বরাদ্দই অটুট রাখার সিদ্ধান্ত হয়। বিষয়টি নিয়ে হাই কোর্টে মামলা দায়ের করে সরবরাহকারী সংস্থাদের একাংশ। পরে আরও কয়েকটি সংস্থাও মামলা করে।
সরকারি চুক্তি অনুযায়ী মেডিক্যাল কলেজ থেকে শুরু করে সমস্ত স্তরের হাসপাতালে সকালে তিন বা চার টুকরো পাউরুটি, একটি ডিম, ২০০ মিলিলিটার দুধ ও কলা, দুপুরের মেনুতে ভাত, ডাল, আনাজের তরকারি, এক টুকরো মাছ এবং সপ্তাহে অন্তত দু’দিন দু’টুকরো চিকেন এবং রাতে ভাত (ডায়াবেটিক রোগীদের তিনটি রুটি), ডাল, আনাজের তরকারি, ডিম দেওয়া হয়। জানা যাচ্ছে, দরপত্র ডাকার আগে স্বাস্থ্য দফতরের কমিটি মেনু ঠিক করে, রাজ্যের কৃষি বিপণন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনায় বাজার মূল্য অনুযায়ী দর স্থির করে।
পরোক্ষ ভাবে অনেক সংস্থাই কার্যত স্বীকার করছে, বাজার দর অনুযায়ী টাকা না পেয়ে বাধ্য হয়েই খাবারের মানের সঙ্গে আপস করতে হয়। তাই, ২০০ মিলিলিটার দুধে প্রায় অর্ধেক জল মেশে। ৭০-৭৫ গ্রাম ওজনের বদলে মাছের টুকরো দেওয়া হয় ৫০ গ্রামের। ১০০ গ্রাম মাংসের টুকরোর বদলে দেওয়া হয় ৭০ গ্রাম। জেলার অনেক হাসপাতালে আবার মাংস হয় না বললেই চলে। রাজ্যের কোনও সরকারি হাসপাতালেই ডায়েটিশিয়ান নেই। ফলে, ডায়াবেটিক রোগী ছাড়া বাকি সকলের একই খাবার। ডায়াবেটিক রোগীর জন্যও আলাদা রান্না নয়, আলু মেশানোর আগে বড়জোর আনাজের তরকারি তুলে রাখা হয়। সেই সঙ্গে খাবার গরম পরিবেশনের ট্রলি নেই, যার ফলে ঠান্ডা খাবারই রোগীদের ভবিতব্য।অভিযোগ, প্রতিটি হাসপাতালের কেন্দ্রীয় রান্নাঘরের দশাও চরম অস্বাস্থ্যকর। কোনও যন্ত্র ছাড়া হাতে হাতে দৈনিক অগুনতি রুটি করতেই হেঁশেল কর্মীদের অবস্থা কাহিল। রান্না ঘরে অবাধে ঘুরে বেড়ায় ইঁদুর, বেড়াল। নেই আলাদা গুদাম ঘরও।সরকারি হাসপাতালের খাবারের দর নিয়ে একটি মামলায় বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য রাজ্য সরকারকে দর পুনর্বিবেচনা করে দু’সপ্তাহের মধ্যে আদালতে হলফনামা জমা দিতে বলেছিলেন। আজও সেই হলফনামা জমা পড়েনি বলে খবর। আবার, প্রথম মামলাটির প্রেক্ষিতে আদালত ওই দরপত্রের উপরে স্থগিতাদেশ জারি করে। চিকিৎসকদের একাংশের কথায়, ‘‘সদিচ্ছা থাকলে তিন বছর বিষয়টি ফেলে না রেখে স্বাস্থ্য দফতর অবশ্যই পদক্ষেপ করতে পারত।’’ নতুন শাসক দলের বিধায়ক চিকিৎসক ইন্দ্রনীল খাঁ-র অবশ্য আশা, ‘‘বিষয়টিতে মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ নজর যখন রয়েছে, এ বার সমস্যা মিটবে।’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে